ডনের সঙ্গে ১২ লাখে চুক্তি? সালমান শাহ হত্যা মামলায় নতুন মোড়
সালমান শাহ হত্যা: ১২ লাখের ‘ডিল’ ঘিরে আবারও তোলপাড়
ডন গ্রেপ্তারের পর আদালতে চাঞ্চল্যকর দাবি | কথিত স্বীকারোক্তিতে হত্যার পরিকল্পনার ইঙ্গিত | সত্যতা যাচাই এখন তদন্তের বড় চ্যালেঞ্জ
নিউজ ডেস্ক
ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর তাঁর মৃত্যু রহস্য ঘিরে আবারও সামনে এসেছে বিস্ফোরক দাবি। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আশরাফুল হক ডন গ্রেপ্তারের পর আদালতে শুনানিতে উঠে এসেছে—সালমান শাহকে হত্যার জন্য ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি কথিত চুক্তি হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, রিজভী আহমদ নামে এক ব্যক্তি অন্য একটি হত্যা-চেষ্টা মামলায় দেওয়া কথিত স্বীকারোক্তিতে সালমান শাহ হত্যার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। সেই বক্তব্যের বরাতে দাবি করা হয়েছে, সালমান শাহর স্ত্রী সামিরার সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের কথিত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে চুক্তি হয়েছিল।
তবে অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই—এগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত সত্য নয়। একটি মামলায় দেওয়া কথিত স্বীকারোক্তি এবং শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগটি সামনে এসেছে। এর সত্যতা নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপর।
বিমানবন্দর থেকে ডন আটক—তারপর আদালতে
রোববার ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আশরাফুল হক ডনকে আটক করে। তিনি বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
পরে তাঁকে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ডন দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধারের প্রয়োজন রয়েছে। জামিনে মুক্তি পেলে তদন্ত ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তাঁর পুনরায় আত্মগোপনের আশঙ্কাও রয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
শুনানিতে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। পরে আদালত ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
১২ লাখ টাকার চুক্তি—প্রমাণ কোথায়?
সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডে ১২ লাখ টাকার কথিত চুক্তির দাবি সামনে আসার পর এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন একটাই—এই অর্থের লেনদেন বা চুক্তির পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে?
কথিত চুক্তি হয়ে থাকলে অর্থ কোথা থেকে এসেছিল, কার মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল, কোনো যোগাযোগের রেকর্ড রয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগের কোনো নথি বা সাক্ষ্য পাওয়া যায় কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই খুঁজতে হবে।
শুধু কোনো ব্যক্তির কথিত স্বীকারোক্তিতে এমন তথ্য থাকার কারণে সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তদন্তকারীদের প্রয়োজন হবে সেই বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায় এমন স্বাধীন প্রমাণ খুঁজে বের করা।
কথিত সম্পর্কের অভিযোগও যাচাইয়ের মুখে
আদালতে উপস্থাপিত দাবিতে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা এবং আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের মধ্যে কথিত সম্পর্কের প্রসঙ্গও এসেছে। এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু এই অভিযোগও বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রচার না করে তদন্তে তার প্রমাণযোগ্যতা যাচাই করাই হবে আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন উঠছে—কথিত সম্পর্কের দাবির পক্ষে কী প্রমাণ আছে? হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে সেটির সরাসরি যোগসূত্র কী? আর ১২ লাখ টাকার কথিত চুক্তির সঙ্গে ডনের ভূমিকার প্রমাণই বা কতটা শক্তিশালী?
১৯৯৬ থেকে ২০২৬—রহস্যের দীর্ঘ ছায়া
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক চলে আসছে।
মামলার এজাহারে তাঁকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও পরস্পর যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলায় নতুন করে আশরাফুল হক ডনের গ্রেপ্তার এবং আদালতে ১২ লাখ টাকার কথিত চুক্তির দাবি ওঠায় পুরোনো প্রশ্নগুলো আবার সামনে এসেছে।
তদন্তে এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
প্রথমত, ১২ লাখ টাকার কথিত চুক্তির কোনো বাস্তব প্রমাণ আছে কি না।
দ্বিতীয়ত, কথিত অর্থ লেনদেনের কোনো আর্থিক বা নথিগত প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।
তৃতীয়ত, রিজভী আহমদের কথিত স্বীকারোক্তির তথ্য অন্য স্বাধীন প্রমাণের সঙ্গে মেলে কি না।
চতুর্থত, আশরাফুল হক ডনের সঙ্গে অন্য অভিযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য রয়েছে কি না।
পঞ্চমত, কথিত হত্যার পরিকল্পনা এবং ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ১২ লাখ টাকার কথিত ‘ডিল’কে হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
শেষ কথা
সালমান শাহ হত্যা মামলা বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ও দীর্ঘস্থায়ী রহস্যগুলোর একটি। নতুন করে গ্রেপ্তার, আদালতে চাঞ্চল্যকর দাবি এবং কথিত স্বীকারোক্তির প্রসঙ্গ মামলাটিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
তবে এবার জনমতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে প্রমাণ। কে কী বলেছেন—তার পাশাপাশি সেই বক্তব্যের পক্ষে কী পাওয়া গেছে, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ আছে কি না, সাক্ষ্য কতটা নির্ভরযোগ্য এবং তদন্তে অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল কতটা—এসবই নির্ধারণ করবে মামলার পরবর্তী গতিপথ।
তিন দশকের পুরোনো রহস্যের পর্দা কি এবার সত্যিই উঠবে, নাকি ১২ লাখ টাকার কথিত ‘ডিল’ও থেকে যাবে আরেকটি অমীমাংসিত দাবির তালিকায়—সেই উত্তর এখন তদন্ত ও আদালতের হাতে।




















