জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক: শহীদদের স্মরণে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি, প্রশ্নের মুখে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা
জুলাইয়ের স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি, রাজনৈতিক দূরত্ব নাকি আদর্শিক অবস্থানের প্রশ্ন?
প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনায় নতুন করে আলোচনায় জুলাইয়ের চেতনা ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা; শহীদ পরিবারের উপস্থিতিতে স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন, বিরোধী দলের অনুপস্থিতি ঘিরে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাঁদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে উদ্বোধন করা হয়েছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। ১৯ অক্টোবর, সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েও বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অংশ না নেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির বিষয়টি সামনে এনে কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করলে বিরোধী দলের নেতারা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে পারতেন। সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের রাজনৈতিক দূরত্ব থাকতেই পারে, কিন্তু জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রশ্নে সেই দূরত্বকে সামনে আনা কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন
সোমবার সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলম উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর তিনি স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন করে এর বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন এবং একটি আলোচনা সভায় অংশ নেন।
শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে আবেগঘন মাত্রা যোগ করে। যাঁদের সন্তানদের আত্মত্যাগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সামনে রেখে স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন ছিল শহীদদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তবে অনুষ্ঠানের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়ে যায় বিরোধী দলের নেতাদের অনুপস্থিতির কারণে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাঁদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
‘সরকারের সঙ্গে দূরত্ব থাকুক, শহীদদের সঙ্গে নয়’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের রাজনৈতিক দূরত্ব থাকতে পারে। কিন্তু যাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে, তাঁদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া ভিন্ন বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনকে এক করে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, বিরোধী দল সরকারের বিরোধিতা করতে পারে, সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারে; কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া ও আহত হওয়া মানুষের প্রতি সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে ওঠা প্রয়োজন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের কারণে যাঁরা আজ বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ও নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁদেরই স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের দেখা গেল না কেন?
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এতে তিনি বিরোধী দলের বর্তমান অবস্থানকে শুধু একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করার বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং জুলাইয়ের চেতনার প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তবে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কারণ সম্পর্কে তাদের নিজস্ব বক্তব্য বা ব্যাখ্যা জানা না থাকলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। তারা কেন অনুষ্ঠানে যায়নি, আমন্ত্রণের বিষয়ে তাদের অবস্থান কী ছিল এবং অনুপস্থিতির পেছনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কারণ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট দলের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাইয়ের চেতনা কি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মানুষ, প্রাণ হারানো শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের অবদান নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নানা আলোচনা রয়েছে। তাঁদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করা, ইতিহাস সংরক্ষণ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক আন্দোলনের স্মৃতি যখন রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সেই স্মৃতির সর্বজনীনতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই এখানে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
সরকারের উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে উদ্বোধন নিঃসন্দেহে স্মৃতি সংরক্ষণের একটি দৃশ্যমান উদ্যোগ। তবে স্মৃতিস্তম্ভের গুরুত্ব কেবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদদের পরিচিতি ও অবদান নথিবদ্ধ করা, আহত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং তাঁদের পরিবারের বাস্তব সমস্যার সমাধান।
একইভাবে বিরোধী দলের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন রয়েছে। জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট করা এবং শহীদদের প্রতি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা রাজনৈতিক স্বচ্ছতার অংশ।
অতএব, জুলাইয়ের চেতনা ধারণের বিষয়টি শুধু অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বা না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন।
বিএনপির দাবি: জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধ—দুই ইতিহাসই ধারণ করে দলটি
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিএনপি যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেও ধারণ করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার গঠনের পর থেকে জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সরকার জুলাইয়ের শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের কল্যাণে গৃহীত উদ্যোগকে নিজেদের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
তবে এ ধরনের দাবির মূল্যায়ন করতে হলে শুধু বক্তব্যের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। আহত ব্যক্তিদের কতজন চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন, কতটি পরিবার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ কতজনের জন্য নিশ্চিত হয়েছে এবং এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি কী—তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা যাচাইয়ের জন্য স্বচ্ছ তথ্য, নিয়মিত প্রতিবেদন এবং উপকারভোগীদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শহীদ পরিবারের প্রতি সম্মান কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে নয়, তাঁদের জীবনমানের উন্নয়নেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
এখানে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে। শহীদ পরিবারের প্রয়োজন, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের জবাবদিহি বাড়বে।
বিরোধিতা কি বিরোধিতার জন্যই?
বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, দেশের মানুষ দেখছে—বিরোধী দল বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা করে যাচ্ছে। তাঁর সতর্কবার্তা, বিরোধিতা করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত হয়।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিণতি জুলাইয়ের শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে; একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিও অবিচার করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনার পাশাপাশি অতীতের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।
তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা, নীতির বিকল্প প্রস্তাব, অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় প্রশ্ন তোলাও বিরোধী দলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ।
অন্যদিকে, বিরোধিতার নামে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্নে অযৌক্তিক অবস্থান নেওয়া হলে সেটিও জনসমালোচনার কারণ হতে পারে। তাই প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য দেখতে হবে, বিরোধী দল কোন বিষয়ে আপত্তি জানাচ্ছে, তাদের যুক্তি কী এবং বিকল্প প্রস্তাব কতটা কার্যকর।
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট দলের বক্তব্য, আমন্ত্রণের প্রেক্ষাপট এবং সিদ্ধান্তের কারণ যাচাই না করে একে চূড়ান্তভাবে জুলাইবিরোধী অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সংবাদপত্র খুললেই ডেঙ্গুর খবর দেখা যাচ্ছে এবং বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রায় দেড় মাস ধরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার গঠনের পর প্রথম দিকে ফজরের নামাজের পর বিভিন্ন স্থানে মানুষকে ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে দেখা গেলেও এখন আর সেই কার্যক্রম তেমন চোখে পড়ে না।
তিনি মন্তব্য করেন, এডিস মশা সরকারি দল বা বিরোধী দল—কাউকেই আলাদা করে চেনে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ—তাঁর বক্তব্যে এই বার্তাই উঠে আসে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ফল পেতে নিয়মিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ, নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত স্থাপনা তদারকি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আক্রান্ত এলাকার ঝুঁকিভিত্তিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, বাড়ির মালিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। কয়েক দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, বরং ধারাবাহিক তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ডেঙ্গু প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের একটি জরুরি বিষয়ও সামনে এসেছে।
স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনের পরও যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু একটি স্মৃতিস্তম্ভের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করে সেটিকে ঘিরে রাষ্ট্র ও সমাজ কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তার ওপর।
প্রথমত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, শহীদদের পরিচয় এবং তাঁদের অবদান নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা জরুরি। তৃতীয়ত, শহীদ পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার।
চতুর্থত, স্মৃতিস্তম্ভটি যেন কেবল কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস জানার একটি নির্ভরযোগ্য স্থান হয়ে ওঠে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নিয়ে আলোচনা ও সংলাপের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। মতভিন্নতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু সেই মতভিন্নতা যেন ইতিহাসের তথ্য যাচাই, শহীদদের মর্যাদা রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতা
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার বিষয়টিকে জুলাইয়ের চেতনা ধারণের প্রশ্ন হিসেবে সামনে এনেছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ জানতে হলে তাদের বক্তব্যও শোনা প্রয়োজন।
এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জুলাইয়ের শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগ যেন দলীয় বিতর্কের আড়ালে হারিয়ে না যায়। শহীদদের স্মরণ করা, তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব।
রাজনৈতিক দলগুলো কে অনুষ্ঠানে গেল, কে গেল না—এই প্রশ্নের বাইরে গিয়ে যদি শহীদ পরিবারের কল্যাণ, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, ইতিহাস সংরক্ষণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কার্যকর ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারে, তাহলে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের তাৎপর্য আরও গভীর হবে।
শেষ পর্যন্ত কোনো স্মৃতিস্তম্ভের মূল্য শুধু তার নির্মাণ বা উদ্বোধনে নির্ধারিত হয় না। এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয়, যে মানুষগুলোর আত্মত্যাগের স্মরণে সেটি নির্মিত হয়েছে, তাঁদের স্বপ্ন, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা দায়িত্ব পালন করছে, তার মধ্য দিয়ে।
জুলাইয়ের স্মৃতি তাই কেবল অতীতের একটি অধ্যায় নয়; এটি বর্তমানের রাজনৈতিক আচরণ, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথচলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।


















