নামি ব্র্যান্ডের নকল আইসক্রিম ধ্বংস
নামি ব্র্যান্ডের নামে নকল আইসক্রিম! বাসাবোর কারখানায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান
বিষাক্ত রং-ফ্লেভারে তৈরি হচ্ছিল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আইসক্রিম, জব্দ ও ধ্বংস প্রায় এক হাজার
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর ব্যস্ত জনবসতিপূর্ণ এলাকার একটি কারখানায় নামি-দামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে নকল আইসক্রিম তৈরির অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অভিযানে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০টি নকল আইসক্রিম জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে কারখানা থেকে নাম-ঠিকানাবিহীন বিভিন্ন ধরনের রং, ফ্লেভার ও রাসায়নিক উপাদান উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিযানে থাকা কর্মকর্তারা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর বাসাবো শ্মশান গেইট এলাকার একটি আইসক্রিম কারখানায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য—কারখানাটিতে তৈরি আইসক্রিমে ব্যবহৃত কিছু রং ও ফ্লেভারের কোনো সুনির্দিষ্ট নাম-ঠিকানা বা উৎসের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। অভিযানের সময় এসব উপাদানও জব্দ করা হয়।
নামি ব্র্যান্ডের মোড়কে ভিন্ন পণ্য?
অভিযান সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে বিভিন্ন পরিচিত ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে আইসক্রিম প্রস্তুত ও বাজারজাত করার অভিযোগ পাওয়া যায়। জব্দ করা আইসক্রিমের মধ্যে পোলার, সেভয়, ঈগলু, ডেনিস, ফানটা, সাথী, লাভেরিয়া ও ডানোসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একটি কারখানা কীভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে আইসক্রিম তৈরি ও বাজারজাত করার সুযোগ পাচ্ছিল? এসব পণ্য কোথায় সরবরাহ করা হতো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কতদিন ধরে এভাবে উৎপাদন চলছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষাক্ত রং ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযানে নাম-ঠিকানাবিহীন বিভিন্ন ধরনের রং, ফ্লেভার ও রাসায়নিক উপাদান পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্যানিটেশন কর্মকর্তা ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মোহাং কামরুল হাসান।
তিনি জানান, কারখানায় বিভিন্ন ধরনের রং ও ফ্লেভার ব্যবহার করে আইসক্রিম তৈরি করা হচ্ছিল। কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে নাম-ঠিকানাবিহীন বিষাক্ত টেক্সটাইল কালার ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
খাদ্যপণ্যে কোনো রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার নিরাপত্তা, অনুমোদন, উৎস ও ব্যবহারবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত উপাদানের পরিচয় ও নিরাপত্তা যাচাই ছাড়া উৎপাদন হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রায় এক হাজার আইসক্রিম ধ্বংস
অভিযানের সময় প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০টি আইসক্রিম জব্দ করা হয়। পরে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর বিধান অনুযায়ী স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও তিনজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে জব্দ করা আইসক্রিম ধ্বংস করা হয় বলে জানিয়েছেন অভিযানে থাকা কর্মকর্তা।
প্রশ্ন হলো, এসব আইসক্রিম যদি অভিযান না হতো তাহলে কোথায় যেত? রাজধানীর কোন কোন এলাকায় এগুলো সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল? ইতোমধ্যে বাজারে এমন পণ্য পৌঁছে গেছে কি না—এ বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ একটি নকল খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শুধু একটি কারখানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের পুরো চক্রের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকতে পারে।
মালিক-ম্যানেজারের লিখিত অঙ্গীকার
অভিযান শেষে প্রতিষ্ঠানের মালিক দেলোয়ার ও ম্যানেজার মো. জাকির হোসেন নাম-ঠিকানাবিহীন বিষাক্ত টেক্সটাইল কালার ও ফ্লেভার ব্যবহার করে আইসক্রিম তৈরি ও বিক্রি করবেন না বলে লিখিত অঙ্গীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
তবে এখানেই প্রশ্ন শেষ হচ্ছে না। লিখিত অঙ্গীকারের পর কারখানাটি নিয়ম মেনে উৎপাদন করছে কি না, ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ পুনরায় ঘটছে কি না এবং উৎপাদিত পণ্য কোথায় বাজারজাত করা হয়েছিল—এসব বিষয় নিয়মিত নজরদারির দাবি রাখে।
শুধু একটি কারখানা, নাকি বড় চক্র?
নকল খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান নতুন নয়। কিন্তু একই সঙ্গে একাধিক পরিচিত ব্র্যান্ডের নামে পণ্য পাওয়ার অভিযোগ বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি রাখে।
একটি কারখানায় যদি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে পণ্য তৈরি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—
কারা এসব পণ্য বাজারজাত করছিল?
কোন দোকান বা পরিবেশকের মাধ্যমে এগুলো বিক্রি হতো?
কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল?
এসব পণ্যের প্যাকেট বা মোড়ক কোথা থেকে আসত?
ইতোমধ্যে উৎপাদিত পণ্যের কত অংশ বাজারে পৌঁছেছে?
আর একই ধরনের আরও কোনো কারখানা রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান নয়, প্রয়োজন হলে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা অনুসন্ধান করা জরুরি।
শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
আইসক্রিমের প্রধান ভোক্তাদের একটি বড় অংশ শিশু-কিশোর। ফলে নিম্নমানের বা অনিরাপদ উপাদান ব্যবহার করে তৈরি আইসক্রিম বাজারে ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিশেষ করে কোনো খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত রং বা রাসায়নিক খাদ্যমান ও নিরাপত্তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কি না, সেটি যাচাই ছাড়া ব্যবহার করা হলে ভোক্তাদের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুধু নকল ব্র্যান্ড ঠেকানো নয়, খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত প্রতিটি উপাদানের উৎস ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নজরদারি বাড়ানোর দাবি
বাসাবোর এই অভিযান নকল খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে পণ্য ধ্বংস করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নকল পণ্যের উৎস, সরবরাহকারী, পরিবেশক ও বাজারজাতকারীদের শনাক্ত করে পুরো চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বৈধ ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে কোনো প্রতিষ্ঠান পণ্য তৈরি করছে কি না, উৎপাদনস্থলে অনুমোদিত কাঁচামাল ব্যবহার হচ্ছে কি না এবং বাজারে থাকা পণ্যের মান ঠিক আছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত অভিযান ও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
বাসাবোর অভিযানে প্রায় এক হাজার আইসক্রিম ধ্বংসের ঘটনা তাই কেবল একটি কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না। এর আড়ালে আরও বড় কোনো সরবরাহচক্র রয়েছে কি না, সেটিই এখন অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নকল আইসক্রিমের উৎপাদনস্থল বন্ধের পাশাপাশি এর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা যায় কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়।



















