শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়
শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা ফিরছে কি? সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগে আবারও ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হবে কি না—এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে আলোচনা ও বিভ্রান্তি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক একটি সভার কার্যবিবরণীতে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তের কথা উঠে এলেও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সোমবার (১০ আগস্ট) শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি সংবাদমাধ্যমকে সরকারের বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ৭৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগের বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে পরবর্তী নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে।
ফলে বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর কেন্দ্রীয় সুপারিশ ব্যবস্থা বহাল থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে আবার প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিয়োগের পথ খুলে দেওয়া হবে?
কার্যবিবরণীতে ভিন্ন সিদ্ধান্ত
শিক্ষামন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্যের আগে গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ—এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণীতে ভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্তের কথা উঠে আসে।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর নিয়োগ সুপারিশ বন্ধ করে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি সংশোধনের কথাও উল্লেখ করা হয়।
এমন তথ্য প্রকাশের পর শিক্ষক নিবন্ধনপ্রত্যাশী, চাকরিপ্রার্থী এবং শিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে শিক্ষামন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, কার্যবিবরণীতে সিদ্ধান্তের কথা থাকলেও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এনটিআরসিএর নিয়োগ ব্যবস্থা?
২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর এনটিআরসিএ প্রথম দিকে মূলত শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করত। পরে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য সুপারিশ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি।
এর ফলে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে একটি কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়া চালু হয়। প্রার্থীদের যোগ্যতা, নিবন্ধন, শূন্যপদ এবং মেধাক্রমের ভিত্তিতে নিয়োগ সুপারিশ দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হয়।
এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব, অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কমানো। কেন্দ্রীয়ভাবে সুপারিশের কারণে প্রার্থীদের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলকভাবে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে এনটিআরসিএর নিয়োগ সুপারিশ ঘিরে মামলা, জটিলতা, পদসংক্রান্ত সমস্যা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও সামনে এসেছে।
ম্যানেজিং কমিটির হাতে ক্ষমতা গেলে কী পরিবর্তন হতে পারে?
ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরলে শিক্ষক নিয়োগের কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তখন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক বাছাই ও নিয়োগের সুযোগ পেতে পারে।
তবে একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত নিয়োগ ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিয়োগ চালু হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া কীভাবে হবে, প্রার্থীদের মেধাক্রম কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এবং নিয়োগে প্রভাব বা অনিয়ম ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করা প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিয়োগের পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা মনে করেন, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত শিক্ষক নির্বাচন করতে পারলে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর হতে পারে।
১৮তম নিবন্ধনধারীদের নিয়েও সিদ্ধান্ত
সভাটির কার্যবিবরণীতে ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বউদ্যোগে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও প্রয়োজনীয় পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংশোধন ও জারির সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা নিবন্ধনধারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে কার্যকর সিদ্ধান্ত, প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট বিধি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি বাস্তবায়নের অবস্থায় এসেছে—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সামনে ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন
এনটিআরসিএর সর্বশেষ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৩ সালে। সে ধারাবাহিকতায় ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও সাম্প্রতিক সভায় আলোচিত হয়েছে।
এখন ১৯তম নিবন্ধন পরীক্ষা, নিবন্ধন সনদ এবং ভবিষ্যৎ নিয়োগ ব্যবস্থা—তিনটি বিষয়ই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এনটিআরসিএ শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে, নাকি নিয়োগ সুপারিশের দায়িত্বও বহাল রাখবে—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
চাকরিপ্রার্থীদের চোখ এখন সরকারের সিদ্ধান্তে
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশায় থাকা হাজারো নিবন্ধনধারীর জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন হলে তাদের আবেদন, মেধাক্রম, পছন্দের প্রতিষ্ঠান এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার পুরো কাঠামোতেই পরিবর্তন আসতে পারে।
একদিকে কেন্দ্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা রয়েছে। অন্যদিকে নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবিও রয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে—যে পদ্ধতিই গ্রহণ করা হোক, সেখানে যেন যোগ্যতা, মেধা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত থাকে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ৭৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী নিয়োগ ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।
অর্থাৎ, আপাতত ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কার্যবিবরণীতে যে সিদ্ধান্তের কথা উঠে এসেছে, সেটিও এখন সরকারের পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় আইন-বিধি সংশোধনের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে আগামী দিনের কাঠামো কী হবে, তা জানতে এখন তাকিয়ে থাকতে হবে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।



















