ঢাকায় কবর খুঁড়ে কঙ্কাল চুরি: ৪৭টি মাথার খুলি উদ্ধার, গ্রেফতার ৪
রাজধানী ঢাকায় চাঞ্চল্যকর এক অভিযানে ৪৭টি মানব মাথার খুলি ও বিপুল পরিমাণ মানবদেহের হাড় উদ্ধারসহ সংঘবদ্ধ মানব কঙ্কাল চোর চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও থানা পুলিশ। দেশের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে গোপনে কবর খুঁড়ে মানব কঙ্কাল চুরি করে তা উচ্চমূল্যে বিক্রির অভিযোগে তাদের আটক করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশের পর রাজধানীজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতরা হলো— ১.কাজী জহরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক (২৫) ২.মোঃ আবুল কালাম (৩৯) ৩.আসাদুল মুন্সী ওরফে জসিম ওরফে এরশাদ (৩২) ৪.মোঃ ফয়সাল আহম্মেদ (২৬) অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্লাস্টিকের বাজারের ব্যাগে রাখা অবস্থায় ৪৭টি মাথার খুলি এবং মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় উদ্ধার করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান: তেজগাঁও থানা সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে যে তেজগাঁও থানাধীন মনিপুরীপাড়া এলাকার ১ নম্বর গেটের সামনে একজন ব্যক্তি অবৈধভাবে কবরস্থান থেকে সংগ্রহ করা মানব কঙ্কাল বিক্রির উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ৯ মার্চ রাত আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিটে অভিযান চালিয়ে পুলিশ কাজী জহরুল ইসলাম ওরফে সৌমিককে গ্রেফতার করে। এ সময় তার কাছ থেকে একটি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। ধারাবাহিক অভিযানে ধরা পড়ে চক্রের অন্য সদস্যরা গ্রেফতারকৃত সৌমিকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন সকাল আনুমানিক ৭টা ১০ মিনিটে তেজগাঁও কলেজের সামনে অভিযান চালিয়ে মোঃ আবুল কালাম ও আসাদুল মুন্সী ওরফে জসিম ওরফে এরশাদকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে আরও দুটি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। পরে গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দুপুর আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে অভিযান চালানো হয়। সেখানে সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল- এর হোস্টেলের ৪০২ নম্বর কক্ষ থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবস্থায় ৪৪টি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করা হয় এবং ওই কক্ষ থেকে মোঃ ফয়সাল আহম্মেদকে গ্রেফতার করা হয়। দেশের বিভিন্ন কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরি: প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কবরস্থান থেকে গভীর রাতে গোপনে কবর খুঁড়ে মানব কঙ্কাল চুরি করত। পরে এসব কঙ্কাল বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হতো। পুলিশের ধারণা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি, অবৈধ চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যেও এসব মানব কঙ্কাল বিক্রি করা হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একাধিক মামলার আসামি চক্রের সদস্য: তদন্তে আরও জানা যায়, গ্রেফতারকৃত মোঃ আবুল কালামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ২১টি মামলা রয়েছে। অপরদিকে আসাদুল মুন্সী ওরফে জসিম ওরফে এরশাদের বিরুদ্ধে রয়েছে দুটি মামলা। ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণে গুরুতর অপরাধ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কবরস্থান থেকে মৃত মানুষের দেহাবশেষ চুরি করা শুধু আইনগত অপরাধই নয়, বরং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধেরও গুরুতর লঙ্ঘন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এবং সমাজে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে বড় চক্র: পুলিশ বলছে, গ্রেফতার হওয়া চারজনের পেছনে আরও বড় নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। কারা এসব কঙ্কাল সংগ্রহ করত, কোথায় বিক্রি করা হতো এবং এর সঙ্গে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত আছে কিনা—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে এবং গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। জনমনে উদ্বেগ: রাজধানীতে কবরস্থান থেকে মানব কঙ্কাল চুরির মতো ভয়াবহ ঘটনার খবর প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কবরস্থানের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।


















