স্বামীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে বান্ধবীকে হত্যা!
স্বামীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় বান্ধবীকে দেখে বান্ধবীকে হত্যা: সবুজবাগের ফালানী হত্যার নেপথ্যে সম্পর্কের দ্বন্দ্ব
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর সবুজবাগে ১৯ বছর বয়সী ছুরাইয়া আক্তার ওরফে ফালানী হত্যাকাণ্ড ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। পুলিশের তদন্তে প্রাথমিকভাবে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, সন্দেহ, ক্ষোভ এবং প্রতিশোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফালানীর সঙ্গে নুসরাত জাহান সাহিদার স্বামী রাব্বির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ঘটনার দিন স্বামীর সঙ্গে ফালানীকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে সাহিদা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ওপর হামলা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশের দাবি, হামলার পর ফালানীর মৃত্যু হয়।
তবে হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পুলিশ বলছে, হত্যার ঘটনা গোপন করার উদ্দেশ্যে মরদেহ সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় সাহিদার কথিত ভাই কবির হোসেনসহ আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে।
সেতুর নিচে মিলল মরদেহের অংশ
ঘটনার রহস্য প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত ৬ আগস্ট। সবুজবাগের মাদারটেক এলাকায় একটি সেতুর নিচ থেকে এক তরুণীর বিচ্ছিন্ন মাথা ও দুই হাত উদ্ধার করে পুলিশ।
অজ্ঞাত ওই তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে স্বজনেরা ছবি দেখে উদ্ধার হওয়া মরদেহের অংশগুলো ফালানীর বলে শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় প্রথমে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করা হয়। এরপর তদন্তে সম্ভাব্য জড়িতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে পুলিশ।
তদন্তে সামনে আসে সম্পর্কের বিরোধ
তদন্তকারীরা জানান, ফালানীর সঙ্গে সাহিদার স্বামী রাব্বির ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি হত্যাকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে দুই নারীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাব্বির সঙ্গে ফালানীকে কাছাকাছি অবস্থায় দেখতে পান সাহিদা। এ সময় উত্তেজিত হয়ে তিনি ফালানীর ওপর হামলা করেন বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের আগে ঠিক কী ঘটেছিল, সেখানে কার কী ভূমিকা ছিল এবং ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না—এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন।
জবানবন্দিতে কী তথ্য মিলেছে?
২১ আগস্ট সাহিদাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় আরও একজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে তাকেও মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বুধবার সাহিদা ও তার কথিত ভাই কবির হোসেনসহ ছয়জনকে আদালতে হাজির করা হয়। সাহিদা ও কবির স্বেচ্ছায় ঘটনার বিষয়ে জবানবন্দি দিতে সম্মতি দিলে আদালত তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্তকারীদের কাছে এই জবানবন্দি মামলার ঘটনাক্রম পরিষ্কার করতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পলাতক রাব্বি ও শাওন
মামলার তদন্তে রাব্বি ও শাওনের নামও সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, মরদেহ গোপনের প্রক্রিয়ায় শাওনের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে রাব্বির সঙ্গে নিহত ফালানীর সম্পর্কের বিষয়টিও তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বর্তমানে রাব্বি ও শাওন পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আসল রহস্য কতটা উন্মোচিত?
ফালানী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরোধকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু শুধু সম্পর্কের বিরোধই কি হত্যার পুরো কারণ, নাকি এর পেছনে আরও কোনো ঘটনা রয়েছে—তা নিশ্চিত হতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এ ঘটনায় কারা সরাসরি হত্যায় জড়িত ছিলেন, কারা পরে মরদেহ গোপনে সহযোগিতা করেছেন এবং হত্যাকাণ্ডটি তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল নাকি আগে থেকেই কোনো পরিকল্পনা ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
পুলিশ বলছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনাক্রম আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া আলামত, আসামিদের জবানবন্দি এবং পারস্পরিক যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।
ফালানী হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একটি হত্যার ঘটনা নয়; এর নেপথ্যে থাকা সম্পর্কের জটিলতা, পারস্পরিক বিরোধ এবং হত্যার পর ঘটনা আড়াল করার চেষ্টাই এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তবে আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।



















