ঢাকা ১১:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর? মতলব উত্তরে মেঘনার ঘাটে ইলিশ বেচাকেনার অভিযোগ

নিজস্ব সংবাদ :

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মেঘনায় মা ইলিশের রমরমা বেচাকেনা, মতলব উত্তরে ছয় পয়েন্টে অস্থায়ী হাটের অভিযোগ
২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই নদী ও চরাঞ্চলে ইলিশ শিকার এবং প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগ; অভিযান চললেও পুরো সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনা নিয়ে প্রশ্ন
মতলব (চাঁদপুর) প্রতিনিধি | সিপাহি আল-আমিন :
ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। উদ্দেশ্য—মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইলিশের উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ করা। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা নদী ও আশপাশের চরাঞ্চলে মা ইলিশ শিকার, পরিবহন এবং প্রকাশ্যে কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নদীর কয়েকটি ঘাট ও প্রত্যন্ত এলাকায় অস্থায়ী হাট বসিয়ে ইলিশ বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও ট্রলার থেকে মাছ নামানো হচ্ছে, কোথাও পাইকারদের কাছে বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও নদীর পাড়েই চলছে খুচরা বেচাকেনা।
স্থানীয় সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার অন্তত ছয়টি পয়েন্টে ইলিশ কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থানের মধ্যে মোহনপুর পর্যটনকেন্দ্রের উত্তর পাশ, জাউলা-লাকান্দি, এখলাশপুর ঘাটের দক্ষিণ পাশ এবং নয়াকান্দি-বটতলা এলাকার নদীর পাড় ও জনতা বাজারের আশপাশের কয়েকটি স্থান রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ করা ছয়টি পয়েন্টের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, প্রতিদিনের মাছের পরিমাণ এবং বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালে এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইন অমান্যের ঘটনা নয়; বরং মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা, নদীভিত্তিক নজরদারি এবং অবৈধ মাছের বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
নদীতে অভিযান, তবু বাজারে ইলিশ—নজরদারির ফাঁক কোথায়?
স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভোর থেকে নদীর বিভিন্ন ঘাটে মাছভর্তি ট্রলারের আনাগোনা দেখা যায়। জেলেরা ঝুড়ি ও ডালিভর্তি মাছ নিয়ে তীরে ওঠেন। এরপর পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে মাছ চলে যায় বিভিন্ন ক্রেতার কাছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রলার ঘাটে পৌঁছানোর আগেই মাছ বিক্রির সমঝোতা হয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর ভোরে উপজেলার কয়েকটি নদীঘাটে মাছভর্তি ট্রলারের আনাগোনা এবং মাছ কেনাবেচার দৃশ্য দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। তাঁদের ভাষ্য, ভোর পাঁচটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে তৎপরতা বেশি থাকে। আবার সন্ধ্যার পরও কিছু এলাকায় মাছ বিক্রি চলতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি নির্ধারণে সরেজমিন যাচাই, নির্ভরযোগ্য ছবি-ভিডিও, জব্দের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রয়োজন। প্রতিদিন কত ট্রলার মাছ নিয়ে আসছে, কতজন জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছেন কিংবা কত পরিমাণ ইলিশ বাজারজাত হচ্ছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান চলার পরও যদি নদীর ঘাট ও চরাঞ্চলে অবৈধ মাছ শিকারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে নদীতে টহল, ঘাটে নজরদারি এবং মাছের পরিবহন ও বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হচ্ছে?
অস্থায়ী হাটে প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগ
মতলব উত্তর উপজেলার নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী হাট বসিয়ে ইলিশ কেনাবেচার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের দাবি, কিছু স্থানে ভোরে মাছ বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয় এবং ক্রেতারা সরাসরি নদীর পাড়ে গিয়ে মাছ কিনতে পারেন। এসব মাছের মধ্যে ডিমওয়ালা মা ইলিশ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
তবে মাছের প্রজননক্ষমতা কিংবা প্রতিটি বিক্রয়স্থলে ডিমওয়ালা মা ইলিশ থাকার বিষয়টি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ জন্য জব্দ করা মাছের নমুনা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাই জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চল ও নদীর পাড়ের কিছু স্থান যোগাযোগ ও নজরদারির সীমাবদ্ধতার কারণে অবৈধ মাছ বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। মূল নদীতে অভিযান হলেও মাছ যদি দ্রুত অন্য ঘাটে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে পুরো সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে নদীতে জাল ফেলা বন্ধের পাশাপাশি মাছ নামানোর ঘাট, নৌযান, পরিবহনপথ, পাইকারি ক্রয়কেন্দ্র এবং খুচরা বাজারেও সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ, প্রমাণ কোথায়?
অবৈধ মাছ শিকার ও বিক্রির বিষয়ে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে কোনো কোনো স্থানে মাছ ধরা ও কেনাবেচা চলছে। অভিযোগটি গুরুতর। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য কিংবা আনুষ্ঠানিক তদন্তের নথি পাওয়া যায়নি।
ফলে অভিযোগটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
কোনো অভিযানের তথ্য আগাম ফাঁস হচ্ছে কি না, অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ থাকে অথচ অভিযান শেষে আবার শুরু হয় কি না, কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ঘাট বারবার অভিযোগের তালিকায় আসছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা যেতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি যে-ই হোন, তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণ যাচাই করা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য অপরিহার্য।
অভিযান পরিচালনায় মৎস্য বিভাগ ও নৌ পুলিশের ভূমিকা
মা ইলিশ সংরক্ষণে মতলব উত্তর উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ এবং নৌ পুলিশের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযানে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে এবং মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা যুক্ত রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। অভিযানের সঙ্গে এসআই মহসিন, এএসআই জাহাঙ্গীর, মৎস্য অফিসের সহকারী আরিফ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মী মো. আবদুল বারেক ও নারায়ণ চন্দ্র দাসের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে জানিয়েছেন, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু অসাধু চক্র নদীতে জাল ফেলছে এবং বিভিন্ন স্থানে মাছ বিক্রি করছে। এসব অনিয়ম বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
মৎস্য বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান চললেও কিছু এলাকায় আইন অমান্যের ঘটনা ঘটছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোন এলাকায় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে, কোন সময়ে মাছ শিকারের প্রবণতা বাড়ছে এবং অবৈধ মাছ বাজারজাতকরণের পথগুলো কীভাবে বন্ধ করা যায়—তার কার্যকর পরিকল্পনা করা।
তবে নির্দিষ্ট ছয়টি পয়েন্টে অভিযান, জব্দ করা মাছের পরিমাণ, আটক ব্যক্তির সংখ্যা এবং দায়ের করা মামলার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে অভিযানের অগ্রগতি ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে।
নয়াকান্দি-বটতলায় অভিযান, এতিমখানায় মাছ দেওয়ার তথ্য
স্থানীয় সূত্রের দাবি, নয়াকান্দি-বটতলা এলাকার নদীর পাড়ে অভিযান চালিয়ে মা ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন মোহনপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসার এতিমখানায় প্রায় ২০ কেজি মাছ দেওয়া হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে জব্দ করা মাছের মোট পরিমাণ, জব্দের তারিখ ও সময়, জব্দ তালিকা, সংশ্লিষ্ট অভিযান পরিচালনাকারী দলের নথি এবং এতিমখানায় মাছ হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এসব নথি পাওয়া গেলে জব্দের ঘটনা ও মাছ বিতরণের তথ্য আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
জব্দ করা মাছ কীভাবে সংরক্ষণ, নিষ্পত্তি বা বিতরণ করা হচ্ছে, তার স্বচ্ছ নথি রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে অভিযান নিয়ে জনমনে আস্থা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন উঠলে তার জবাব দেওয়া সহজ হবে।
নিষেধাজ্ঞা ভাঙার পেছনে অর্থনৈতিক চাপও কি ভূমিকা রাখছে?
মা ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগের পেছনে আর্থিক লাভের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে দাবি করেছেন, বাজারে ইলিশের ভালো দাম পাওয়ার আশায় কিছু জেলে ও মৌসুমি ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ ধরতে ঝুঁকছেন।
জেলেদের একাংশের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি চালসহায়তা দিয়ে পরিবারের সব খরচ মেটানো কঠিন। আবার প্রকৃত জেলেদের কেউ কেউ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন বলেও তাঁরা দাবি করেছেন।
এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট জেলেদের অভিযোগ হিসেবে বিবেচ্য; সহায়তা বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করতে উপকারভোগীর তালিকা, বরাদ্দ, বিতরণ রেজিস্টার এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
তবে জীবিকার সংকট থাকলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকারের বৈধতা তৈরি হয় না। একইভাবে মৎস্যসম্পদ রক্ষার নামে প্রকৃত জেলেদের জীবিকার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না।
কার্যকর সমাধানের জন্য প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ, সময়মতো সহায়তা বিতরণ, তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা এবং নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যাঁরা সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, তাঁরা যেন বঞ্চিত না হন—তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
মা ইলিশ রক্ষা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়াই নিষেধাজ্ঞার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এই সময়ে প্রজননক্ষম ইলিশ নির্বিচারে ধরা হলে স্বাভাবিক প্রজননচক্র ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে ইলিশের পোনা উৎপাদন, মাছের প্রাপ্যতা এবং জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি আয়ের ওপর পড়তে পারে।
ইলিশ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। নদী ও উপকূলের অসংখ্য মানুষের জীবিকা এই মাছের সঙ্গে জড়িত। তাই স্বল্প সময়ের বাড়তি লাভের জন্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা হলে তার ক্ষতি শুধু একটি মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্বও ঝুঁকিতে পড়ে।
একটি মা ইলিশের সফল প্রজনন থেকে বিপুলসংখ্যক ডিম ও পরবর্তী সময়ে পোনা উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে প্রজননের অনুকূল পরিবেশ, ডিম ও পোনার টিকে থাকা এবং নদীর বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা জরুরি। এ কারণে নিষেধাজ্ঞার সময়ে মা ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি বন্ধ রাখা সংরক্ষণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শুধু নদীতে অভিযান নয়, বাজার পর্যন্ত নজরদারি জরুরি
মতলব উত্তর উপজেলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের কার্যকর অনুসন্ধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, স্থানীয়দের চিহ্নিত ছয়টি অভিযোগের পয়েন্টে পৃথকভাবে সরেজমিন যাচাই করে কোন স্থানে কখন মাছ বিক্রি হচ্ছে, তার নথি তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভোর ও সন্ধ্যার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী রাতেও আইনসম্মত টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, নদী থেকে মাছ পরিবহনে ব্যবহৃত নৌযান এবং মাছ নামানোর ঘাটগুলোতে সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন।
চতুর্থত, পাইকারি ক্রেতা, খুচরা বিক্রেতা এবং অস্থায়ী বাজারে মাছের উৎস যাচাই করতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিটি অভিযানের তারিখ, স্থান, জব্দ করা মাছের পরিমাণ, আটক ব্যক্তি এবং গৃহীত আইনগত ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা উচিত। এতে অভিযান কেবল আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলের দিকে এগোবে।
ষষ্ঠত, প্রশাসনের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনৈতিক সহযোগিতার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর প্রমাণ না পাওয়া গেলে কাউকে অযথা অভিযুক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
জবাবদিহি নিশ্চিত হলেই বাড়বে সংরক্ষণ অভিযানের কার্যকারিতা
মতলব উত্তরে মা ইলিশ শিকার ও প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে স্থানীয়দের বক্তব্যের পাশাপাশি প্রশাসনের নথি, অভিযান পরিচালনাকারীদের বিবরণ, বাজারের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট জেলেদের তথ্য একত্রে যাচাই করা প্রয়োজন।
নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় টহল পরিচালনা করা কঠিন—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু দুর্গম চরাঞ্চলকে নজরদারির বাইরে রেখে কিংবা মাছ বাজারে পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু নদীতে অভিযান পরিচালনা করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সরকারি নিষেধাজ্ঞার সফলতা নির্ভর করে নদীতে জাল ফেলা বন্ধ করার পাশাপাশি অবৈধ মাছের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর।
মেঘনার মা ইলিশ রক্ষা তাই কেবল মৎস্য বিভাগের একার দায়িত্ব নয়। প্রশাসন, নৌ পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, জেলে এবং সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত অভিযান এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, মতলব উত্তরের নদী ও চরাঞ্চলে ইলিশ শিকার এবং বিক্রির অভিযোগগুলো কত দ্রুত যাচাই করা হয় এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মা ইলিশের প্রজনন রক্ষা এবং জেলেদের ন্যায্য জীবিকা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:২০:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
৫ বার পড়া হয়েছে

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর? মতলব উত্তরে মেঘনার ঘাটে ইলিশ বেচাকেনার অভিযোগ

আপডেট সময় ১০:২০:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মেঘনায় মা ইলিশের রমরমা বেচাকেনা, মতলব উত্তরে ছয় পয়েন্টে অস্থায়ী হাটের অভিযোগ
২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই নদী ও চরাঞ্চলে ইলিশ শিকার এবং প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগ; অভিযান চললেও পুরো সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনা নিয়ে প্রশ্ন
মতলব (চাঁদপুর) প্রতিনিধি | সিপাহি আল-আমিন :
ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। উদ্দেশ্য—মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইলিশের উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ করা। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা নদী ও আশপাশের চরাঞ্চলে মা ইলিশ শিকার, পরিবহন এবং প্রকাশ্যে কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নদীর কয়েকটি ঘাট ও প্রত্যন্ত এলাকায় অস্থায়ী হাট বসিয়ে ইলিশ বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও ট্রলার থেকে মাছ নামানো হচ্ছে, কোথাও পাইকারদের কাছে বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও নদীর পাড়েই চলছে খুচরা বেচাকেনা।
স্থানীয় সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার অন্তত ছয়টি পয়েন্টে ইলিশ কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থানের মধ্যে মোহনপুর পর্যটনকেন্দ্রের উত্তর পাশ, জাউলা-লাকান্দি, এখলাশপুর ঘাটের দক্ষিণ পাশ এবং নয়াকান্দি-বটতলা এলাকার নদীর পাড় ও জনতা বাজারের আশপাশের কয়েকটি স্থান রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ করা ছয়টি পয়েন্টের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, প্রতিদিনের মাছের পরিমাণ এবং বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালে এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইন অমান্যের ঘটনা নয়; বরং মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা, নদীভিত্তিক নজরদারি এবং অবৈধ মাছের বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
নদীতে অভিযান, তবু বাজারে ইলিশ—নজরদারির ফাঁক কোথায়?
স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভোর থেকে নদীর বিভিন্ন ঘাটে মাছভর্তি ট্রলারের আনাগোনা দেখা যায়। জেলেরা ঝুড়ি ও ডালিভর্তি মাছ নিয়ে তীরে ওঠেন। এরপর পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে মাছ চলে যায় বিভিন্ন ক্রেতার কাছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রলার ঘাটে পৌঁছানোর আগেই মাছ বিক্রির সমঝোতা হয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর ভোরে উপজেলার কয়েকটি নদীঘাটে মাছভর্তি ট্রলারের আনাগোনা এবং মাছ কেনাবেচার দৃশ্য দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। তাঁদের ভাষ্য, ভোর পাঁচটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে তৎপরতা বেশি থাকে। আবার সন্ধ্যার পরও কিছু এলাকায় মাছ বিক্রি চলতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি নির্ধারণে সরেজমিন যাচাই, নির্ভরযোগ্য ছবি-ভিডিও, জব্দের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রয়োজন। প্রতিদিন কত ট্রলার মাছ নিয়ে আসছে, কতজন জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছেন কিংবা কত পরিমাণ ইলিশ বাজারজাত হচ্ছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান চলার পরও যদি নদীর ঘাট ও চরাঞ্চলে অবৈধ মাছ শিকারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে নদীতে টহল, ঘাটে নজরদারি এবং মাছের পরিবহন ও বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হচ্ছে?
অস্থায়ী হাটে প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগ
মতলব উত্তর উপজেলার নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী হাট বসিয়ে ইলিশ কেনাবেচার অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের দাবি, কিছু স্থানে ভোরে মাছ বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয় এবং ক্রেতারা সরাসরি নদীর পাড়ে গিয়ে মাছ কিনতে পারেন। এসব মাছের মধ্যে ডিমওয়ালা মা ইলিশ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
তবে মাছের প্রজননক্ষমতা কিংবা প্রতিটি বিক্রয়স্থলে ডিমওয়ালা মা ইলিশ থাকার বিষয়টি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ জন্য জব্দ করা মাছের নমুনা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাই জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চল ও নদীর পাড়ের কিছু স্থান যোগাযোগ ও নজরদারির সীমাবদ্ধতার কারণে অবৈধ মাছ বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। মূল নদীতে অভিযান হলেও মাছ যদি দ্রুত অন্য ঘাটে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে পুরো সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে নদীতে জাল ফেলা বন্ধের পাশাপাশি মাছ নামানোর ঘাট, নৌযান, পরিবহনপথ, পাইকারি ক্রয়কেন্দ্র এবং খুচরা বাজারেও সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ, প্রমাণ কোথায়?
অবৈধ মাছ শিকার ও বিক্রির বিষয়ে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে কোনো কোনো স্থানে মাছ ধরা ও কেনাবেচা চলছে। অভিযোগটি গুরুতর। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য কিংবা আনুষ্ঠানিক তদন্তের নথি পাওয়া যায়নি।
ফলে অভিযোগটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
কোনো অভিযানের তথ্য আগাম ফাঁস হচ্ছে কি না, অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ থাকে অথচ অভিযান শেষে আবার শুরু হয় কি না, কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ঘাট বারবার অভিযোগের তালিকায় আসছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা যেতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি যে-ই হোন, তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণ যাচাই করা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য অপরিহার্য।
অভিযান পরিচালনায় মৎস্য বিভাগ ও নৌ পুলিশের ভূমিকা
মা ইলিশ সংরক্ষণে মতলব উত্তর উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ এবং নৌ পুলিশের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযানে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে এবং মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা যুক্ত রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। অভিযানের সঙ্গে এসআই মহসিন, এএসআই জাহাঙ্গীর, মৎস্য অফিসের সহকারী আরিফ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মী মো. আবদুল বারেক ও নারায়ণ চন্দ্র দাসের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে জানিয়েছেন, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু অসাধু চক্র নদীতে জাল ফেলছে এবং বিভিন্ন স্থানে মাছ বিক্রি করছে। এসব অনিয়ম বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
মৎস্য বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান চললেও কিছু এলাকায় আইন অমান্যের ঘটনা ঘটছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোন এলাকায় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে, কোন সময়ে মাছ শিকারের প্রবণতা বাড়ছে এবং অবৈধ মাছ বাজারজাতকরণের পথগুলো কীভাবে বন্ধ করা যায়—তার কার্যকর পরিকল্পনা করা।
তবে নির্দিষ্ট ছয়টি পয়েন্টে অভিযান, জব্দ করা মাছের পরিমাণ, আটক ব্যক্তির সংখ্যা এবং দায়ের করা মামলার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে অভিযানের অগ্রগতি ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে।
নয়াকান্দি-বটতলায় অভিযান, এতিমখানায় মাছ দেওয়ার তথ্য
স্থানীয় সূত্রের দাবি, নয়াকান্দি-বটতলা এলাকার নদীর পাড়ে অভিযান চালিয়ে মা ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন মোহনপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসার এতিমখানায় প্রায় ২০ কেজি মাছ দেওয়া হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে জব্দ করা মাছের মোট পরিমাণ, জব্দের তারিখ ও সময়, জব্দ তালিকা, সংশ্লিষ্ট অভিযান পরিচালনাকারী দলের নথি এবং এতিমখানায় মাছ হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এসব নথি পাওয়া গেলে জব্দের ঘটনা ও মাছ বিতরণের তথ্য আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
জব্দ করা মাছ কীভাবে সংরক্ষণ, নিষ্পত্তি বা বিতরণ করা হচ্ছে, তার স্বচ্ছ নথি রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে অভিযান নিয়ে জনমনে আস্থা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন উঠলে তার জবাব দেওয়া সহজ হবে।
নিষেধাজ্ঞা ভাঙার পেছনে অর্থনৈতিক চাপও কি ভূমিকা রাখছে?
মা ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগের পেছনে আর্থিক লাভের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে দাবি করেছেন, বাজারে ইলিশের ভালো দাম পাওয়ার আশায় কিছু জেলে ও মৌসুমি ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ ধরতে ঝুঁকছেন।
জেলেদের একাংশের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি চালসহায়তা দিয়ে পরিবারের সব খরচ মেটানো কঠিন। আবার প্রকৃত জেলেদের কেউ কেউ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন বলেও তাঁরা দাবি করেছেন।
এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট জেলেদের অভিযোগ হিসেবে বিবেচ্য; সহায়তা বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করতে উপকারভোগীর তালিকা, বরাদ্দ, বিতরণ রেজিস্টার এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
তবে জীবিকার সংকট থাকলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকারের বৈধতা তৈরি হয় না। একইভাবে মৎস্যসম্পদ রক্ষার নামে প্রকৃত জেলেদের জীবিকার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না।
কার্যকর সমাধানের জন্য প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ, সময়মতো সহায়তা বিতরণ, তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা এবং নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যাঁরা সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, তাঁরা যেন বঞ্চিত না হন—তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
মা ইলিশ রক্ষা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়াই নিষেধাজ্ঞার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এই সময়ে প্রজননক্ষম ইলিশ নির্বিচারে ধরা হলে স্বাভাবিক প্রজননচক্র ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে ইলিশের পোনা উৎপাদন, মাছের প্রাপ্যতা এবং জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি আয়ের ওপর পড়তে পারে।
ইলিশ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। নদী ও উপকূলের অসংখ্য মানুষের জীবিকা এই মাছের সঙ্গে জড়িত। তাই স্বল্প সময়ের বাড়তি লাভের জন্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা হলে তার ক্ষতি শুধু একটি মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্বও ঝুঁকিতে পড়ে।
একটি মা ইলিশের সফল প্রজনন থেকে বিপুলসংখ্যক ডিম ও পরবর্তী সময়ে পোনা উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে প্রজননের অনুকূল পরিবেশ, ডিম ও পোনার টিকে থাকা এবং নদীর বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা জরুরি। এ কারণে নিষেধাজ্ঞার সময়ে মা ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি বন্ধ রাখা সংরক্ষণ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শুধু নদীতে অভিযান নয়, বাজার পর্যন্ত নজরদারি জরুরি
মতলব উত্তর উপজেলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের কার্যকর অনুসন্ধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, স্থানীয়দের চিহ্নিত ছয়টি অভিযোগের পয়েন্টে পৃথকভাবে সরেজমিন যাচাই করে কোন স্থানে কখন মাছ বিক্রি হচ্ছে, তার নথি তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভোর ও সন্ধ্যার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী রাতেও আইনসম্মত টহল ও নজরদারি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, নদী থেকে মাছ পরিবহনে ব্যবহৃত নৌযান এবং মাছ নামানোর ঘাটগুলোতে সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন।
চতুর্থত, পাইকারি ক্রেতা, খুচরা বিক্রেতা এবং অস্থায়ী বাজারে মাছের উৎস যাচাই করতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিটি অভিযানের তারিখ, স্থান, জব্দ করা মাছের পরিমাণ, আটক ব্যক্তি এবং গৃহীত আইনগত ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা উচিত। এতে অভিযান কেবল আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলের দিকে এগোবে।
ষষ্ঠত, প্রশাসনের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনৈতিক সহযোগিতার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে; আর প্রমাণ না পাওয়া গেলে কাউকে অযথা অভিযুক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
জবাবদিহি নিশ্চিত হলেই বাড়বে সংরক্ষণ অভিযানের কার্যকারিতা
মতলব উত্তরে মা ইলিশ শিকার ও প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে স্থানীয়দের বক্তব্যের পাশাপাশি প্রশাসনের নথি, অভিযান পরিচালনাকারীদের বিবরণ, বাজারের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট জেলেদের তথ্য একত্রে যাচাই করা প্রয়োজন।
নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় টহল পরিচালনা করা কঠিন—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু দুর্গম চরাঞ্চলকে নজরদারির বাইরে রেখে কিংবা মাছ বাজারে পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু নদীতে অভিযান পরিচালনা করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সরকারি নিষেধাজ্ঞার সফলতা নির্ভর করে নদীতে জাল ফেলা বন্ধ করার পাশাপাশি অবৈধ মাছের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর।
মেঘনার মা ইলিশ রক্ষা তাই কেবল মৎস্য বিভাগের একার দায়িত্ব নয়। প্রশাসন, নৌ পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, জেলে এবং সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত অভিযান এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, মতলব উত্তরের নদী ও চরাঞ্চলে ইলিশ শিকার এবং বিক্রির অভিযোগগুলো কত দ্রুত যাচাই করা হয় এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মা ইলিশের প্রজনন রক্ষা এবং জেলেদের ন্যায্য জীবিকা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।