রাজবাড়ীতে যৌতুক মামলায় স্ত্রী কারাগারে
রাজবাড়ীতে স্বামীর করা যৌতুক মামলায় স্ত্রী কারাগারে, পাঁচ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে স্বামীর করা যৌতুক নিরোধ আইনের মামলায় মোছা. তানিয়া খাতুন (২২) নামে এক নারীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে বালিয়াকান্দি আমলি আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করলে বিচারক আরিফ হোসেন তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ী সদর উপজেলার বিনোদপুর গ্রামের মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের খালকুলা গ্রামের মোহন মল্লিকের মেয়ে তানিয়া খাতুনের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। তানিয়া একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের পর তানিয়া তার স্বামীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। ওই টাকা না দিলে সংসার করবেন না—এমন অভিযোগও করা হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। পরে পরিবার ও স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও সমাধান হয়নি বলে বাদীপক্ষের দাবি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে আদালতের তদন্তের পর তানিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পরে তিনি আদালতে হাজির হয়ে সংসার করার শর্তে জামিন নেন। এরপর লিগ্যাল এইডসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
মঙ্গলবার তানিয়া আদালতে হাজির হয়ে পুনরায় জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
যৌতুকের অভিযোগে আইনের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা
ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই যৌতুকবিরোধী আইন সমানভাবে প্রয়োগের দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কোনো মামলায় অভিযোগ ওঠা এবং অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যা দেওয়া আইনগতভাবে সমীচীন নয়।
একই সঙ্গে যৌতুক চাওয়া বা যৌতুকের জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগ নারী বা পুরুষ—যে পক্ষের বিরুদ্ধেই উঠুক, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে নিরপেক্ষভাবে বিচার নিশ্চিত করা।
গয়না কি যৌতুক?
এখানে আরেকটি বিষয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে—বিয়েতে স্বর্ণালংকার বা উপহার দেওয়া হলে তা সব ক্ষেত্রেই যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে কি না। এ বিষয়ে সরাসরি কোনো সাধারণীকরণ করা ঠিক নয়। কোনো জিনিস যৌতুকের আওতায় পড়ে কি না, তা নির্ভর করে সেটি বিয়ের শর্ত হিসেবে দাবি করা হয়েছিল কি না এবং মামলার নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ কী বলে তার ওপর।
রাজবাড়ীর এই মামলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিয়ের সময় সাখাওয়াতের পরিবারের পক্ষ থেকে তানিয়াকে স্বর্ণালংকার ও বিভিন্ন উপহার দেওয়া হয়েছিল। তবে মামলার মূল অভিযোগ হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবির বিষয়টি সামনে এসেছে।
আলোচনার কেন্দ্রে এখন ন্যায়বিচার
রাজবাড়ীর এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের অভিযোগই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিকভাবে কাউকে হেয় না করে আদালতের প্রক্রিয়াকে সম্মান করাও জরুরি।
এই মামলায় আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমে অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের সিদ্ধান্ত।



















