১৭ বছর পর বই হাতে, ছেলের সঙ্গে এসএসসি দিয়ে জিপিএ-৫ পেলেন মা!
ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা, মা-ছেলের দুজনেরই জিপিএ-৫!
১৭ বছর পড়াশোনার বাইরে থেকেও হার মানেননি সাদিয়া, ছেলের পাশে বসে পড়েছেন রাত জেগে
রাজশাহী প্রতিনিধি
একজন মা, এক সন্তান এবং একটি স্বপ্ন—দীর্ঘ ১৭ বছরের বিরতির পর সেই স্বপ্ন আবারও বই-খাতার পাতায় ফিরে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নের ফলও এসেছে অসাধারণ। ছেলের সঙ্গে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মা সাদিয়া বেগমও অর্জন করেছেন জিপিএ-৫। আর তার ছেলে তানভীর আহমেদ পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫।
ব্যতিক্রমী এই সাফল্যে রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানা এলাকার পরিবার ও আশপাশের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আনন্দের আবহ।
সাদিয়া বেগমের বিয়ে হয়েছিল প্রায় ১৯ বছর আগে। বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ায় দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পড়াশোনা থেকে দূরে ছিলেন তিনি। দুই সন্তানকে বড় করা, সংসারের নানা দায়িত্ব পালন—সবকিছুর ব্যস্ততায় বই-খাতা থেকে দূরে সরে গেলেও পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায়নি।
দীর্ঘ বিরতির পর একসময় আবারও বই হাতে তুলে নেন সাদিয়া। সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনার পাশাপাশি শুরু করেন পড়াশোনা। প্রায় দুই বছর আগে নেন আরও বড় সিদ্ধান্ত—ছেলের সঙ্গে একই সময়ে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন তিনি।
পরিবারের সম্মতি পাওয়ার পর শুরু হয় প্রস্তুতি। সংসারের কাজের ফাঁকে পড়াশোনা, সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া এবং নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছু একসঙ্গে চালিয়ে যান তিনি।
চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেন সাদিয়া।
অন্যদিকে তার ছেলে তানভীর আহমেদ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অর্জন করেছে গোল্ডেন জিপিএ-৫।
সাদিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। তবে স্বপ্নটাকে কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেননি।
ছেলের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর শুরু হয় তার নতুন লড়াই। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যান তিনি।
তানভীরের কাছে পুরো বিষয়টি আরও আবেগের। মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষার হলে বসা এবং শেষ পর্যন্ত দুজনেরই ভালো ফলাফলকে সে জীবনের অন্যতম সৌভাগ্য হিসেবে দেখছে।
তানভীর জানায়, মা নিয়মিত তার পড়াশোনার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি নিজেও পড়াশোনা করতেন। অনেক সময় রাত জেগে তার পাশে বসে থাকতেন। ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়টিতে মা শুধু অভিভাবক ছিলেন না, ছিলেন একই সঙ্গে একজন সহপাঠীও।
মায়ের এই সাফল্যে গর্বিত তানভীর। নিজের ফলাফল বাবা-মাকে উৎসর্গ করে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নের কথা জানিয়েছে সে।
মা-ছেলের এই সাফল্যে আনন্দিত তাদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলামও। প্রায় চার বছর ধরে তিনি তানভীরকে ইংরেজি পড়ানোর পাশাপাশি সাদিয়ার পড়াশোনাতেও সহযোগিতা করেছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সাদিয়ার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি দীর্ঘ বিরতির পর নিজের শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন সাদিয়া।
মা-ছেলের এই গল্প তাই শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়। এটি হার না মানার গল্প, অসমাপ্ত স্বপ্নকে আবারও নতুন করে শুরু করার গল্প।
১৭ বছর পর বই হাতে নিয়ে যে মা ছেলের সঙ্গে পরীক্ষার টেবিলে বসেছিলেন, ফল প্রকাশের দিনে সেই মা-ছেলে দুজনের হাতেই উঠেছে সাফল্যের সনদ। একজন পেয়েছেন জিপিএ-৫, আরেকজন গোল্ডেন জিপিএ-৫।
তাদের এই সাফল্য যেন বলে—স্বপ্নের পথে বিরতি আসতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন কখনো শেষ হয়ে যায় না।
ভাইরাল হেডলাইন বিকল্প:
১৭ বছর পর বই হাতে, ছেলের সঙ্গে এসএসসি দিয়ে জিপিএ-৫ পেলেন মা!
ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫, মা-ও জিপিএ-৫—রাজশাহীতে মা-ছেলের অনন্য কীর্তি
একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা, মা-ছেলের দুজনেরই জিপিএ-৫—গর্বিত পরিবার



















