ভাড়া দেওয়া বাড়িতে ডিবির অভিযানে আইস, ইয়াবা, গাঁজা ও মদ উদ্ধার, ২৬ নারীসহ ৮৪ জন আটক—৩০০ ফিটের ঘটনায় ক্লোজড অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির, বাড়ির ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন
ভাড়া দেওয়া বাড়িতে ডিবির অভিযানের পর অতিরিক্ত ডিআইজি ক্লোজড, ৮৪ জন আটক
৩০০ ফিটের বাড়িতে মাদক ও ডিজে পার্টির অভিযোগ, উদ্ধার বিভিন্ন ধরনের মাদক—পুলিশ কর্মকর্তার দায় কতটুকু, উঠছে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাড়া দেওয়া বাড়িতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযানে ২৬ নারীসহ ৮৪ জনকে আটক করার পর পুলিশ সদরদপ্তরের রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি (সুপারনিউমারারি) আব্দুল্লাহ আল জহিরকে সদরদপ্তরের অন্য শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার রাতে রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এ অবস্থিত ওই বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযানে আইস, ইয়াবা, গাঁজা, কুশ, মদ ও সিসাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি কয়েকটি গাড়িও জব্দ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি শুধু মাদক উদ্ধার কিংবা কয়েকজনকে আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—একজন পুলিশ কর্মকর্তার মালিকানাধীন বা ভাড়া দেওয়া স্থাপনায় যদি দীর্ঘদিন ধরে মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড চলে থাকে, তাহলে সেটি প্রতিরোধে বাড়ির মালিকের দায়িত্ব কতটুকু, আর অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?
অভিযানের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত
যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিবির অভিযানের পর মঙ্গলবার বিকালে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদরদপ্তরের রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখা থেকে সদরদপ্তর শাখায় সংযুক্ত করার আদেশ দেওয়া হয়। আদেশে সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সদরদপ্তরের অন্য শাখায় সংযুক্ত করার অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া কিংবা অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়। এটি একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এ ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পাঁচ কক্ষের স্থাপনা, ভাড়ার বুকিং নিয়ে প্রশ্ন
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০০ ফিট এলাকার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এ ওই পুলিশ কর্মকর্তার একটি প্লট রয়েছে। সেখানে পাঁচটি কক্ষ নির্মাণ করে অনলাইনে Airbnb ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে ডিবি সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনলাইনে বুকিং নিয়ে সেখানে ডিজে পার্টির আয়োজন এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড চলত। এসব কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলার তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয় বলে ডিবি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, কর্মকাণ্ডের সময়কাল, বুকিংয়ের প্রকৃত ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অনলাইনে কোনো স্থাপনা ভাড়া দেওয়া নিজে অপরাধ নয়; কিন্তু সেই স্থাপনা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হলে কার কী দায় রয়েছে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জ্ঞান, ভূমিকা, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনের ওপর।
২৬ নারীসহ ৮৪ জন আটক
ডিবির অভিযানে মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ২৬ জন নারী রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থাপনাটির কক্ষ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মাহবুব নামের এক ব্যক্তিকেও আটকের কথা বলা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কারা মাদক বহন, সংরক্ষণ, সরবরাহ বা সেবনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, কারা সেখানে অন্য উদ্দেশ্যে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, কোনো স্থানে উপস্থিত থাকা বা অভিযানে আটক হওয়া মাত্রই কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন, উদ্ধার করা আলামতের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য কী?
এ বিষয়ে যুগান্তরকে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, তিনি বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন এবং ভাড়া দেওয়ার সময় ভাড়াটিয়াদের নিয়মনীতি সম্পর্কে জানানো হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ওই বাড়িতে বসবাস করেন না। ভাড়াটিয়ারা কোনো অপরাধ করে থাকলে তার বিচার তাদের হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তাঁর বক্তব্যে বাড়িটি ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হলেও সেখানে সংঘটিত বলে অভিযোগ করা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন। তাঁর এই বক্তব্যের যথার্থতা এবং বাড়িটি ভাড়া দেওয়ার পর কী ধরনের তদারকি করা হয়েছিল, তা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।
বাড়ির মালিকের দায় কোথায়?
এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্ন হলো, বাড়ির মালিক হিসেবে ওই পুলিশ কর্মকর্তা স্থাপনাটির ব্যবহার সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং অভিযোগ অনুযায়ী সেখানে বেআইনি কর্মকাণ্ড চললে তা প্রতিরোধে তাঁর কোনো দায়িত্ব ছিল কি না।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন—
প্রথমত, ভাড়ার চুক্তি: বাড়িটি কাকে, কী শর্তে এবং কত দিনের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছিল? ভাড়াটিয়ার পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, স্থাপনার ব্যবহার: অনলাইন বুকিংয়ের মাধ্যমে কারা কক্ষগুলো ভাড়া নিতেন, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতেন এবং সেখানে নিয়মিত ডিজে পার্টি আয়োজনের অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে?
তৃতীয়ত, মালিকের অবগতির বিষয়: স্থাপনাটিতে মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড চলার বিষয়ে মালিক আগে থেকে কিছু জানতেন কি না, কোনো অভিযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং অভিযোগ পাওয়ার পর কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না—এসব তথ্য অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, আর্থিক লেনদেন ও ব্যবস্থাপনা: ভাড়ার অর্থ কীভাবে আদায় করা হতো, অনলাইন বুকিং কে পরিচালনা করতেন এবং কক্ষগুলোর দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার হাতে ছিল, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
পঞ্চমত, উদ্ধার করা আলামত: মাদক কোথা থেকে এসেছে, কার দখলে ছিল এবং জব্দ করা আলামতের সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের কী সম্পর্ক রয়েছে, তা ফরেনসিক পরীক্ষা ও অন্যান্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। কেবল বাড়ির মালিকানা বা পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধে জড়িত বলা যেমন যথাযথ নয়, তেমনি মালিক ভাড়া দেওয়ার পর স্থাপনাটির ব্যবহার সম্পর্কে কোনো দায়িত্বই নেই—এমন সিদ্ধান্তও আগাম দেওয়া যায় না।
অনলাইন ভাড়া ব্যবস্থাপনায় নজরদারির প্রশ্ন
অনলাইনে স্বল্পমেয়াদি আবাসন ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে প্রচলিত। তবে এ ধরনের ব্যবস্থার অপব্যবহার করে কোনো স্থাপনা মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন বা অন্য বেআইনি কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হলে তা প্রতিরোধে বাড়ির মালিক, ব্যবস্থাপক, বুকিং পরিচালনাকারী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই ঘটনায়ও অনলাইন বুকিংয়ের পরিচয় যাচাই, অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণ, স্থাপনার ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলেই ওই প্ল্যাটফর্ম অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বুকিংয়ের প্রকৃত রেকর্ড, অর্থ লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও বড় পরীক্ষা
পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধের তদন্ত এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ফলে পুলিশের কোনো কর্মকর্তার মালিকানাধীন স্থাপনায় অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ উঠলে তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার উচিত উদ্ধার করা মাদকের ধরন ও পরিমাণ নথিভুক্ত করা, জব্দতালিকা প্রস্তুত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া, বুকিংয়ের তথ্য যাচাই করা এবং প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে তদন্তে কোনো প্রভাব বিস্তার বা তথ্য গোপনের চেষ্টা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী নজর দেওয়া যেতে পারে।
অভিযানের পর প্রশাসনিকভাবে ওই কর্মকর্তাকে সদরদপ্তরের অন্য শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে তদন্তের অগ্রগতি, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য প্রয়োজন।
জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত
রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকার এই ঘটনা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। একটি ভাড়া দেওয়া স্থাপনা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, অভিযোগ অনুযায়ী মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড কত দিন ধরে চলছিল, স্থাপনাটি পরিচালনার দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং মালিকের কোনো জ্ঞান বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
একই সঙ্গে আটক ৮৪ জনের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রমাণ আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, আবার অপরাধে জড়িত কেউ যেন পরিচয় বা প্রভাবের কারণে ছাড় না পান—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় উভয় বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ডিবির অভিযান ও পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘটনাটিকে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে প্রকৃত দায় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তরে ২০ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন।






















