ফখরুল–অলি মুখোমুখি, ৩৪৯ এমপির ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ভোটের মাঠে লড়াই, ফল নিয়ে আগেই হিসাব-নিকাশ
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে ভোট। মুখোমুখি হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। নির্ধারিত সময়ে কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় এখন ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে কে উঠছেন বঙ্গভবনে।
৩৫ বছর পর কেন এত গুরুত্ব?
রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মূলত ক্ষমতাসীন পক্ষের একক প্রার্থী হিসেবে। এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
তবে এ নির্বাচন সরাসরি জনগণের ভোটে হচ্ছে না। সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। ফলে নির্বাচনের ফল নির্ধারণের মূল হিসাব এখন জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপরই নির্ভরশীল।
৩৪৯ ভোটারের হিসাব কোথায়?
এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের। সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে একটি আসন বর্তমানে শূন্য থাকায় ভোটারের সংখ্যা ৩৪৯।
অর্থাৎ মাঠের রাজনৈতিক উত্তাপ যতই থাকুক, শেষ সিদ্ধান্ত আসবে সংসদ কক্ষ থেকেই। কে কত ভোট পেলেন—সেটিই হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা।
লড়াই আছে, কিন্তু ফলের অঙ্ক কতটা কঠিন?
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্ন এখানেই—প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ফল কি সত্যিই অনিশ্চিত?
প্রথম দিকের রাজনৈতিক সমীকরণে বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সংসদ সদস্য সংখ্যা ৯০। ফলে কাগজে-কলমে সংসদীয় শক্তির হিসাবে মির্জা ফখরুল এগিয়ে আছেন বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে।
তবে ভোটের আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমীকরণকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালটে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের ভোটই গুরুত্বপূর্ণ।
ভোট হবে কীভাবে?
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা ভোটের দিন ব্যালট গ্রহণ করবেন। ব্যালটের নির্ধারিত অংশে দুই প্রার্থীর নাম থাকবে। সংসদ সদস্যরা পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করে ব্যালট বাক্সে তা জমা দেবেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের পর শুরু হবে গণনা। সর্বাধিক বৈধ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।
ফখরুল বনাম অলি—রাজনৈতিক তাৎপর্য কোথায়?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিনের বিএনপি নেতা ও দলটির মহাসচিব। অন্যদিকে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম একজন প্রবীণ রাজনীতিক এবং এবার ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ফলে নির্বাচনটি শুধু দুই ব্যক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এর মধ্য দিয়ে সংসদের ক্ষমতাসীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোটের অবস্থানও দৃশ্যমান হচ্ছে।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন পার হয়ে যাওয়ার পর এখন আর সমঝোতার সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দুই প্রার্থীর কেউই মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। ফলে ২০ আগস্ট ভোট গ্রহণ নিশ্চিত।
জনগণের ভোট নয়, সংসদ সদস্যদের ভোট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই কাঠামোই এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণ নির্বাচনে যেখানে কোটি কোটি ভোটারের রায় সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত দেয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সেই দায়িত্ব পালন করবেন মাত্র ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
ফলে ২০ আগস্ট সংসদ ভবনের ভোটকক্ষ কার্যত পরিণত হবে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের পক্ষে প্রত্যাশিত ফল এনে দেবে, নাকি অলি আহমদের পক্ষে কোনো অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে?
শেষ মুহূর্তের নজর এখন ভোটের দিকে
মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহার—নির্বাচনের তিনটি ধাপ ইতোমধ্যে শেষ। এখন বাকি শুধু ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণা।
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় নির্বাচনটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে শেষ পর্যন্ত সব আলোচনা, জোটের হিসাব কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে ৩৪৯ সংসদ সদস্যের ব্যালটই বলে দেবে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে।
২০ আগস্ট বিকেল ৫টার পর সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।



















