ঢাকা ০৩:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অন্যের জমি-জমা ও সম্পত্তি দখল করে সম্পদের পাহাড় নয়—আল্লাহর আদালতে দিতে হবে প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব

নিজস্ব সংবাদ :

অন্যের জমি-জমা, বাড়ি ও সম্পত্তি জোর করে দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়বেন না—আল্লাহর কাছে একদিন প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব দিতে হবে
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা; দুনিয়ার ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব কি আখিরাতের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করতে পারবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একজন মানুষের সারা জীবনের উপার্জনে গড়ে ওঠা বাড়ি, বাবার রেখে যাওয়া এক টুকরো জমি, অসহায় পরিবারের শেষ সম্বল কিংবা ভাই-বোনের ন্যায্য উত্তরাধিকার—এসব কেবল সম্পত্তির হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, স্মৃতি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ। অথচ সেই সম্পত্তিই যখন অন্যের লোভের লক্ষ্য হয়ে ওঠে, যখন ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতারণা কিংবা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে কারও অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—সম্পদের জন্য মানুষ কতটা নির্মম হতে পারে? আর অন্যের হক নষ্ট করে অর্জিত সম্পদের হিসাব কি কখনো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব?
সমাজে সম্পদশালী হওয়ার প্রতিযোগিতা রয়েছে। কেউ কঠোর পরিশ্রম করে, সৎ ব্যবসা করে কিংবা বৈধ উপায়ে জমি-জমা কিনে নিজের অবস্থার উন্নতি করেন। এটি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক। কিন্তু কেউ যখন অন্যের সম্পত্তি নিজের করে নেওয়ার জন্য মিথ্যা দাবি তোলেন, প্রকৃত মালিককে দখল থেকে বঞ্চিত করেন, দুর্বল মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নেন কিংবা উত্তরাধিকারের ন্যায্য অংশ আটকে রাখেন, তখন সেই সম্পদ অর্জনের নৈতিকতা ও বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়।
একটি পরিবারকে তার বসতভিটা থেকে বঞ্চিত করে কেউ হয়তো নিজের জমির পরিমাণ বাড়ালেন। কোনো ভাইয়ের প্রাপ্য অংশ না দিয়ে আরেক ভাই হয়তো সম্পদশালী হলেন। কোনো অসহায় ব্যক্তির অর্থ আটকে রেখে কেউ হয়তো নিজের ব্যবসার পুঁজি বাড়ালেন। কিন্তু এসব কাজের মাধ্যমে অর্জিত আর্থিক সুবিধা কি অন্যায়ের দায় মুছে দিতে পারে?
ইসলামি বিশ্বাসের আলোকে উত্তরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিশ্বাস শুধু নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা থেকে বিরত থাকাও ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোরআনের সতর্কবাণী: অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করবেন না
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতে নিষেধ করেছেন। একই আয়াতে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে অর্জনের উদ্দেশ্যে বিচারিক কর্তৃপক্ষকে ব্যবহার করার বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়েছে। ।
এই নির্দেশের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কোনো ব্যক্তি যদি জানেন যে সম্পত্তিটি তাঁর নয়, অর্থটি তাঁর প্রাপ্য নয়, কিংবা অন্য ব্যক্তির ন্যায্য অধিকার রয়েছে, তারপরও অসৎ উপায়ে সেটি নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে বিষয়টি শুধু সামাজিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধর্মীয় দৃষ্টিতেও তা গুরুতর অন্যায়ের প্রশ্ন তৈরি করে।
কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, প্রভাব খাটিয়ে সম্পত্তি নিজের নামে নিতে পারলেই তিনি নিরাপদ। কেউ মনে করতে পারেন, প্রকৃত মালিক দুর্বল, তাঁর কাছে যথেষ্ট কাগজপত্র নেই, কিংবা তিনি মামলা করার সামর্থ্য রাখেন না—তাই তাঁর সম্পত্তি দখল করে রাখলেও সমস্যা হবে না।
কিন্তু সূরা আল-বাকারার এই আয়াত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, বাহ্যিকভাবে কোনো সম্পদ নিজের দখলে আনা আর ন্যায়সংগতভাবে তার অধিকারী হওয়া এক বিষয় নয়।
একইভাবে সূরা আন-নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ ব্যবসার কথা বলা হয়েছে এবং অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। ।
অর্থাৎ, ইসলাম সম্পদ অর্জনের বিরোধী নয়; বরং সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা, সততা ও বৈধতার ওপর গুরুত্ব দেয়। নিজের উন্নতির জন্য অন্যের অধিকার নষ্ট করা কোনো গ্রহণযোগ্য পথ হতে পারে না।
এক টুকরো জমির জন্যও রয়েছে কঠোর সতর্কবার্তা
জমি নিয়ে বিরোধে কখনো বছরের পর বছর মামলা চলে। কোথাও সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্ব, কোথাও উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ, আবার কোথাও প্রকৃত মালিকের অভিযোগ—তাঁর জমি জোর করে দখল করা হয়েছে।
জমির পরিমাণ যত ছোটই হোক, সেটি কারও কাছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। এক টুকরো জমিই হয়তো একটি পরিবারের বসতভিটা, জীবিকা কিংবা ভবিষ্যতের একমাত্র নিরাপত্তা।
সহিহ বুখারির ২৪৫৪ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যায়ভাবে অন্যের জমি গ্রহণের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। হাদিসটিতে কিয়ামতের দিন এর ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ রয়েছে। ।
এই সতর্কবাণীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক মানুষের নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা উচিত—যে জমির বৈধ মালিক আমি নই, সেটি নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা কেন করছি? অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজের সম্পদ বাড়ানোর মধ্যে প্রকৃত সাফল্য কোথায়?
আজ হয়তো কোনো ব্যক্তি ক্ষমতার জোরে অন্যের জমিতে বেড়া দিলেন, সীমানা পরিবর্তন করলেন কিংবা প্রকৃত মালিককে জমিতে প্রবেশ করতে বাধা দিলেন। কিন্তু ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, দুনিয়ার সাময়িক দখলই চূড়ান্ত বিচারের মাপকাঠি নয়।
তবে জমি নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। প্রকৃত মালিকানা, দলিল, রেকর্ড, দখলের ইতিহাস ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনসম্মত প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। ধর্মীয় সতর্কবাণীর পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরপেক্ষ প্রক্রিয়াও অপরিহার্য।
অন্যের হক আত্মসাৎ করে সম্পদ বাড়ানো কি সত্যিকারের সাফল্য?
সম্পদের পরিমাণ দিয়ে মানুষের আর্থিক অবস্থান বোঝা যেতে পারে, কিন্তু তার চরিত্রের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। একজন ব্যক্তি কত বড় বাড়ির মালিক, কত জমির মালিক কিংবা তাঁর ব্যাংক হিসাবে কত টাকা আছে—এসব তথ্যের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে?
সৎ উপার্জন মানুষের সম্মান বাড়ায়। অন্যদিকে, প্রতারণা কিংবা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে অন্যের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
একটি পরিবার হয়তো বহু বছর ধরে পরিশ্রম করে জমি কিনেছে। সেই জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে পরিবারটির সঞ্চয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। কোনো উত্তরাধিকারী তাঁর প্রাপ্য অংশ না পেলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আবার কোনো ব্যবসায়ী অংশীদারের অর্থ আত্মসাৎ করলে অন্যের ব্যবসা ও জীবিকা বিপন্ন হতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে অন্যের ক্ষতি নিজের লাভে পরিণত করা শুধু অর্থনৈতিক অন্যায় নয়; এটি বিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্কেরও ক্ষতি করে।
আল্লাহকে ভয় করার অর্থ হলো, নিজের লাভের হিসাবের পাশাপাশি অন্যের অধিকারের কথাও স্মরণ রাখা। কেউ দেখছেন না বলে অন্যায় করা যাবে—এমন ধারণা একজন বিশ্বাসীর নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এতিম, দুর্বল ও অসহায় মানুষের সম্পত্তি নিয়ে সতর্ক থাকুন
পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ১০ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভোগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। ।
এতিম বা অসহায় মানুষের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাঁর ওপর থাকে, তাঁর কর্তব্য সেই সম্পদ আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করা। দায়িত্বের সুযোগ নিয়ে নিজের লাভের জন্য সেই সম্পদ ব্যবহার করা নৈতিকভাবে গুরুতর অন্যায়।
একইভাবে কোনো ব্যক্তি বৃদ্ধ, অসুস্থ, নিরক্ষর কিংবা আর্থিকভাবে দুর্বল বলে তাঁর সম্পত্তির অধিকার উপেক্ষা করা যায় না। কেউ দলিলের বিষয় বোঝেন না বলে তাঁকে ভুল বুঝিয়ে সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়া, তাঁর প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখা কিংবা তাঁর অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো—এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ন্যায়সংগত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজের শক্তিশালী মানুষের দায়িত্ব দুর্বলকে রক্ষা করা; দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়।
পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ: রক্তের সম্পর্কের চেয়েও কি লোভ বড়?
অন্যের সম্পত্তি আত্মসাতের প্রশ্ন অনেক সময় পরিবারের ভেতরেও দেখা দেয়। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, ভাই-বোনের উত্তরাধিকার, পারিবারিক ব্যবসার হিসাব কিংবা বসতভিটার মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।
কখনো কোনো ব্যক্তি নিজের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় অন্য উত্তরাধিকারীর অংশ দিতে চান না। কখনো আবার সম্পত্তির নথিপত্র নিজের কাছে রেখে অন্যদের অধিকার সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
প্রতিটি পারিবারিক বিরোধের ঘটনা ও আইনগত অবস্থান আলাদা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আত্মীয়তার সম্পর্ক কাউকে অন্যের ন্যায্য অধিকার আত্মসাৎ করার অনুমতি দেয় না।
যে ভাই বা বোনের বৈধ উত্তরাধিকার রয়েছে, তাঁর অধিকারকে সম্মান করা জরুরি। ইসলামি উত্তরাধিকারবিধি অনুযায়ী কার কতটুকু অংশ প্রাপ্য, তা সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধান অনুসারে নির্ধারণ করতে হবে। বিরোধ দেখা দিলে দলিলপত্র যাচাই এবং যোগ্য আইনজীবী বা আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সম্পদের জন্য সম্পর্ক নষ্ট করা, অন্যের প্রাপ্য আটকে রাখা কিংবা দুর্বল উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করার বদলে ন্যায়সংগত সমাধানের পথ বেছে নেওয়াই উত্তম।
দুনিয়ার আদালত আর আল্লাহর কাছে জবাবদিহি—দুটি ভিন্ন বিষয়
কোনো সম্পত্তি নিয়ে মামলা হলে আদালত দলিল, সাক্ষ্য, প্রাসঙ্গিক আইন ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়। আইনগত প্রক্রিয়ায় কারও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, আবার অভিযোগ প্রমাণিত না-ও হতে পারে।
কিন্তু ইসলামি বিশ্বাসে মানুষের বাহ্যিক অবস্থানের বাইরেও তার উদ্দেশ্য, কাজ ও নৈতিক দায়ের বিষয় রয়েছে। কেউ যদি জেনেশুনে অন্যের অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে শুধু বাহ্যিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা তাঁর কাজকে ন্যায়সংগত করে না।
পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতে প্রত্যেক প্রাণীর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ এবং কিয়ামতের দিন পূর্ণ প্রতিদান পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ।
এই বিশ্বাস মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন চিরস্থায়ী নয়। আজ যে বাড়ি, জমি ও অর্থ নিয়ে অহংকার করা হচ্ছে, একদিন সেসব সম্পদ দুনিয়াতেই থেকে যাবে। তাই সম্পদের মালিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ন্যায্যভাবে সম্পদ অর্জন ও মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্বও স্মরণ করা প্রয়োজন।
আল্লাহকে ভয় করা মানে শুধু শাস্তির কথা শুনে আতঙ্কিত হওয়া নয়; বরং অন্যায় করার আগে থেমে যাওয়া, ভুল বুঝতে পারলে সংশোধন করা এবং নিজের ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা।
অন্যের সম্পত্তি নিয়ে অন্যায় করে থাকলে সংশোধনের পথ কী?
মানুষ ভুল করতে পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পরও অন্যায় ধরে রাখা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা এক বিষয় নয়।
যদি কেউ অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখল করে থাকেন, তাহলে প্রথম কাজ হলো প্রকৃত মালিকানা ও অধিকার সম্পর্কে সত্য যাচাই করা। অন্যায় প্রমাণিত হলে সম্পত্তি বা তার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
কারও অর্থ আটকে থাকলে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষতি হয়ে থাকলে ক্ষতিপূরণ ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা, আইনজীবীর পরামর্শ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই সংশোধনের আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষমা করবেন কি না, তা তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত; তাঁর ওপর ক্ষমা করার চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।
আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি মানুষের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পদের প্রকৃত মর্যাদা কোথায়?
একজন মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও যদি অন্যের অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে তাঁর আর্থিক প্রাচুর্যকে একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা যায় না। অন্যদিকে, একজন সাধারণ মানুষ অল্প সম্পদের মালিক হয়েও যদি সৎভাবে উপার্জন করেন, অন্যের পাওনা পরিশোধ করেন এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করেন, তাহলে তাঁর জীবনেও রয়েছে মর্যাদা ও নৈতিক শক্তি।
সামাজিকভাবে সফল হওয়ার অর্থ শুধু অর্থবিত্ত বাড়ানো নয়। মানুষের আস্থা অর্জন করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, দুর্বলকে সম্মান করা এবং ন্যায্য পথে চলাও সাফল্যের অংশ।
যে সম্পদ মানুষের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দেয়, পরিবারকে নিরাপত্তা দেয় এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, সেই সম্পদই সম্মানজনক। আর অন্যের সম্পত্তি জোর করে দখল করে বা প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ নিয়ে গর্ব করার আগে প্রত্যেকের উচিত নিজের কাজের নৈতিকতা যাচাই করা।
শেষ কথা: অন্যের হক ফিরিয়ে দিন, আল্লাহকে ভয় করুন
একবার নিজের কাছে প্রশ্ন করুন—যে জমি বা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছে, তার প্রকৃত অধিকারী কে? যে অর্থ নিজের কাছে রেখেছেন, সেটি কি আপনার ন্যায্য পাওনা? আপনার সিদ্ধান্তের কারণে অন্য কোনো পরিবার কি তাদের নিরাপত্তা হারাচ্ছে? নিজের লাভের জন্য আপনি কি অন্যের অধিকারকে উপেক্ষা করছেন?
এই প্রশ্নগুলো শুধু ধর্মীয় আলোচনার বিষয় নয়; ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সামাজিক শান্তিরও ভিত্তি।
অন্যের জমি জোর করে দখল করবেন না। অন্যের সম্পত্তি প্রতারণার মাধ্যমে নিজের করে নেবেন না। ভাই-বোনের ন্যায্য অধিকার আটকে রাখবেন না। অসহায় মানুষের দুর্বলতাকে নিজের লাভের সুযোগ বানাবেন না।
পবিত্র কোরআন অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতে নিষেধ করেছে, আর সহিহ বুখারির হাদিসে অন্যায়ভাবে জমি গ্রহণের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। এই শিক্ষাগুলো প্রত্যেক মানুষকে নিজের কাজের হিসাব করতে এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করতে আহ্বান জানায়।
দুনিয়ার অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাব সাময়িক। তাই অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে সম্পদ বাড়ানোর পরিবর্তে ন্যায্য উপায়ে উপার্জন করুন, নিজের দায়িত্ব পালন করুন এবং ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করুন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে অন্যের হক নষ্ট করা থেকে রক্ষা করুন, হালাল ও ন্যায়সংগত উপার্জনের তৌফিক দিন এবং অন্যায় করে থাকলে তা স্বীকার করে সংশোধনের সাহস দান করুন। আমিন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০২:৩০:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
৬ বার পড়া হয়েছে

অন্যের জমি-জমা ও সম্পত্তি দখল করে সম্পদের পাহাড় নয়—আল্লাহর আদালতে দিতে হবে প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব

আপডেট সময় ০২:৩০:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

অন্যের জমি-জমা, বাড়ি ও সম্পত্তি জোর করে দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়বেন না—আল্লাহর কাছে একদিন প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব দিতে হবে
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা; দুনিয়ার ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব কি আখিরাতের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করতে পারবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একজন মানুষের সারা জীবনের উপার্জনে গড়ে ওঠা বাড়ি, বাবার রেখে যাওয়া এক টুকরো জমি, অসহায় পরিবারের শেষ সম্বল কিংবা ভাই-বোনের ন্যায্য উত্তরাধিকার—এসব কেবল সম্পত্তির হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, স্মৃতি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ। অথচ সেই সম্পত্তিই যখন অন্যের লোভের লক্ষ্য হয়ে ওঠে, যখন ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতারণা কিংবা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে কারও অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—সম্পদের জন্য মানুষ কতটা নির্মম হতে পারে? আর অন্যের হক নষ্ট করে অর্জিত সম্পদের হিসাব কি কখনো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব?
সমাজে সম্পদশালী হওয়ার প্রতিযোগিতা রয়েছে। কেউ কঠোর পরিশ্রম করে, সৎ ব্যবসা করে কিংবা বৈধ উপায়ে জমি-জমা কিনে নিজের অবস্থার উন্নতি করেন। এটি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক। কিন্তু কেউ যখন অন্যের সম্পত্তি নিজের করে নেওয়ার জন্য মিথ্যা দাবি তোলেন, প্রকৃত মালিককে দখল থেকে বঞ্চিত করেন, দুর্বল মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নেন কিংবা উত্তরাধিকারের ন্যায্য অংশ আটকে রাখেন, তখন সেই সম্পদ অর্জনের নৈতিকতা ও বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়।
একটি পরিবারকে তার বসতভিটা থেকে বঞ্চিত করে কেউ হয়তো নিজের জমির পরিমাণ বাড়ালেন। কোনো ভাইয়ের প্রাপ্য অংশ না দিয়ে আরেক ভাই হয়তো সম্পদশালী হলেন। কোনো অসহায় ব্যক্তির অর্থ আটকে রেখে কেউ হয়তো নিজের ব্যবসার পুঁজি বাড়ালেন। কিন্তু এসব কাজের মাধ্যমে অর্জিত আর্থিক সুবিধা কি অন্যায়ের দায় মুছে দিতে পারে?
ইসলামি বিশ্বাসের আলোকে উত্তরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিশ্বাস শুধু নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা থেকে বিরত থাকাও ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোরআনের সতর্কবাণী: অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করবেন না
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতে নিষেধ করেছেন। একই আয়াতে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে অর্জনের উদ্দেশ্যে বিচারিক কর্তৃপক্ষকে ব্যবহার করার বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়েছে। ।
এই নির্দেশের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কোনো ব্যক্তি যদি জানেন যে সম্পত্তিটি তাঁর নয়, অর্থটি তাঁর প্রাপ্য নয়, কিংবা অন্য ব্যক্তির ন্যায্য অধিকার রয়েছে, তারপরও অসৎ উপায়ে সেটি নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে বিষয়টি শুধু সামাজিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধর্মীয় দৃষ্টিতেও তা গুরুতর অন্যায়ের প্রশ্ন তৈরি করে।
কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, প্রভাব খাটিয়ে সম্পত্তি নিজের নামে নিতে পারলেই তিনি নিরাপদ। কেউ মনে করতে পারেন, প্রকৃত মালিক দুর্বল, তাঁর কাছে যথেষ্ট কাগজপত্র নেই, কিংবা তিনি মামলা করার সামর্থ্য রাখেন না—তাই তাঁর সম্পত্তি দখল করে রাখলেও সমস্যা হবে না।
কিন্তু সূরা আল-বাকারার এই আয়াত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, বাহ্যিকভাবে কোনো সম্পদ নিজের দখলে আনা আর ন্যায়সংগতভাবে তার অধিকারী হওয়া এক বিষয় নয়।
একইভাবে সূরা আন-নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ ব্যবসার কথা বলা হয়েছে এবং অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। ।
অর্থাৎ, ইসলাম সম্পদ অর্জনের বিরোধী নয়; বরং সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা, সততা ও বৈধতার ওপর গুরুত্ব দেয়। নিজের উন্নতির জন্য অন্যের অধিকার নষ্ট করা কোনো গ্রহণযোগ্য পথ হতে পারে না।
এক টুকরো জমির জন্যও রয়েছে কঠোর সতর্কবার্তা
জমি নিয়ে বিরোধে কখনো বছরের পর বছর মামলা চলে। কোথাও সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্ব, কোথাও উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ, আবার কোথাও প্রকৃত মালিকের অভিযোগ—তাঁর জমি জোর করে দখল করা হয়েছে।
জমির পরিমাণ যত ছোটই হোক, সেটি কারও কাছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। এক টুকরো জমিই হয়তো একটি পরিবারের বসতভিটা, জীবিকা কিংবা ভবিষ্যতের একমাত্র নিরাপত্তা।
সহিহ বুখারির ২৪৫৪ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যায়ভাবে অন্যের জমি গ্রহণের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। হাদিসটিতে কিয়ামতের দিন এর ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ রয়েছে। ।
এই সতর্কবাণীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক মানুষের নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা উচিত—যে জমির বৈধ মালিক আমি নই, সেটি নিজের করে নেওয়ার চেষ্টা কেন করছি? অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজের সম্পদ বাড়ানোর মধ্যে প্রকৃত সাফল্য কোথায়?
আজ হয়তো কোনো ব্যক্তি ক্ষমতার জোরে অন্যের জমিতে বেড়া দিলেন, সীমানা পরিবর্তন করলেন কিংবা প্রকৃত মালিককে জমিতে প্রবেশ করতে বাধা দিলেন। কিন্তু ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, দুনিয়ার সাময়িক দখলই চূড়ান্ত বিচারের মাপকাঠি নয়।
তবে জমি নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। প্রকৃত মালিকানা, দলিল, রেকর্ড, দখলের ইতিহাস ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনসম্মত প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। ধর্মীয় সতর্কবাণীর পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরপেক্ষ প্রক্রিয়াও অপরিহার্য।
অন্যের হক আত্মসাৎ করে সম্পদ বাড়ানো কি সত্যিকারের সাফল্য?
সম্পদের পরিমাণ দিয়ে মানুষের আর্থিক অবস্থান বোঝা যেতে পারে, কিন্তু তার চরিত্রের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। একজন ব্যক্তি কত বড় বাড়ির মালিক, কত জমির মালিক কিংবা তাঁর ব্যাংক হিসাবে কত টাকা আছে—এসব তথ্যের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে?
সৎ উপার্জন মানুষের সম্মান বাড়ায়। অন্যদিকে, প্রতারণা কিংবা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে অন্যের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
একটি পরিবার হয়তো বহু বছর ধরে পরিশ্রম করে জমি কিনেছে। সেই জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে পরিবারটির সঞ্চয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। কোনো উত্তরাধিকারী তাঁর প্রাপ্য অংশ না পেলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আবার কোনো ব্যবসায়ী অংশীদারের অর্থ আত্মসাৎ করলে অন্যের ব্যবসা ও জীবিকা বিপন্ন হতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে অন্যের ক্ষতি নিজের লাভে পরিণত করা শুধু অর্থনৈতিক অন্যায় নয়; এটি বিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্কেরও ক্ষতি করে।
আল্লাহকে ভয় করার অর্থ হলো, নিজের লাভের হিসাবের পাশাপাশি অন্যের অধিকারের কথাও স্মরণ রাখা। কেউ দেখছেন না বলে অন্যায় করা যাবে—এমন ধারণা একজন বিশ্বাসীর নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এতিম, দুর্বল ও অসহায় মানুষের সম্পত্তি নিয়ে সতর্ক থাকুন
পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ১০ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভোগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। ।
এতিম বা অসহায় মানুষের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাঁর ওপর থাকে, তাঁর কর্তব্য সেই সম্পদ আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করা। দায়িত্বের সুযোগ নিয়ে নিজের লাভের জন্য সেই সম্পদ ব্যবহার করা নৈতিকভাবে গুরুতর অন্যায়।
একইভাবে কোনো ব্যক্তি বৃদ্ধ, অসুস্থ, নিরক্ষর কিংবা আর্থিকভাবে দুর্বল বলে তাঁর সম্পত্তির অধিকার উপেক্ষা করা যায় না। কেউ দলিলের বিষয় বোঝেন না বলে তাঁকে ভুল বুঝিয়ে সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়া, তাঁর প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখা কিংবা তাঁর অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো—এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ন্যায়সংগত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজের শক্তিশালী মানুষের দায়িত্ব দুর্বলকে রক্ষা করা; দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়।
পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ: রক্তের সম্পর্কের চেয়েও কি লোভ বড়?
অন্যের সম্পত্তি আত্মসাতের প্রশ্ন অনেক সময় পরিবারের ভেতরেও দেখা দেয়। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, ভাই-বোনের উত্তরাধিকার, পারিবারিক ব্যবসার হিসাব কিংবা বসতভিটার মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।
কখনো কোনো ব্যক্তি নিজের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় অন্য উত্তরাধিকারীর অংশ দিতে চান না। কখনো আবার সম্পত্তির নথিপত্র নিজের কাছে রেখে অন্যদের অধিকার সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
প্রতিটি পারিবারিক বিরোধের ঘটনা ও আইনগত অবস্থান আলাদা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আত্মীয়তার সম্পর্ক কাউকে অন্যের ন্যায্য অধিকার আত্মসাৎ করার অনুমতি দেয় না।
যে ভাই বা বোনের বৈধ উত্তরাধিকার রয়েছে, তাঁর অধিকারকে সম্মান করা জরুরি। ইসলামি উত্তরাধিকারবিধি অনুযায়ী কার কতটুকু অংশ প্রাপ্য, তা সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধান অনুসারে নির্ধারণ করতে হবে। বিরোধ দেখা দিলে দলিলপত্র যাচাই এবং যোগ্য আইনজীবী বা আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সম্পদের জন্য সম্পর্ক নষ্ট করা, অন্যের প্রাপ্য আটকে রাখা কিংবা দুর্বল উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করার বদলে ন্যায়সংগত সমাধানের পথ বেছে নেওয়াই উত্তম।
দুনিয়ার আদালত আর আল্লাহর কাছে জবাবদিহি—দুটি ভিন্ন বিষয়
কোনো সম্পত্তি নিয়ে মামলা হলে আদালত দলিল, সাক্ষ্য, প্রাসঙ্গিক আইন ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়। আইনগত প্রক্রিয়ায় কারও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, আবার অভিযোগ প্রমাণিত না-ও হতে পারে।
কিন্তু ইসলামি বিশ্বাসে মানুষের বাহ্যিক অবস্থানের বাইরেও তার উদ্দেশ্য, কাজ ও নৈতিক দায়ের বিষয় রয়েছে। কেউ যদি জেনেশুনে অন্যের অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে শুধু বাহ্যিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা তাঁর কাজকে ন্যায়সংগত করে না।
পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতে প্রত্যেক প্রাণীর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ এবং কিয়ামতের দিন পূর্ণ প্রতিদান পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ।
এই বিশ্বাস মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন চিরস্থায়ী নয়। আজ যে বাড়ি, জমি ও অর্থ নিয়ে অহংকার করা হচ্ছে, একদিন সেসব সম্পদ দুনিয়াতেই থেকে যাবে। তাই সম্পদের মালিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ন্যায্যভাবে সম্পদ অর্জন ও মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্বও স্মরণ করা প্রয়োজন।
আল্লাহকে ভয় করা মানে শুধু শাস্তির কথা শুনে আতঙ্কিত হওয়া নয়; বরং অন্যায় করার আগে থেমে যাওয়া, ভুল বুঝতে পারলে সংশোধন করা এবং নিজের ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা।
অন্যের সম্পত্তি নিয়ে অন্যায় করে থাকলে সংশোধনের পথ কী?
মানুষ ভুল করতে পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পরও অন্যায় ধরে রাখা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা এক বিষয় নয়।
যদি কেউ অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখল করে থাকেন, তাহলে প্রথম কাজ হলো প্রকৃত মালিকানা ও অধিকার সম্পর্কে সত্য যাচাই করা। অন্যায় প্রমাণিত হলে সম্পত্তি বা তার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
কারও অর্থ আটকে থাকলে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষতি হয়ে থাকলে ক্ষতিপূরণ ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা, আইনজীবীর পরামর্শ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই সংশোধনের আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষমা করবেন কি না, তা তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত; তাঁর ওপর ক্ষমা করার চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।
আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি মানুষের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পদের প্রকৃত মর্যাদা কোথায়?
একজন মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও যদি অন্যের অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে তাঁর আর্থিক প্রাচুর্যকে একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা যায় না। অন্যদিকে, একজন সাধারণ মানুষ অল্প সম্পদের মালিক হয়েও যদি সৎভাবে উপার্জন করেন, অন্যের পাওনা পরিশোধ করেন এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করেন, তাহলে তাঁর জীবনেও রয়েছে মর্যাদা ও নৈতিক শক্তি।
সামাজিকভাবে সফল হওয়ার অর্থ শুধু অর্থবিত্ত বাড়ানো নয়। মানুষের আস্থা অর্জন করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, দুর্বলকে সম্মান করা এবং ন্যায্য পথে চলাও সাফল্যের অংশ।
যে সম্পদ মানুষের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দেয়, পরিবারকে নিরাপত্তা দেয় এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, সেই সম্পদই সম্মানজনক। আর অন্যের সম্পত্তি জোর করে দখল করে বা প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ নিয়ে গর্ব করার আগে প্রত্যেকের উচিত নিজের কাজের নৈতিকতা যাচাই করা।
শেষ কথা: অন্যের হক ফিরিয়ে দিন, আল্লাহকে ভয় করুন
একবার নিজের কাছে প্রশ্ন করুন—যে জমি বা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছে, তার প্রকৃত অধিকারী কে? যে অর্থ নিজের কাছে রেখেছেন, সেটি কি আপনার ন্যায্য পাওনা? আপনার সিদ্ধান্তের কারণে অন্য কোনো পরিবার কি তাদের নিরাপত্তা হারাচ্ছে? নিজের লাভের জন্য আপনি কি অন্যের অধিকারকে উপেক্ষা করছেন?
এই প্রশ্নগুলো শুধু ধর্মীয় আলোচনার বিষয় নয়; ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সামাজিক শান্তিরও ভিত্তি।
অন্যের জমি জোর করে দখল করবেন না। অন্যের সম্পত্তি প্রতারণার মাধ্যমে নিজের করে নেবেন না। ভাই-বোনের ন্যায্য অধিকার আটকে রাখবেন না। অসহায় মানুষের দুর্বলতাকে নিজের লাভের সুযোগ বানাবেন না।
পবিত্র কোরআন অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতে নিষেধ করেছে, আর সহিহ বুখারির হাদিসে অন্যায়ভাবে জমি গ্রহণের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। এই শিক্ষাগুলো প্রত্যেক মানুষকে নিজের কাজের হিসাব করতে এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করতে আহ্বান জানায়।
দুনিয়ার অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাব সাময়িক। তাই অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে সম্পদ বাড়ানোর পরিবর্তে ন্যায্য উপায়ে উপার্জন করুন, নিজের দায়িত্ব পালন করুন এবং ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করুন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে অন্যের হক নষ্ট করা থেকে রক্ষা করুন, হালাল ও ন্যায়সংগত উপার্জনের তৌফিক দিন এবং অন্যায় করে থাকলে তা স্বীকার করে সংশোধনের সাহস দান করুন। আমিন।