ঢাকা ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা, ঋতুর জিপিএ-৫ পেয়েছে।

নিজস্ব সংবাদ :

বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা, বুকভরা শোক নিয়েও থামেনি ঋতু—এসএসসিতে জিপিএ-৫
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর
একদিকে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—ভালো ফল করে বাবার মুখে হাসি ফোটানো। অন্যদিকে পরীক্ষা চলাকালীন হারিয়ে যাওয়া সেই প্রিয় বাবাই। এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও ভেঙে পড়েনি যশোরের চৌগাছার মেধাবী শিক্ষার্থী ঋতু খাতুন। বাবার মৃত্যুর খবর না জেনেই পরীক্ষার হলে বসেছিল সে। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে জানতে পারে—যে মানুষটির জন্য এতদিন স্বপ্ন দেখেছে, সেই বাবা আর নেই।
বুকভরা শোক, চোখের পানি আর পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সামনে নিয়েই আবার পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বসতে হয় ঋতুকে। একের পর এক পরীক্ষা শেষ করে শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫।
ঋতুর এই ফলাফল শুধু একটি ভালো ফল নয়; এটি শোক, দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট ও মানসিক চাপের বিরুদ্ধে এক কিশোরীর দৃঢ়তার গল্প।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ঋতু খাতুন। হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। তার বাবা কবির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় বাবার অসুস্থতা যেমন ছিল পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ, তেমনি চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয়ও হয়ে উঠেছিল বড় বোঝা।
পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই কবির হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা তখন একদিকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে উৎকণ্ঠায়, অন্যদিকে ঋতুর পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত।
এর মধ্যেই আসে সেই নির্মম দিন।
গত ১০ মে ভোররাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কবির হোসেন। কিন্তু সেদিন ঋতুর পরীক্ষা ছিল। বাবার মৃত্যুর খবর জানলে মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে—এই আশঙ্কায় পরিবারের সদস্যরা পরীক্ষার আগে বিষয়টি তাকে জানাননি।
নির্ধারিত সময়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের পরীক্ষা কেন্দ্রে যায় ঋতু। কিছুই জানত না সে। স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষার হলে বসে বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বিষয়ের পরীক্ষা দেয়।
পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফিরে জানতে পারে, তার বাবা আর নেই।
এক মুহূর্তেই যেন বদলে যায় তার পৃথিবী।
যে মানুষটির আশীর্বাদ নিয়ে পরীক্ষার হলে যাওয়ার কথা ছিল, সেই বাবার নিথর দেহের সামনে দাঁড়াতে হয় তাকে। বাবাকে শেষবারের মতো বিদায় জানানোর পরও থেমে থাকার সুযোগ ছিল না। সামনে তখনও বাকি পরীক্ষা।
স্বজন হারানোর শোককে বুকের মধ্যে চাপা দিয়ে আবার বই-খাতা নিয়ে বসতে হয় ঋতুকে। একদিকে বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অটুট থাকে সে।
শেষ পর্যন্ত সব পরীক্ষা সম্পন্ন করে ঋতু।
আর ফল প্রকাশের দিনে আসে তার জীবনের আরেকটি বড় খবর—এসএসসিতে জিপিএ-৫।
তবে এই সাফল্যের মুহূর্তেও আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে গভীর শূন্যতা। ঋতুর ভাষায়, বাবা বেঁচে থাকলে তার এই ফল দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আজ ভালো ফল এসেছে, কিন্তু সেই ফলের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানুষটিই নেই।
বাবার স্বপ্ন পূরণ করাই এখন ঋতুর অন্যতম লক্ষ্য। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায় সে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে তার।
ঋতুর শিক্ষকরা জানান, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রেখেছে। বাবার মৃত্যুর মতো ভয়াবহ মানসিক আঘাতের মধ্যেও পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করে জিপিএ-৫ অর্জন তার দৃঢ় মনোবল ও অধ্যবসায়েরই প্রমাণ।
স্থানীয়দের মতে, ঋতুর এই সাফল্য শুধু তার নিজের নয়; এটি তার প্রয়াত বাবার স্বপ্নেরও একটি প্রতিফলন। জীবনের কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে এগিয়ে যেতে পারে, ঋতুর গল্প তারই অনন্য উদাহরণ।
তবে সাফল্যের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঋতুর উচ্চশিক্ষার পথ কীভাবে নিশ্চিত হবে?
বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর নেমে এসেছে নতুন আর্থিক সংকট। ফলে জিপিএ-৫ অর্জনের পরও ঋতুর সামনে রয়েছে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করছেন, মেধাবী এই শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। আর্থিক সহায়তা ও শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ পেলে ঋতু তার স্বপ্ন পূরণের পথে আরও এগিয়ে যেতে পারবে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তার পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
বাবাকে হারানোর শোক হয়তো কখনো পুরোপুরি মুছে যাবে না। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঋতু যে পথচলা শুরু করেছে, তার গল্প এখন শুধু একটি জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়।
এটি একজন বাবার স্বপ্ন, একজন মেয়ের অদম্য চেষ্টা এবং প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার গল্প।
বাবা আজ নেই। কিন্তু বাবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঋতু এগিয়ে যেতে চায় বহুদূর।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ১১:২১:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
১ বার পড়া হয়েছে

বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা, ঋতুর জিপিএ-৫ পেয়েছে।

আপডেট সময় ১১:২১:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা, বুকভরা শোক নিয়েও থামেনি ঋতু—এসএসসিতে জিপিএ-৫
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর
একদিকে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—ভালো ফল করে বাবার মুখে হাসি ফোটানো। অন্যদিকে পরীক্ষা চলাকালীন হারিয়ে যাওয়া সেই প্রিয় বাবাই। এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও ভেঙে পড়েনি যশোরের চৌগাছার মেধাবী শিক্ষার্থী ঋতু খাতুন। বাবার মৃত্যুর খবর না জেনেই পরীক্ষার হলে বসেছিল সে। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে জানতে পারে—যে মানুষটির জন্য এতদিন স্বপ্ন দেখেছে, সেই বাবা আর নেই।
বুকভরা শোক, চোখের পানি আর পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সামনে নিয়েই আবার পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বসতে হয় ঋতুকে। একের পর এক পরীক্ষা শেষ করে শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫।
ঋতুর এই ফলাফল শুধু একটি ভালো ফল নয়; এটি শোক, দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট ও মানসিক চাপের বিরুদ্ধে এক কিশোরীর দৃঢ়তার গল্প।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ঋতু খাতুন। হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। তার বাবা কবির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় বাবার অসুস্থতা যেমন ছিল পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ, তেমনি চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয়ও হয়ে উঠেছিল বড় বোঝা।
পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই কবির হোসেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা তখন একদিকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে উৎকণ্ঠায়, অন্যদিকে ঋতুর পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত।
এর মধ্যেই আসে সেই নির্মম দিন।
গত ১০ মে ভোররাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কবির হোসেন। কিন্তু সেদিন ঋতুর পরীক্ষা ছিল। বাবার মৃত্যুর খবর জানলে মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে—এই আশঙ্কায় পরিবারের সদস্যরা পরীক্ষার আগে বিষয়টি তাকে জানাননি।
নির্ধারিত সময়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের পরীক্ষা কেন্দ্রে যায় ঋতু। কিছুই জানত না সে। স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষার হলে বসে বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বিষয়ের পরীক্ষা দেয়।
পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফিরে জানতে পারে, তার বাবা আর নেই।
এক মুহূর্তেই যেন বদলে যায় তার পৃথিবী।
যে মানুষটির আশীর্বাদ নিয়ে পরীক্ষার হলে যাওয়ার কথা ছিল, সেই বাবার নিথর দেহের সামনে দাঁড়াতে হয় তাকে। বাবাকে শেষবারের মতো বিদায় জানানোর পরও থেমে থাকার সুযোগ ছিল না। সামনে তখনও বাকি পরীক্ষা।
স্বজন হারানোর শোককে বুকের মধ্যে চাপা দিয়ে আবার বই-খাতা নিয়ে বসতে হয় ঋতুকে। একদিকে বাবাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অটুট থাকে সে।
শেষ পর্যন্ত সব পরীক্ষা সম্পন্ন করে ঋতু।
আর ফল প্রকাশের দিনে আসে তার জীবনের আরেকটি বড় খবর—এসএসসিতে জিপিএ-৫।
তবে এই সাফল্যের মুহূর্তেও আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে গভীর শূন্যতা। ঋতুর ভাষায়, বাবা বেঁচে থাকলে তার এই ফল দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আজ ভালো ফল এসেছে, কিন্তু সেই ফলের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানুষটিই নেই।
বাবার স্বপ্ন পূরণ করাই এখন ঋতুর অন্যতম লক্ষ্য। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায় সে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে তার।
ঋতুর শিক্ষকরা জানান, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রেখেছে। বাবার মৃত্যুর মতো ভয়াবহ মানসিক আঘাতের মধ্যেও পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করে জিপিএ-৫ অর্জন তার দৃঢ় মনোবল ও অধ্যবসায়েরই প্রমাণ।
স্থানীয়দের মতে, ঋতুর এই সাফল্য শুধু তার নিজের নয়; এটি তার প্রয়াত বাবার স্বপ্নেরও একটি প্রতিফলন। জীবনের কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে এগিয়ে যেতে পারে, ঋতুর গল্প তারই অনন্য উদাহরণ।
তবে সাফল্যের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঋতুর উচ্চশিক্ষার পথ কীভাবে নিশ্চিত হবে?
বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর নেমে এসেছে নতুন আর্থিক সংকট। ফলে জিপিএ-৫ অর্জনের পরও ঋতুর সামনে রয়েছে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করছেন, মেধাবী এই শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। আর্থিক সহায়তা ও শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ পেলে ঋতু তার স্বপ্ন পূরণের পথে আরও এগিয়ে যেতে পারবে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তার পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
বাবাকে হারানোর শোক হয়তো কখনো পুরোপুরি মুছে যাবে না। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঋতু যে পথচলা শুরু করেছে, তার গল্প এখন শুধু একটি জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়।
এটি একজন বাবার স্বপ্ন, একজন মেয়ের অদম্য চেষ্টা এবং প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার গল্প।
বাবা আজ নেই। কিন্তু বাবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঋতু এগিয়ে যেতে চায় বহুদূর।