ঢাকা ০৯:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভয়ের বাংলাদেশ নয়, অপরাধীর ছাড় নেই’: রাষ্ট্রপতি

নিজস্ব সংবাদ :

‘আর কোনো আয়নাঘর নয়’—নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় কাঁদবে না কোনো পরিবার: রাষ্ট্রপতি
গুমের প্রতিটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার, অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক ছাড় নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
জোরপূর্বক গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। কোনো মা যেন নিখোঁজ সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় বছরের পর বছর চোখের পানি না ফেলেন, কোনো স্ত্রী যেন স্বামীর ফিরে আসার আশায় অনিশ্চয়তার জীবন কাটাতে না হয়—এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি মানুষকে গুম করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে তার পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও কার্যত থমকে যায়। বছরের পর বছর স্বজনের কোনো সন্ধান না পাওয়া পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক চাপ ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
গুম শুধু নিখোঁজ নয়, একটি পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে আসে গুমের ভয়াবহ সামাজিক ও মানবিক প্রভাবের বিষয়টি। কোনো ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো তথ্য না থাকলে তার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। প্রিয়জন জীবিত না মৃত—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও অনেক ক্ষেত্রে পরিবার পায় না।
এই পরিস্থিতি একটি পরিবারের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে বিপর্যস্ত করে। সন্তান হারানো বাবা-মা, স্বামী হারানো স্ত্রী কিংবা অভিভাবকহীন হয়ে পড়া সন্তানেরা দীর্ঘদিন ধরে যে মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তার প্রভাব ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পুরো সমাজে পড়ে।
রাষ্ট্রপতি মনে করেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের পরিবারগুলোর প্রতিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
গত দেড় দশকের অভিযোগ সামনে এনে কঠোর বার্তা
রাষ্ট্রপতি গত দেড় দশকের ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ওই সময়ে ভিন্নমত পোষণকারী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি, অধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে তুলে নেওয়া, গুম এবং গোপনে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
অনেক পরিবার বছরের পর বছর তাদের স্বজনের কোনো সন্ধান পায়নি। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় পর ফিরে এলেও অনেকেই এখনো নিখোঁজ।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে—গুমের মতো ঘটনা কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতার আড়ালে চাপা পড়ে থাকতে পারে না। প্রতিটি ঘটনার সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
কমিশনের প্রতিবেদনে ১,৫৬৯ গুমের ঘটনা
গুমের তদন্তে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭ জনের নিখোঁজ হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর তথ্যও উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুমের অভিযোগের ব্যাপকতা ও গভীরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন শুধু বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, ছাড় নয়’
গুমের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, তার পরিচয়, পদ কিংবা অবস্থান কোনোভাবেই বিচারের পথে বাধা হতে পারবে না।
তবে একই সঙ্গে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও প্রতিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নয়; বরং প্রমাণ, আইন, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দায় নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে—রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এমন বার্তাই উঠে এসেছে।
‘ভয়ের বাংলাদেশ নয়, অধিকারভিত্তিক বাংলাদেশ’
রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয় থাকবে না; রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু নিপীড়ন থাকবে না; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকবে, তবে তা সংবিধান ও আইনের অধীনেই পরিচালিত হবে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
পরিবারগুলোর দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘদিন ধরে স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা বলেন তিনি।
কারণ একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর শুধু তার ব্যক্তিগত জীবনই থেমে যায় না; পরিবারের উপার্জন, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
তাই নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার পরিবারের পুনর্বাসনও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি।
আন্তর্জাতিক সনদ ও বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার বার্তা
রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। গুমসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধের বিচার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এগিয়ে নেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
এতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়ার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
‘আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি আসে রাষ্ট্রপতির শেষ বক্তব্যে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না।
এই বক্তব্য শুধু একটি স্থাপনা বা আটককেন্দ্রকে বোঝায় না; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে গোপন আটক, নিখোঁজ করে দেওয়া এবং জবাবদিহিহীনতার যে অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকার হিসেবেই এটি দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে তাই দুটি বিষয় স্পষ্ট—প্রথমত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে হবে; দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কাউকে গুম বা গোপনে আটকে রাখার সুযোগ রাখা যাবে না।
ন্যায়বিচারই হতে পারে ক্ষত সারানোর পথ
গুমের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তাদের স্বজনদের কী হয়েছিল, কারা দায়ী এবং তারা কখন ন্যায়বিচার পাবেন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন রাষ্ট্রের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
শুধু তদন্ত বা প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত অবস্থান উদঘাটন, ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা এবং প্রমাণিত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করাই হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে সেই প্রত্যাশাই প্রতিফলিত হয়েছে।
একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে উন্নয়ন বা প্রতিষ্ঠান—কোনোটিই মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে না। আর সেই কারণেই গুমের মতো অপরাধের বিচার শুধু অতীতের হিসাব চুকানো নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার ভিত্তি শক্ত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশা—এমন বাংলাদেশ, যেখানে কোনো মা সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় কাঁদবেন না, কোনো স্ত্রী প্রিয়জনের খোঁজে বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন না এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে কোনো ‘আয়নাঘর’ আর কখনো তৈরি হবে না।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ০৯:৩১:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
১ বার পড়া হয়েছে

ভয়ের বাংলাদেশ নয়, অপরাধীর ছাড় নেই’: রাষ্ট্রপতি

আপডেট সময় ০৯:৩১:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

‘আর কোনো আয়নাঘর নয়’—নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় কাঁদবে না কোনো পরিবার: রাষ্ট্রপতি
গুমের প্রতিটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার, অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক ছাড় নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
জোরপূর্বক গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। কোনো মা যেন নিখোঁজ সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় বছরের পর বছর চোখের পানি না ফেলেন, কোনো স্ত্রী যেন স্বামীর ফিরে আসার আশায় অনিশ্চয়তার জীবন কাটাতে না হয়—এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি মানুষকে গুম করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে তার পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও কার্যত থমকে যায়। বছরের পর বছর স্বজনের কোনো সন্ধান না পাওয়া পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক চাপ ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
গুম শুধু নিখোঁজ নয়, একটি পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে আসে গুমের ভয়াবহ সামাজিক ও মানবিক প্রভাবের বিষয়টি। কোনো ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো তথ্য না থাকলে তার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। প্রিয়জন জীবিত না মৃত—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও অনেক ক্ষেত্রে পরিবার পায় না।
এই পরিস্থিতি একটি পরিবারের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে বিপর্যস্ত করে। সন্তান হারানো বাবা-মা, স্বামী হারানো স্ত্রী কিংবা অভিভাবকহীন হয়ে পড়া সন্তানেরা দীর্ঘদিন ধরে যে মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তার প্রভাব ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পুরো সমাজে পড়ে।
রাষ্ট্রপতি মনে করেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের পরিবারগুলোর প্রতিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
গত দেড় দশকের অভিযোগ সামনে এনে কঠোর বার্তা
রাষ্ট্রপতি গত দেড় দশকের ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ওই সময়ে ভিন্নমত পোষণকারী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি, অধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে তুলে নেওয়া, গুম এবং গোপনে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
অনেক পরিবার বছরের পর বছর তাদের স্বজনের কোনো সন্ধান পায়নি। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় পর ফিরে এলেও অনেকেই এখনো নিখোঁজ।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে—গুমের মতো ঘটনা কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতার আড়ালে চাপা পড়ে থাকতে পারে না। প্রতিটি ঘটনার সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
কমিশনের প্রতিবেদনে ১,৫৬৯ গুমের ঘটনা
গুমের তদন্তে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭ জনের নিখোঁজ হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর তথ্যও উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুমের অভিযোগের ব্যাপকতা ও গভীরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন শুধু বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, ছাড় নয়’
গুমের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, তার পরিচয়, পদ কিংবা অবস্থান কোনোভাবেই বিচারের পথে বাধা হতে পারবে না।
তবে একই সঙ্গে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও প্রতিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নয়; বরং প্রমাণ, আইন, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দায় নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে—রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এমন বার্তাই উঠে এসেছে।
‘ভয়ের বাংলাদেশ নয়, অধিকারভিত্তিক বাংলাদেশ’
রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয় থাকবে না; রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু নিপীড়ন থাকবে না; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকবে, তবে তা সংবিধান ও আইনের অধীনেই পরিচালিত হবে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
পরিবারগুলোর দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘদিন ধরে স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা বলেন তিনি।
কারণ একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর শুধু তার ব্যক্তিগত জীবনই থেমে যায় না; পরিবারের উপার্জন, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
তাই নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার পরিবারের পুনর্বাসনও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি।
আন্তর্জাতিক সনদ ও বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার বার্তা
রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। গুমসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধের বিচার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এগিয়ে নেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
এতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়ার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
‘আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না’
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি আসে রাষ্ট্রপতির শেষ বক্তব্যে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না।
এই বক্তব্য শুধু একটি স্থাপনা বা আটককেন্দ্রকে বোঝায় না; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে গোপন আটক, নিখোঁজ করে দেওয়া এবং জবাবদিহিহীনতার যে অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকার হিসেবেই এটি দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে তাই দুটি বিষয় স্পষ্ট—প্রথমত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে হবে; দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কাউকে গুম বা গোপনে আটকে রাখার সুযোগ রাখা যাবে না।
ন্যায়বিচারই হতে পারে ক্ষত সারানোর পথ
গুমের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তাদের স্বজনদের কী হয়েছিল, কারা দায়ী এবং তারা কখন ন্যায়বিচার পাবেন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন রাষ্ট্রের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
শুধু তদন্ত বা প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত অবস্থান উদঘাটন, ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা এবং প্রমাণিত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করাই হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে সেই প্রত্যাশাই প্রতিফলিত হয়েছে।
একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে উন্নয়ন বা প্রতিষ্ঠান—কোনোটিই মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে না। আর সেই কারণেই গুমের মতো অপরাধের বিচার শুধু অতীতের হিসাব চুকানো নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার ভিত্তি শক্ত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশা—এমন বাংলাদেশ, যেখানে কোনো মা সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় কাঁদবেন না, কোনো স্ত্রী প্রিয়জনের খোঁজে বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন না এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে কোনো ‘আয়নাঘর’ আর কখনো তৈরি হবে না।