ঢাকা ১০:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দারিদ্র পরিবারে লেখাপড়া করে ৭৪ লক্ষ টাকা বৃত্তি পেল

নিজস্ব সংবাদ :

দারিদ্র্যের দেয়াল পেরিয়ে জেমির ৭৪ লাখের বৃত্তি
মেধা, পরিশ্রম ও সুযোগ—তিনের সমন্বয়ে বদলে যাচ্ছে শায়েস্তাগঞ্জের এক তরুণীর স্বপ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের পশ্চিম লেঞ্জাপাড়া গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি। ছোট ব্যবসায়ী বাবার সীমিত আয়ের সংসারে বেড়ে ওঠা এই তরুণীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন একসময় ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল সীমিত, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বড়। সেই স্বপ্নের পথেই এবার এসেছে অভাবনীয় সাফল্য—চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়াশোনার জন্য চার বছরে প্রায় ৭৪ লাখ টাকার সমমূল্যের বৃত্তি পেয়েছেন জেমি।
এই বৃত্তির মোট মূল্য ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির পরিচালক মৌরি রহমান গত মঙ্গলবার চিঠির মাধ্যমে জেমিকে বৃত্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রতি বছর ১৫ হাজার মার্কিন ডলার করে পাবেন তিনি।
সংকটই থামাতে পারেনি স্বপ্ন
জেমির বাবা আফজল আলী একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পরিবারের নিত্যদিনের ব্যয় সামলে মেয়ের উচ্চশিক্ষার বিশাল খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। ফলে এই বৃত্তি জেমির জন্য যেমন শিক্ষাজীবনের বড় সুযোগ, তেমনি পরিবারের জন্যও বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি।
তবে জেমির সাফল্যের পেছনে শুধু বৃত্তির সুযোগ নয়—ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা।
২০২৫ সালে জহুর চান বিবি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। এরপর শেভরন বাংলাদেশের সহায়তায় পরিচালিত এক মাসের সামার স্কুল কার্যক্রমে অংশ নেন।
নতুন পরিবেশ, নতুন লড়াই
গত ২০ জুলাই শুরু হওয়া সামার স্কুলে বিজ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনার পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান জেমি।
প্রথমদিকে বিষয়টি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু হাল ছাড়েননি। নিয়মিত পড়াশোনা, আগ্রহ এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সফলভাবে কার্যক্রম শেষ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও পারিবারিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বৃত্তির জন্য তাঁকে নির্বাচিত করা হয়।
এখানেই জেমির গল্পটি হয়ে ওঠে অন্যরকম। আর্থিক সামর্থ্য যেখানে উচ্চশিক্ষার পথে বড় বাধা, সেখানে একটি সুযোগ এবং সেই সুযোগ কাজে লাগানোর সক্ষমতা কীভাবে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে—জেমির অর্জন তারই উদাহরণ।
চিঠি হাতে বদলে গেল দুশ্চিন্তার চিত্র
বৃত্তির খবর পাওয়ার মুহূর্তটিও জেমির জন্য ছিল অবিশ্বাস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি হাতে পাওয়ার পর প্রথমে তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে এত বড় একটি বৃত্তি সত্যিই তাঁর জন্য। বারবার চিঠিটি পড়ে নিশ্চিত হন তিনি।
একসময় যে পরিবারে মেয়ের উচ্চশিক্ষার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, এখন সেই পরিবারই মেয়ের স্বপ্নপূরণের নতুন পথ দেখতে পাচ্ছে।
জেমির বাবা মেয়ের এই সাফল্যে গর্বিত। তাঁর সামর্থ্য দিয়ে মেয়ের উচ্চশিক্ষার পুরো ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। তাই বৃত্তিটি তাঁর কাছে শুধু একটি শিক্ষাসহায়তা নয়, বরং মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার বড় সুযোগ।
প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা
জেমির সাফল্য নিয়ে জহুর চান বিবি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এটি প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ। মেধার সঙ্গে আন্তরিক চেষ্টা ও দৃঢ় মনোবল থাকলে আর্থিক সীমাবদ্ধতা সবসময় সাফল্যের পথে শেষ বাধা হয়ে থাকে না।
জেমির ঘটনাটি তাই বৃহত্তর একটি প্রশ্নও সামনে আনে—বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন আরও কত মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে?
জেমির মতো শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, পরামর্শ ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম বাড়ানো গেলে অনেক অপ্রকাশিত প্রতিভা সামনে আসতে পারে। শুধু দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যাওয়া উচিত নয়।
সামনে আরও বড় স্বপ্ন
বৃত্তি পাওয়ার পর জেমির লক্ষ্য এখন পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করা। তবে নিজের সাফল্যের পাশাপাশি অন্য শিক্ষার্থীরাও যেন এমন সুযোগ পায়—সেই প্রত্যাশাও তাঁর।
শায়েস্তাগঞ্জের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা জেমির হাতে এখন উচ্চশিক্ষার বড় সুযোগ। তাঁর গল্প প্রমাণ করে, অর্থের সীমাবদ্ধতা পথকে কঠিন করতে পারে, কিন্তু মেধা, অধ্যবসায় ও সঠিক সুযোগ একসঙ্গে থাকলে সেই পথ অতিক্রম করাও সম্ভব।
জেমির ৭৪ লাখ টাকার বৃত্তি তাই শুধু একজন শিক্ষার্থীর অর্জন নয়; এটি প্রত্যন্ত বাংলাদেশের অসংখ্য স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর জন্য আশার একটি বার্তা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ১০:১১:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
০ বার পড়া হয়েছে

দারিদ্র পরিবারে লেখাপড়া করে ৭৪ লক্ষ টাকা বৃত্তি পেল

আপডেট সময় ১০:১১:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

দারিদ্র্যের দেয়াল পেরিয়ে জেমির ৭৪ লাখের বৃত্তি
মেধা, পরিশ্রম ও সুযোগ—তিনের সমন্বয়ে বদলে যাচ্ছে শায়েস্তাগঞ্জের এক তরুণীর স্বপ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের পশ্চিম লেঞ্জাপাড়া গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস জেমি। ছোট ব্যবসায়ী বাবার সীমিত আয়ের সংসারে বেড়ে ওঠা এই তরুণীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন একসময় ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল সীমিত, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বড়। সেই স্বপ্নের পথেই এবার এসেছে অভাবনীয় সাফল্য—চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়াশোনার জন্য চার বছরে প্রায় ৭৪ লাখ টাকার সমমূল্যের বৃত্তি পেয়েছেন জেমি।
এই বৃত্তির মোট মূল্য ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির পরিচালক মৌরি রহমান গত মঙ্গলবার চিঠির মাধ্যমে জেমিকে বৃত্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রতি বছর ১৫ হাজার মার্কিন ডলার করে পাবেন তিনি।
সংকটই থামাতে পারেনি স্বপ্ন
জেমির বাবা আফজল আলী একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পরিবারের নিত্যদিনের ব্যয় সামলে মেয়ের উচ্চশিক্ষার বিশাল খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। ফলে এই বৃত্তি জেমির জন্য যেমন শিক্ষাজীবনের বড় সুযোগ, তেমনি পরিবারের জন্যও বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি।
তবে জেমির সাফল্যের পেছনে শুধু বৃত্তির সুযোগ নয়—ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম এবং নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা।
২০২৫ সালে জহুর চান বিবি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। এরপর শেভরন বাংলাদেশের সহায়তায় পরিচালিত এক মাসের সামার স্কুল কার্যক্রমে অংশ নেন।
নতুন পরিবেশ, নতুন লড়াই
গত ২০ জুলাই শুরু হওয়া সামার স্কুলে বিজ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনার পাশাপাশি ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান জেমি।
প্রথমদিকে বিষয়টি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু হাল ছাড়েননি। নিয়মিত পড়াশোনা, আগ্রহ এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সফলভাবে কার্যক্রম শেষ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও পারিবারিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বৃত্তির জন্য তাঁকে নির্বাচিত করা হয়।
এখানেই জেমির গল্পটি হয়ে ওঠে অন্যরকম। আর্থিক সামর্থ্য যেখানে উচ্চশিক্ষার পথে বড় বাধা, সেখানে একটি সুযোগ এবং সেই সুযোগ কাজে লাগানোর সক্ষমতা কীভাবে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে—জেমির অর্জন তারই উদাহরণ।
চিঠি হাতে বদলে গেল দুশ্চিন্তার চিত্র
বৃত্তির খবর পাওয়ার মুহূর্তটিও জেমির জন্য ছিল অবিশ্বাস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি হাতে পাওয়ার পর প্রথমে তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে এত বড় একটি বৃত্তি সত্যিই তাঁর জন্য। বারবার চিঠিটি পড়ে নিশ্চিত হন তিনি।
একসময় যে পরিবারে মেয়ের উচ্চশিক্ষার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, এখন সেই পরিবারই মেয়ের স্বপ্নপূরণের নতুন পথ দেখতে পাচ্ছে।
জেমির বাবা মেয়ের এই সাফল্যে গর্বিত। তাঁর সামর্থ্য দিয়ে মেয়ের উচ্চশিক্ষার পুরো ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। তাই বৃত্তিটি তাঁর কাছে শুধু একটি শিক্ষাসহায়তা নয়, বরং মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার বড় সুযোগ।
প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা
জেমির সাফল্য নিয়ে জহুর চান বিবি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এটি প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ। মেধার সঙ্গে আন্তরিক চেষ্টা ও দৃঢ় মনোবল থাকলে আর্থিক সীমাবদ্ধতা সবসময় সাফল্যের পথে শেষ বাধা হয়ে থাকে না।
জেমির ঘটনাটি তাই বৃহত্তর একটি প্রশ্নও সামনে আনে—বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন আরও কত মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে?
জেমির মতো শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, পরামর্শ ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম বাড়ানো গেলে অনেক অপ্রকাশিত প্রতিভা সামনে আসতে পারে। শুধু দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যাওয়া উচিত নয়।
সামনে আরও বড় স্বপ্ন
বৃত্তি পাওয়ার পর জেমির লক্ষ্য এখন পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করা। তবে নিজের সাফল্যের পাশাপাশি অন্য শিক্ষার্থীরাও যেন এমন সুযোগ পায়—সেই প্রত্যাশাও তাঁর।
শায়েস্তাগঞ্জের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা জেমির হাতে এখন উচ্চশিক্ষার বড় সুযোগ। তাঁর গল্প প্রমাণ করে, অর্থের সীমাবদ্ধতা পথকে কঠিন করতে পারে, কিন্তু মেধা, অধ্যবসায় ও সঠিক সুযোগ একসঙ্গে থাকলে সেই পথ অতিক্রম করাও সম্ভব।
জেমির ৭৪ লাখ টাকার বৃত্তি তাই শুধু একজন শিক্ষার্থীর অর্জন নয়; এটি প্রত্যন্ত বাংলাদেশের অসংখ্য স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর জন্য আশার একটি বার্তা।