. সরকারি অর্থের অপচয়-দুর্নীতিতে আর ছাড় নয়: সংসদীয় কমিটির কঠোর হুঁশিয়ারি
বন্দরের দুর্নীতি-অনিয়মে কঠোর অবস্থানে সংসদীয় কমিটি: সরকারি অর্থের অপচয়ে কাউকে ছাড় নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ
চট্টগ্রাম-মোংলা বন্দরের আর্থিক অনিয়ম, আমানতের অর্থ আটকে থাকা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখার নির্দেশনা
নিজস্ব প্রতিবেদক::
সরকারি অর্থের অপচয়, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি। বিগত সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলেও কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা সরকারি অর্থের অপচয় বরদাশত করা হবে না বলে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরগুলো শুধু আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই সংসদীয় কমিটির এই অবস্থান বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
রোববার (৮ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির অষ্টম বৈঠকে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
বন্দরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এলো আর্থিক অনিয়মের বিষয়
বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাবসংক্রান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবসংক্রান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদন বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন দুই বন্দরের বিভিন্ন নিরীক্ষা আপত্তি, বকেয়া অর্থ আদায়, হিসাব সমন্বয়, অনিয়ম নিয়মিতকরণ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আপত্তি নিষ্পত্তির অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, নিরীক্ষায় যেসব আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর কতগুলো ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতগুলো এখনো ঝুলে রয়েছে? সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে সেই অর্থ উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তাও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক জবাব নিশ্চিত করা জরুরি।
আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কারসাজি ঠেকাতে প্রযুক্তির ব্যবহারের সুপারিশ
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে পণ্যের মূল্য অতিরিক্ত কিংবা কম দেখানোর প্রবণতা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি।
বিশ্ববাজারে পণ্যের প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কারসাজি, শুল্ক ফাঁকি ও রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি শুল্ক পরিশোধে বৈদ্যুতিন বিল ও অর্থ পরিশোধব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া দ্রুত করার পাশাপাশি বন্দরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বাড়ানোর প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকে বন্দরের আমানত: উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
বৈঠকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে, বিশেষ করে আর্থিক সংকটে থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে বন্দর কর্তৃপক্ষের স্থায়ী আমানত রাখার বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আমানতের অর্থ উত্তোলন না করা এবং নির্ধারিত নীতিমালা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা, প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে বন্দরের সব অর্থ সরকারি ব্যাংকে জমা রাখার ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোথায়, কী শর্তে এবং কার সিদ্ধান্তে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা। কোনো সিদ্ধান্তে সরকারি অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়লে তার দায় নির্ধারণ করাও জরুরি।
কনটেইনার চুরি ও পণ্য পাচারের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন
চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য পণ্যভর্তি কনটেইনার ও যানবাহনের জট আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নিরসনের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
একই সঙ্গে খালি কনটেইনারের আড়ালে পণ্যবাহী কনটেইনার বের করে নেওয়া এবং বন্দর থেকে কনটেইনার চুরির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।
বন্দর এলাকায় পণ্য চুরি কিংবা কনটেইনারের অপব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটলে তা শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ করে না, বরং দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই এসব ঘটনার তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী, নিরাপত্তাকর্মী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরের খনন কার্যক্রম, নাব্যতা রক্ষা, নির্ধারিত গভীরতা অর্জন এবং কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
এসব প্রকল্পে বরাদ্দ করা সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অনিয়ম চিহ্নিত করার সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বড় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, কাজের মান, দরপত্র প্রক্রিয়া, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষ উৎসাহ বোনাস নিয়েও প্রশ্ন
বন্দর কর্তৃপক্ষের তহবিল থেকে মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে বিশেষ উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়টিও বৈঠকে উত্থাপিত হয়েছে।
সরকারি অর্থের এমন অপচয় ও আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা নিয়মবহির্ভূত বণ্টনের উৎস হতে পারে না। সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি, অনুমোদন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
শুধু সুপারিশ নয়, বাস্তবায়নই হবে মূল পরীক্ষা
সংসদীয় কমিটির এই সুপারিশগুলো নিঃসন্দেহে সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে তখনই, যখন নিরীক্ষা আপত্তির নিষ্পত্তি, সরকারি অর্থ উদ্ধার, অনিয়মের তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ, নিরীক্ষা বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তদন্তের অগ্রগতি, অর্থ উদ্ধারের পরিমাণ এবং গৃহীত প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জনগণের আস্থা বাড়বে।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, সংসদ সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক এবং মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া হিসাব মহানিয়ন্ত্রক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিব, বিভিন্ন বন্দরের চেয়ারম্যান ও কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি টাকার হিসাব দিতে হবে—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান নীতি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষণা নয়, কার্যকর তদন্ত, জবাবদিহি এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হবে সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতিতে সত্যিই কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

















