গণমাধ্যম দমনের নির্দেশ! ‘সংঘাতের খবর দিলে টিভি বন্ধ’
‘সংঘাতের খবর দিলে টেলিভিশন বন্ধ’—গণমাধ্যম দমনের ভয়াবহ নির্দেশের অডিও ট্রাইব্যুনালে
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলির ঘটনা যখন দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল, তখন গণমাধ্যমের সংবাদ প্রচার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগের পক্ষে একটি অডিও রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় ওই অডিও রেকর্ড বাজিয়ে শোনানো হয়। মামলায় সাবেক সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে যুক্তিতর্ক চলছিল।
প্রসিকিউশন বলেছে, তৎকালীন সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের কথোপকথনে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত অডিওতে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, যারা সরকারের কথা শুনবে না, তাদের টেলিভিশন চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আজকে যেন কোনো সংঘাতের খবর না দেয়।’
জবাবে মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে বলতে শোনা যায়, কোনো টেলিভিশন চ্যানেল সংঘাত বা মারামারির ভিডিও ফুটেজ কিংবা ছবি প্রচার করলে তাদের ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কথোপকথনে আরাফাত আরও বলেন, আগের দিন কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং যারা নির্দেশনা মানবে না, তাদেরও সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অডিওতে আরও উঠে আসে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখার প্রসঙ্গ। কথোপকথনে আরাফাতকে বলতে শোনা যায়, কোনো টেলিভিশন চ্যানেল সংঘাতের ছবি প্রচার করলে সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রচার বন্ধ করে দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি এ বিষয়ে তার কাছ থেকে আলাদা অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও কথোপকথনে উল্লেখ করা হয়।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন সোমবার ট্রাইব্যুনালে এই অডিও ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়েছিল। সংঘাত, সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সংবাদ যাতে সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছায়, সে জন্য গণমাধ্যমের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগের সঙ্গে অডিওটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
একটি রাষ্ট্রে সংঘাত, আন্দোলন কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে তথ্য জানানো গণমাধ্যমের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সেই জায়গায় কোনো সংবাদ প্রচার করলে একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ ঘোষণা করে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে আন্দোলনের মতো সংকটময় সময়ে সংঘাতের দৃশ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর সংঘটিত ঘটনার তথ্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি জনগণের কাছ থেকে আড়াল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ট্রাইব্যুনালে বাজানো অডিওতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা সত্যতা ও প্রাসঙ্গিকতার বিচারে আদালতের মূল্যায়নের বিষয়। তবে প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, কথোপকথনটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালে অডিও, সামনে বড় প্রশ্ন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ঘটনাবলির দায় নির্ধারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন ধরনের নথি, সাক্ষ্য ও অডিও-ভিডিও উপস্থাপন করা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় সাবেক দুই মন্ত্রীর কথোপকথনের এই অডিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অডিওতে কথিত নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছিল, কোন কোন গণমাধ্যম এর প্রভাবের শিকার হয়েছিল এবং সেই সময় সংবাদ প্রচারে কী ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এখন ট্রাইব্যুনালের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে উপস্থাপিত অডিও ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের আইনগত গুরুত্ব কতটুকু। তবে প্রকাশ্যে আসা কথোপকথনটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহের সম্পর্ক নিয়ে একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—সংঘাতের সময় সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করলেই কি কোনো গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের শত্রু বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল?



















