তিন দশকের আন্দোলন, তবুও সড়কে মৃত্যুর মিছিল ব্যক্তিগত শোক থেকে জাতীয় অঙ্গীকার—ইলিয়াস কাঞ্চনের নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে?
ব্যক্তিগত শোক থেকে জাতীয় আন্দোলন: ইলিয়াস কাঞ্চনের নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন আজও অধরা
সড়কে ঝরছে প্রাণ, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তাব্যবস্থা—তিন দশকের আন্দোলনের পরও কেন থামছে না মৃত্যুর মিছিল?
বিশেষ প্রতিনিধি :
ঢাকা: একটি ব্যক্তিগত শোক কীভাবে একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারানোর বেদনা বুকে ধারণ করে ১৯৯৩ সালে তিনি যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে সেই আন্দোলন আজও বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ স্লোগান মানুষের অধিকার, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বছরের প্রচার, আন্দোলন, আইন প্রণয়ন ও সচেতনতা কার্যক্রমের পরও কেন সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না? কেন বাড়ি থেকে বের হওয়া একজন মানুষকে নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না? কেন সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোর বেদনা এখনো অসংখ্য পরিবারের জীবনের নির্মম বাস্তবতা?
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখলেই চলবে না; দেখতে হবে সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা, চালকের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের মান, পথচারীর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর জবাবদিহির বাস্তব চিত্র।
যে শোকের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল আন্দোলন
১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। তাঁর এই মৃত্যু ইলিয়াস কাঞ্চনের ব্যক্তিগত জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। কিন্তু শোকের কাছে পরাজিত না হয়ে তিনি সেই বেদনাকে মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকারে রূপান্তর করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’—নিসচা। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল একটি মৌলিক উপলব্ধি: সড়কে মানুষের মৃত্যু কমাতে হলে দুর্ঘটনাকে নিছক দুর্ভাগ্য হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না; এর কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
নিসচার প্রতিষ্ঠা ও ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের বিবরণ সংগঠনটির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর আন্দোলন ব্যক্তিগত শোকের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক সচেতনতার অংশ হয়ে উঠেছে।
জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যু আজও এই আন্দোলনের সূচনালগ্নের বেদনাময় স্মারক। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করেই ইলিয়াস কাঞ্চন বছরের পর বছর মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন নিরাপদ সড়কের বার্তা।
তিন দশকের বেশি সময়: অর্জন আছে, কিন্তু চ্যালেঞ্জও গভীর
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। চালকের দায়িত্ব, পথচারীর অধিকার, যানবাহনের ফিটনেস, ট্রাফিক আইন, অতিরিক্ত গতি এবং সড়কের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবে দুর্ঘটনা কমানো এক বিষয় নয়। মানুষ ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানলেও যদি তার কার্যকর প্রয়োগ না থাকে, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই যথাযথ না হয়, সড়কের বিপজ্জনক স্থানগুলো সংস্কার করা না হয়, তাহলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন অর্জন কঠিন।
২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস কাঞ্চন মোটরযানের গতিসীমা নির্দেশিকা-২০২৪ দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দেশিকার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে সড়ক নিরাপত্তার সুফল পাওয়া যাবে না।
এখানেই সড়ক নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ—নীতিমালা তৈরি করাই শেষ কথা নয়; সেই নীতি মাঠপর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে কি না, তারও জবাবদিহি থাকতে হবে।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান: উদ্বেগ কাটছে না
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হন। সংগঠনটি সংবাদপত্র, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও নিজস্ব সূত্রের তথ্য ব্যবহার করে এই হিসাব প্রস্তুত করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১ হাজার ৮ জন শিশু এবং ৯৬২ জন নারী ছিলেন। একই বছরে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জনের মৃত্যু হয়। পথচারী নিহত হন ১ হাজার ৫৬৪ জন।
এই হিসাব একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আনে—সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি শুধু পেশাদার চালক বা দূরপাল্লার যাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশু, নারী, মোটরসাইকেল আরোহী এবং সাধারণ পথচারীও এই বিপদের শিকার হচ্ছেন।
তবে পরিসংখ্যান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব সংবাদমাধ্যম ও অন্যান্য সূত্রনির্ভর; সরকারি সংস্থার তথ্য সংগ্রহ ও গণনার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব তুলনা করার আগে তাদের তথ্যের সংজ্ঞা ও সংগ্রহপদ্ধতি বিবেচনা করতে হবে।
তারপরও এসব তথ্য যে প্রশ্নটি সামনে আনে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: সড়ক নিরাপত্তায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং কোথায় আরও জোরালো ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন?
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: ঝুঁকি কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জনের মৃত্যুর তথ্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। দ্রুতগতিতে চলাচল, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার মতো বিষয়গুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ আলাদাভাবে তদন্ত না করে সব মৃত্যুর জন্য একটি কারণকে দায়ী করা সঠিক নয়। সড়কের নকশা, যানবাহনের অবস্থা, দৃশ্যমানতা, আবহাওয়া এবং অন্যান্য যানবাহনের আচরণও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে নজরদারি, নিরাপদ গতি নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই, বিপজ্জনক সড়ক চিহ্নিত করা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পথচারীর নিরাপত্তা কোথায়?
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় অনেক সময় চালক ও যানবাহনের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। কিন্তু সড়ক ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ পথচারী, যাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নগর ও মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
নিরাপদ ফুটপাত, কার্যকর জেব্রা ক্রসিং, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, পথচারী পারাপারের উপযুক্ত সময় এবং স্কুল, হাসপাতাল ও জনবহুল এলাকার আশপাশে গতিসীমা কার্যকর করা জরুরি।
ফুটপাত দখলমুক্ত না থাকলে, পথচারী পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকলে কিংবা দ্রুতগতির যানবাহনের সামনে অসহায়ভাবে রাস্তা পার হতে হলে শুধু পথচারীকে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
নিরাপদ সড়কের পরিকল্পনায় তাই পথচারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহি: মূল প্রশ্ন এখানেই
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আইন থাকা যেমন জরুরি, তেমনি সেই আইন সবার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক চালনা, অনুপযুক্ত যানবাহন চলাচল এবং গুরুতর ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, কোন কোন সড়ককে দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলোর ঝুঁকি কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
দ্বিতীয়ত, যানবাহনের ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স যাচাই কতটা নিয়মিত এবং কার্যকর?
তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার তদন্তে কারণগুলো কতটা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কী অগ্রগতি হচ্ছে?
চতুর্থত, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আইনি সহায়তা ও প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সরকারি প্রতিবেদন, দুর্ঘটনার তদন্ত নথি, সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ করা দরকার। নির্দিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না; তবে জনস্বার্থে এসব বিষয়ের স্বচ্ছ পর্যালোচনা অপরিহার্য।
দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধ
সড়ক নিরাপত্তার কার্যকর নীতি হতে হবে প্রতিরোধকেন্দ্রিক। দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত, চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার আগে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোই সবচেয়ে জরুরি।
এ জন্য প্রয়োজন সড়কের নিরাপত্তা নিরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও মোড়ের উন্নয়ন, গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, যানবাহনের নিয়মিত পরীক্ষা এবং চালকদের প্রশিক্ষণ।
একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোন সড়কে কী ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, কোন সময়ে ঝুঁকি বাড়ছে, কোন শ্রেণির যানবাহন বেশি জড়িত এবং কোন প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপে ফল মিলছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।
সরকারি সংস্থা, পুলিশ, বিআরটিএ, সড়ক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, নাগরিক সংগঠন এবং স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া এই উদ্যোগ পূর্ণতা পাবে না।
ইলিয়াস কাঞ্চনের স্বপ্ন: আন্দোলন চলুক মানুষের হাতে
ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘ সংগ্রামের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, তিনি নিরাপদ সড়কের দাবিকে নিজের ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর আহ্বান—তিনি না থাকলেও যেন মানুষ নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে—এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গভীর বার্তা বহন করে।
একটি আন্দোলন তখনই স্থায়ী হয়, যখন তা প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছাড়িয়ে সামাজিক দায়িত্বে পরিণত হয়। নিরাপদ সড়কের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা প্রযোজ্য।
চালককে দায়িত্বশীল হতে হবে, যাত্রীকে সচেতন হতে হবে, পথচারীকে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তার নামে নেওয়া প্রতিটি উদ্যোগের ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে।
ইলিয়াস কাঞ্চনের ব্যক্তিগত শোক থেকে জন্ম নেওয়া আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, একজন মানুষের বেদনা অন্য মানুষের জীবন রক্ষার প্রেরণা হতে পারে। কিন্তু সেই প্রেরণাকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে দরকার ধারাবাহিক উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সর্বস্তরে জবাবদিহি।
শেষ কথা: নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার নিশ্চিত হোক
একটি সড়ক শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার পথ নয়; এটি মানুষের জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উন্নয়নেরও একটি মৌলিক শর্ত।
ইলিয়াস কাঞ্চনের তিন দশকের বেশি সময়ের সংগ্রাম বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে ধরেছে—সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিকে অনিবার্য বলে মেনে না নেওয়া এবং প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি কমাতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া।
এই আন্দোলনের সাফল্য শুধু কতটি সভা হলো, কতটি স্লোগান উঠল কিংবা কতটি কর্মসূচি পালিত হলো, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমছে কি না, মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারছে কি না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করছে কি না।
ইলিয়াস কাঞ্চনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অর্থ হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে একজন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ফিরে আসার অধিকার পাবেন; যেখানে আর কোনো পরিবারকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিয়জন হারানোর বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে না।
নিরাপদ সড়ক চাই—এটি শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।


















