দেশে ফেরাতে আজিজের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ
সাবেক সেনাপ্রধান আজিজের বিরুদ্ধে রেড নোটিশের উদ্যোগ, দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথে প্রসিকিউশন
স্টাফ রিপোর্টার
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক কার্যক্রমের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। এর অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির জন্য বাংলাদেশ পুলিশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার স্বাক্ষর করা চিঠিতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার প্রচলিত বিধি অনুসরণ করে আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রসিকিউশনকে অবহিত করার কথাও বলা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত সাবেক এই সেনাপ্রধানকে শনাক্ত করা, তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
যে অভিযোগে মামলা
আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অভিযান এবং পরদিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গুলির ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ওই সময় আজিজ আহমেদ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। মামলার অভিযোগে ওই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার বিষয়। অভিযোগ থাকা এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়—আইন অনুযায়ী বিচার ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এর নিষ্পত্তি হওয়ার কথা।
কোথায় আছেন আজিজ?
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আজিজ আহমেদ মধ্যপ্রাচ্য অথবা অন্য কোনো দেশে অবস্থান করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এ কারণে রেড নোটিশের আবেদনকে শুধু গ্রেপ্তারের উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং একজন পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্ত এবং তাকে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
রেড নোটিশ মানেই গ্রেপ্তার নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। রেড নোটিশের মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে কোনো ব্যক্তির সন্ধান ও সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক করা এবং তাকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাওয়া হয়।
কোনো দেশে কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হবে কি না, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। একইভাবে একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হলে প্রত্যর্পণ আইন, দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হতে পারে।
অর্থাৎ রেড নোটিশ জারি বা তার জন্য আবেদন করা মানেই আজিজ আহমেদকে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত হয়ে গেছে—এমনটি বলা যাবে না।
শাপলা চত্বর মামলায় আরও আসামি
শাপলা চত্বরের ঘটনায় এর আগে গত ২৭ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকা আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলায় সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। কয়েকজন সাংবাদিক ও অন্যান্য ব্যক্তির নামও মামলার নথিতে রয়েছে বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য, দেশের বাইরে অবস্থানরত আসামিদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া হবে।
সামনে কী হতে পারে
আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশের আবেদন এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কীভাবে এগোয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার অবস্থান শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণসংক্রান্ত আইনগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। তিনি যে দেশে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেই দেশের আইন, বাংলাদেশের সঙ্গে ওই দেশের প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত—সবকিছুই পরবর্তী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে প্রসিকিউশনের বর্তমান পদক্ষেপকে একটি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক আইনগত প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন মূল নজর থাকবে রেড নোটিশের আবেদনের অগ্রগতি, আজিজ আহমেদের অবস্থান শনাক্তকরণ এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতার ওপর।
সব মিলিয়ে, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশের উদ্যোগ শাপলা চত্বরের মামলায় বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনার বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি অংশ। তবে চূড়ান্তভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পুলিশি সহযোগিতা ও সংশ্লিষ্ট দেশের আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর।



















