ঢাকা ০১:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আরামিট সিমেন্টে ৫০০ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ

নিজস্ব সংবাদ :

আরামিট সিমেন্টের বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: নথিতে কী আছে, কোথায় গেল অর্থ—অনুসন্ধানের কেন্দ্রে ২৭ লেনদেন
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
চট্টগ্রামের শিল্পপ্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির বিরুদ্ধে সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার নামে ভুয়া নথি তৈরি করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত কয়েকটি ঘটনায় বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় মোট ২৭টি লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্নভাবে স্থানান্তরের অভিযোগ তদন্তের আওতায় এসেছে।
অভিযোগের সূত্রপাত যেভাবে
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, প্রকৃত পণ্য কেনাবেচা না করেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ ছাড় করা হয়েছিল—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও তদন্ত এগিয়েছে। এর মধ্যে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
নথিতে তিনটি পৃথক ঘটনায় যথাক্রমে প্রায় ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। তিন ঘটনায় মোট ২৭টি লেনদেনের তথ্য তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ভুয়া সরবরাহকারী তৈরির অভিযোগ
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণের অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে আরামিট গোষ্ঠীর কয়েকজন কর্মচারীকে কাগজে-কলমে সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তাঁদের নামে আবেদন, চালান, সরবরাহসংক্রান্ত নথিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংক থেকে অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না—এটি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এখানে অনুসন্ধানের মূল বিষয় হচ্ছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ ছাড় করা হয়েছে, তারা বাস্তবে কোনো পণ্য সরবরাহ করেছিল কি না এবং সেই পণ্য কেনাবেচার বিপরীতে প্রকৃত কোনো লেনদেন হয়েছিল কি না।
ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে অর্থের গতিপথ
অভিযোগে বলা হয়েছে, অর্থ ছাড়ের পর তা একাধিক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর ও রূপান্তর করা হয়। পরে সেই অর্থ নগদে উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ কিংবা অন্যত্র পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে তাই শুধু অর্থ ছাড়ের সময়কার নথি নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোর স্টেটমেন্ট, চেক, পে-অর্ডার, অনলাইন ট্রান্সফার, নগদ উত্তোলন এবং অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ
দুদকের নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হয় এবং সেখানে সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। একইভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তবে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অর্থের প্রকৃত উৎস, কোন হিসাব থেকে কোন দেশে কত টাকা গেছে, কার নামে বা কোন প্রতিষ্ঠানের নামে সম্পদ কেনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের সঙ্গে আরামিট সিমেন্টের কথিত লেনদেনের যোগসূত্র কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই নিশ্চিত হওয়ার কথা।
সাবেক ভূমিমন্ত্রীর নাম কেন এসেছে
মামলার নথিতে প্রথম আসামি হিসেবে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে আরামিট গোষ্ঠীর মালিক হিসেবে উল্লেখ করে ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে কথিত অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে—ঋণ বা অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁর অনুমোদন বা নির্দেশনার প্রমাণ আছে কি না এবং অর্থের শেষ গন্তব্যের সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ আর্থিক সম্পর্ক পাওয়া যায় কি না।
সম্ভাব্য আসামিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
নথিতে আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমিলা জামান, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম, ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল আজিজসহ কয়েকজন ব্যক্তি এবং একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তার নাম সম্ভাব্য আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁদের বিরুদ্ধে ভুয়া সরবরাহকারী তৈরিতে সহযোগিতা, নথিতে স্বাক্ষর, অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং অর্থের গতিপথ আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কার দায়িত্ব কী ছিল এবং কে কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—তা নির্ধারণ করতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথি, বোর্ডের সিদ্ধান্ত, ব্যাংক যোগাযোগ, হিসাবরক্ষণ নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
দুদকের তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ
এই অভিযোগের পূর্ণ চিত্র বের করতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন—
প্রথমত, কথিত কাঁচামাল বাস্তবে কেনা ও সরবরাহ করা হয়েছিল কি না।
দ্বিতীয়ত, সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা ছিল কি না।
তৃতীয়ত, ২৭টি লেনদেনের প্রতিটি অর্থের উৎস ও গন্তব্য কোথায়।
চতুর্থত, অর্থ ছাড়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল।
পঞ্চমত, অর্থ স্থানান্তরের পর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে দেশ-বিদেশে সম্পদ কেনা হয়েছিল কি না।
ষষ্ঠত, কথিত লেনদেনের সঙ্গে আরামিট সিমেন্টের হিসাববই ও আর্থিক বিবরণীর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।
সপ্তমত, বিদেশে পাঠানো অর্থের সঙ্গে অভিযোগে উল্লেখিত ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না।
মামলা অনুমোদন তদন্তের পরবর্তী ধাপ
অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক পৃথক তিনটি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা হলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির হিসাবপত্র, ঋণসংক্রান্ত নথি, সরবরাহের কাগজপত্র, অর্থ স্থানান্তরের তথ্য এবং দেশ-বিদেশে সম্পদসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়া, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নথি যাচাই এবং বিদেশে অর্থ বা সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে অপরাধী নয়
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—দুদকের নথিতে থাকা অভিযোগ এখনো অভিযোগই। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি আইনগতভাবে অপরাধী হিসেবে গণ্য হন না। তাই তদন্তে অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে থাকা সব তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
সার্বিকভাবে, আরামিট সিমেন্টকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কথিত ভুয়া কাঁচামাল কেনাকাটা, ব্যাংকঋণের অর্থ ছাড়, ২৭টি লেনদেন, অর্থের গতিপথ এবং বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার এই অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে অর্থের শুরু থেকে শেষ গন্তব্য পর্যন্ত প্রতিটি লেনদেনের ফরেনসিক যাচাই এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ০১:১৩:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
১ বার পড়া হয়েছে

আরামিট সিমেন্টে ৫০০ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ

আপডেট সময় ০১:১৩:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

আরামিট সিমেন্টের বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: নথিতে কী আছে, কোথায় গেল অর্থ—অনুসন্ধানের কেন্দ্রে ২৭ লেনদেন
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
চট্টগ্রামের শিল্পপ্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির বিরুদ্ধে সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার নামে ভুয়া নথি তৈরি করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত কয়েকটি ঘটনায় বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় মোট ২৭টি লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্নভাবে স্থানান্তরের অভিযোগ তদন্তের আওতায় এসেছে।
অভিযোগের সূত্রপাত যেভাবে
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, প্রকৃত পণ্য কেনাবেচা না করেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ ছাড় করা হয়েছিল—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও তদন্ত এগিয়েছে। এর মধ্যে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
নথিতে তিনটি পৃথক ঘটনায় যথাক্রমে প্রায় ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। তিন ঘটনায় মোট ২৭টি লেনদেনের তথ্য তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ভুয়া সরবরাহকারী তৈরির অভিযোগ
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণের অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে আরামিট গোষ্ঠীর কয়েকজন কর্মচারীকে কাগজে-কলমে সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তাঁদের নামে আবেদন, চালান, সরবরাহসংক্রান্ত নথিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংক থেকে অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না—এটি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এখানে অনুসন্ধানের মূল বিষয় হচ্ছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ ছাড় করা হয়েছে, তারা বাস্তবে কোনো পণ্য সরবরাহ করেছিল কি না এবং সেই পণ্য কেনাবেচার বিপরীতে প্রকৃত কোনো লেনদেন হয়েছিল কি না।
ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে অর্থের গতিপথ
অভিযোগে বলা হয়েছে, অর্থ ছাড়ের পর তা একাধিক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর ও রূপান্তর করা হয়। পরে সেই অর্থ নগদে উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ কিংবা অন্যত্র পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে তাই শুধু অর্থ ছাড়ের সময়কার নথি নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোর স্টেটমেন্ট, চেক, পে-অর্ডার, অনলাইন ট্রান্সফার, নগদ উত্তোলন এবং অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ
দুদকের নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হয় এবং সেখানে সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। একইভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তবে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অর্থের প্রকৃত উৎস, কোন হিসাব থেকে কোন দেশে কত টাকা গেছে, কার নামে বা কোন প্রতিষ্ঠানের নামে সম্পদ কেনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের সঙ্গে আরামিট সিমেন্টের কথিত লেনদেনের যোগসূত্র কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই নিশ্চিত হওয়ার কথা।
সাবেক ভূমিমন্ত্রীর নাম কেন এসেছে
মামলার নথিতে প্রথম আসামি হিসেবে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে আরামিট গোষ্ঠীর মালিক হিসেবে উল্লেখ করে ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে কথিত অর্থের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে—ঋণ বা অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁর অনুমোদন বা নির্দেশনার প্রমাণ আছে কি না এবং অর্থের শেষ গন্তব্যের সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ আর্থিক সম্পর্ক পাওয়া যায় কি না।
সম্ভাব্য আসামিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
নথিতে আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমিলা জামান, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম, ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল আজিজসহ কয়েকজন ব্যক্তি এবং একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তার নাম সম্ভাব্য আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁদের বিরুদ্ধে ভুয়া সরবরাহকারী তৈরিতে সহযোগিতা, নথিতে স্বাক্ষর, অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং অর্থের গতিপথ আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কার দায়িত্ব কী ছিল এবং কে কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—তা নির্ধারণ করতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথি, বোর্ডের সিদ্ধান্ত, ব্যাংক যোগাযোগ, হিসাবরক্ষণ নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
দুদকের তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ
এই অভিযোগের পূর্ণ চিত্র বের করতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন—
প্রথমত, কথিত কাঁচামাল বাস্তবে কেনা ও সরবরাহ করা হয়েছিল কি না।
দ্বিতীয়ত, সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা ছিল কি না।
তৃতীয়ত, ২৭টি লেনদেনের প্রতিটি অর্থের উৎস ও গন্তব্য কোথায়।
চতুর্থত, অর্থ ছাড়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল।
পঞ্চমত, অর্থ স্থানান্তরের পর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে দেশ-বিদেশে সম্পদ কেনা হয়েছিল কি না।
ষষ্ঠত, কথিত লেনদেনের সঙ্গে আরামিট সিমেন্টের হিসাববই ও আর্থিক বিবরণীর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।
সপ্তমত, বিদেশে পাঠানো অর্থের সঙ্গে অভিযোগে উল্লেখিত ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না।
মামলা অনুমোদন তদন্তের পরবর্তী ধাপ
অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক পৃথক তিনটি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা হলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির হিসাবপত্র, ঋণসংক্রান্ত নথি, সরবরাহের কাগজপত্র, অর্থ স্থানান্তরের তথ্য এবং দেশ-বিদেশে সম্পদসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেওয়া, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নথি যাচাই এবং বিদেশে অর্থ বা সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে অপরাধী নয়
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—দুদকের নথিতে থাকা অভিযোগ এখনো অভিযোগই। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি আইনগতভাবে অপরাধী হিসেবে গণ্য হন না। তাই তদন্তে অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে থাকা সব তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
সার্বিকভাবে, আরামিট সিমেন্টকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কথিত ভুয়া কাঁচামাল কেনাকাটা, ব্যাংকঋণের অর্থ ছাড়, ২৭টি লেনদেন, অর্থের গতিপথ এবং বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার এই অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে অর্থের শুরু থেকে শেষ গন্তব্য পর্যন্ত প্রতিটি লেনদেনের ফরেনসিক যাচাই এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।