জনবসতির মাঝেই অনুমোদনহীন এলপিজি বটলিং প্লান্ট
কেরানীগঞ্জে রাতের আঁধারে গ্যাস রিফিলিং, বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা
শহিদুল ইসলাম খোকন
১০ মার্চ ২০২৬
রাজধানীর অদূরে ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে একটি এলপিজি বটলিং ও রিফিলিং প্লান্ট পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সরকারি বিধিমালা না মেনেই দীর্ঘদিন ধরে সেখানে গ্যাস রিফিলিং কার্যক্রম চলছে। ফলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন আশপাশের বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার বোয়ালি মৌজার কোনাখোলা রাজাবাড়ি রোডে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পেছনে কেরানীগঞ্জ স্যাটেলাইট এলপিজি প্লান্ট নামে একটি স্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে তোলা ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায় — একটি দেয়ালঘেরা সীমিত পরিসরের ভেতরে বড় আকারের গ্যাসাধার স্থাপন করা হয়েছে এবং তার চারপাশেই রয়েছে বসতবাড়ি, গাছপালা ও স্থানীয় জনবসতি। ছবিতেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, বিপজ্জনক এই গ্যাস সংরক্ষণ ব্যবস্থা জনবসতির অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্লান্টটি ম্যানেজার মো. জসিমের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এবং_এখান থেকে বিভিন্ন কোম্পানির নামে-বেনামে এলপিজি সিলিন্ডারে অবৈধভাবে গ্যাস রিফিলিং_ করা হয়।
নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ:
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্লান্ট প্রাঙ্গণে ভূ-উপরিস্থ অবস্থায় প্রায় ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার দুটি বড় গ্যাসাধার স্থাপন করা হয়েছে।
কিন্তু এলপিজি বিধিমালা, ২০০৪ অনুযায়ী এই ধরনের গ্যাসাধারের চারপাশে কমপক্ষে ৮ ফুট নিরাপদ দূরত্ব (সেফটি বাফার জোন) বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
স্থানীয়দের অভিযোগ: বাস্তবে সেখানে এ ধরনের নিরাপদ দূরত্ব মানা হয়নি এবং সীমিত জায়গার মধ্যেই সরকারি অনুমোদন ছাড়াই গ্যাস সংরক্ষণ ও রিফিলিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে,
এ ধরনের এলপিজি বটলিং বা রিফিলিং প্লান্ট পরিচালনার জন্য যেসব শর্ত বাধ্যতামূলক, তার মধ্যে রয়েছে—
.বিস্ফোরণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা
.উচ্চক্ষমতার অগ্নিনির্বাপণ অবকাঠামো
.প্রশিক্ষিত অপারেটর ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা
.নিরাপত্তা বাফার জোন জরুরি নির্গমন পথ ও নিরাপত্তা অ্যালার্ম ব্যবস্থা
স্থানীয়দের দাবি- প্লান্টটিতে এসব মানদণ্ডের পুরোটাই উপেক্ষা করা হয়েছে।
এমনকি এই প্লান্ট স্থাপনের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে, যার সত্যতা সরজমিনে গিয়ে পাওয়া যায়।
রাতের আঁধারে অবৈধ ট্রাকের আনাগোনা: এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনের বেলায় প্লান্ট এলাকায় তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না।
তবে রাত ১০টার পর থেকে সেখানে অসংখ্য ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান আসা–যাওয়া করতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের ধারণা,তখনই গোপনে সিলিন্ডার রিফিলিং ও সরবরাহ কার্যক্রম চালানো হয়।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
এত অল্প জায়গার মধ্যে এত বড় গ্যাস রিফিলিং পাম্প কীভাবে চলছে তা আমরা বুঝতে পারছি না, এখানে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে আশপাশের পুরো এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে।
বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডারে রিফিলিংয়ের অভিযোগ:
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এখানে বসুন্ধরাসহ দেশের কয়েকটি পরিচিত ব্র্যান্ডের এলপিজি সিলিন্ডারেও গ্যাস রিফিলিং করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর নীতিমালা অনুযায়ী তিতাস গ্যাস ও সরকারের অনুমোদিত নিজস্ব প্লান্ট ছাড়া অন্য কোথাও সিলিন্ডার রিফিলিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয় না।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদনহীনভাবে গ্যাস রিফিলিং করা ফলে সিলিন্ডারের চাপ, ওজন ও নিরাপত্তা মান ঠিক থাকে না। এতে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ম্যানেজারের দাবি মিথ্যায় ভরা- বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ স্যাটেলাইট এলপিজি প্লান্টের ম্যানেজার- মো. জসিম এ প্রতিবেদককে বলেন—
আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছি।
তবে তিনি তার কথার সত্যতার প্রমান হিসেবে কোনো সরকারি বৈধতার নথিপত্র,পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন এবং কোন এলপিজি কোম্পানি থেকে গ্যাস সংগ্রহ করা হয়— সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি।
এদিকে তার সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পর অজ্ঞাতপরিচয় একাধিক ব্যক্তি সাংবাদিকদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে কেন জসিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে— সে বিষয়ে জানতে চান।
এতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যে গড়মিল:
প্লান্টটি যেহেতু স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ঠিক পেছনে অবস্থিত, তাই বিষয়টি জানতে সেখানে দায়িত্বরত সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. কাজল এর সঙ্গে এ প্রতিবেদক যোগাযোগ করলে তিনি বলেন—
আমার জানামতে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতিসহ প্রশিক্ষিত লোকবল নিয়ে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়েই তারা ব্যবসা পরিচালনা করছে। সরজমিন পরিদর্শনে ফায়ার সার্ভিসের ঐ কর্মকর্তার কথার সাথে কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
উলটো স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাস্তবতার সঙ্গে ওই বক্তব্যের যথেষ্ট অমিল রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে-গ্যাস ও জালানি তেলের সংকটকে পুঁজি করে এ অবৈধ ব্যবসা প্রসারিত হতে পারে:
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে,বিশ্ববাজারে জ্বালানি অস্থিরতা ও সম্ভাব্য গ্যাস সংকটকে পুঁজি করে এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল অবৈধ গ্যাস রিফিলিং ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে।
তাদের মতে— কৃত্রিম সংকট তৈরি অনুমোদনহীন সিলিন্ডার রিফিলিং নিম্নমানের গ্যাস সরবরাহ নিরাপত্তাহীন সংরক্ষণ ব্যবস্থা
—এসবের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে।
প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ার অভিযোগ:
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অতীতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আমলের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য এবং ফায়ার সার্ভিসের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে এ ধরনের বিপজ্জনক স্থাপনা তৈরি করা হয়।
তাদের অভিযোগ,সরকার পরিবর্তনের পরও এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি।
বিস্ফোরণ ও শিল্প নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে- প্রশাসনের নাকের ডগায় এবং ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পাশেই যদি এমন একটি প্লান্ট দীর্ঘদিন চালু থাকে, তাহলে বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা জরুরি।
বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা:
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনবসতির মধ্যে অনিয়ন্ত্রিতভাবে এলপিজি সংরক্ষণ ও রিফিলিং কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অতীতে দেশে বিভিন্ন স্থানে অবৈধ গ্যাস রিফিলিং কেন্দ্র থেকে ভয়াবহ দুর্ঘটনার নজির রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন—
এখানে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
তদন্তের দাবি:
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দারা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তাদের দাবি—
প্লান্টটির অনুমোদন যাচাই নিরাপত্তা মান পরীক্ষা গ্যাস সংরক্ষণ ও রিফিলিং কার্যক্রম তদন্ত প্রয়োজন হলে প্লান্ট বন্ধ করা।
স্থানীয়দের ভাষায়—
সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনার আগেই প্রশাসন যদি ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে যে কোনো সময় ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।



















