ঢাকা ১০:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকতার কলম হোক সত্য ও ন্যায়ের হাতিয়ার, মিথ্যা-অপপ্রচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কুরআনের নৈতিক শিক্ষায় জাগ্রত হোক সাংবাদিক সমাজ—গজারিয়া প্রেস ক্লাবে ব্যতিক্রমী মতবিনিময় সভায় সহযোগিতার অঙ্গীকার।

নিজস্ব সংবাদ :

কুরআনের আলোয় সাংবাদিকতা: সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে নতুন প্রত্যয়ের বার্তা
গজারিয়া প্রেস ক্লাবে ব্যতিক্রমধর্মী মতবিনিময় সভা, সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংহতি ও সহযোগিতার অঙ্গীকার
রাজু আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার :
মুন্সীগঞ্জ: সাংবাদিকতা কি শুধু সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য প্রকাশ আর ঘটনার বিবরণ তুলে ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি এর চেয়েও বড় কোনো সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব রয়েছে? সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা কতটুকু? সংবাদ যাচাই, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার, মানুষের সম্মান ও অধিকার রক্ষায় একজন সংবাদকর্মীর নৈতিক অবস্থান কেমন হওয়া উচিত? এমনই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও বাস্তবতার আলোকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কুরআনের আলোকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক ব্যতিক্রমধর্মী মতবিনিময় সভা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে কুরআন পাঠ আন্দোলনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় গজারিয়া প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দসহ উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা অংশ নেন। সভায় সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি নৈতিকতা, সত্যনিষ্ঠা, তথ্য যাচাই, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
গজারিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম শেখের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়ক আবু সাঈদ খান।
সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি সমাজের প্রতি এক গভীর আমানত
আলোচনার শুরুতেই আবু সাঈদ খান মানবজীবনে পবিত্র কুরআন পাঠের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, একজন মানুষ হিসেবে আমাদের কেন কুরআন পড়া প্রয়োজন, কেন এর বক্তব্য মাতৃভাষায় বুঝে উপলব্ধি করা জরুরি—সেই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেকের নিজের জীবন থেকেই খুঁজে নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, গোষ্ঠী কিংবা পেশার মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পথনির্দেশনা। তাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, পেশা ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের কুরআনের বক্তব্য জানার, বোঝার এবং তা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, কুরআনকে শুধু আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবজীবনের সামগ্রিক কল্যাণ, ন্যায়বিচার, সত্যনিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধের নির্দেশনা হিসেবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিকের কলম সমাজের অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। আবার যথাযথ যাচাই ছাড়া একটি সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে কোনো নিরপরাধ মানুষের সম্মানহানি, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা বড় ধরনের ক্ষতির কারণও সৃষ্টি হতে পারে। তাই সাংবাদিকতার প্রতিটি পর্যায়ে সত্যনিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা, আমানতদারি ও ন্যায়বিচারের চর্চা অপরিহার্য।
সংবাদ প্রকাশের আগে যাচাই—কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
সভায় পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ভিত্তি তুলে ধরা হয়।
প্রথমত, সংবাদ যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা: সূরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে সংবাদ যাচাইয়ের নির্দেশনা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি সংবাদ নিয়ে এলে তা যাচাই করে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো জনগোষ্ঠীর ক্ষতি করে পরে অনুতপ্ত হতে না হয়।
আলোচনায় বলা হয়, আধুনিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এ নির্দেশনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য, গুজব, অভিযোগ কিংবা কারও দেওয়া বক্তব্য যাচাই না করে প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা: সূরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে নিজের, পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও ন্যায়বিচারে দৃঢ় থাকার নির্দেশনা রয়েছে।
এর মাধ্যমে সাংবাদিকতার একটি মৌলিক নীতি সামনে আসে—ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় আনুগত্য, আর্থিক স্বার্থ কিংবা ক্ষমতাবানদের প্রভাব যেন সত্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। অন্যায় যার দ্বারাই সংঘটিত হোক, সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি তুলে ধরা।
তৃতীয়ত, জ্ঞান ও প্রমাণ ছাড়া কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নয়: সূরা ইসরার ৩৬ নম্বর আয়াতে যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানুষের কান, চোখ ও অন্তর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য হলো—শোনা কথা, অনুমান, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা যাচাইহীন অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ তৈরি করা উচিত নয়। প্রত্যক্ষ তথ্য, নির্ভরযোগ্য সূত্র, নথিপত্র ও প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।
চতুর্থত, ন্যায়বিচার ও সদাচরণের চর্চা: সূরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এই নৈতিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ পরিবেশনের সময় কারও প্রতি বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণ নয়; বরং ন্যায়সংগত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা: সূরা হুজুরাতের ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উপহাস, অপবাদ, কুধারণা ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে।
আলোচনায় বলা হয়, অপরাধের অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা, অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণ এবং নিরপরাধ মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা জরুরি।
সাংবাদিকতার নৈতিক সংকট ও বর্তমান বাস্তবতা
সভায় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে তৈরি হওয়া নৈতিক চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির বিস্তার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার কারণে এখন মুহূর্তের মধ্যে কোনো তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু তথ্যের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভুল তথ্য, গুজব, অপপ্রচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
এ বাস্তবতায় সাংবাদিকদের শুধু দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং সত্যতা যাচাই, দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত সততার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
একটি সংবাদ যেমন অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, তেমনি ভুল সংবাদ একটি পরিবারের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করতে পারে, আবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন নিরপরাধ মানুষের সামাজিক সম্মান নষ্ট করতে পারে।
তাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি হওয়া উচিত সত্য, বস্তুনিষ্ঠতা ও জনস্বার্থ। ক্ষমতাবান কিংবা প্রভাবশালীদের সন্তুষ্ট করা নয়, বরং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের প্রধান অঙ্গীকার।
কুরআন পাঠ আন্দোলনের লক্ষ্য—কুরআন বুঝে পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা
কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়ক আবু সাঈদ খান আন্দোলনের লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য কাউকে কোনো বিশেষ সংগঠনের সদস্য করা কিংবা নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়। বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে কুরআন পাঠ, অনুধাবন ও চিন্তাচর্চার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, কুরআন সবার জন্য। তাই এর বক্তব্য জানার ও বোঝার সুযোগও সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। এ কাজে দল-মত, ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পান। তাঁদের লেখনী, বক্তব্য ও প্রচারমাধ্যমের মাধ্যমে জনমত গঠিত হয়। ফলে সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি সমৃদ্ধ করাও অত্যন্ত জরুরি। মাতৃভাষায় কুরআন বুঝে পড়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানগত ও নৈতিক অনুশীলন হতে পারে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে সাংবাদিকদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ
মূল বক্তব্যের পর উপস্থিত সাংবাদিকরা কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়কের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সাংবাদিকতার বাস্তবতা, কুরআনের নির্দেশনা, নৈতিকতা, তথ্য যাচাই এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
আবু সাঈদ খান কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে সভায় প্রাণবন্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের পরিবেশ তৈরি হয়।
সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংহতি, সহযোগিতার অঙ্গীকার
সভাটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল উপস্থিত সাংবাদিকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও সহযোগিতার আগ্রহ। তাঁরা কুরআন পাঠ আন্দোলনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী, ব্যতিক্রমধর্মী এবং সমাজের নৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রচেষ্টা হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
একজন সাংবাদিক জানান, তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে কুরআন পাঠ ও এর বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করে আসছেন। সমাজে সংগঠিতভাবে কুরআন পাঠের সংস্কৃতি বিস্তারে এমন একটি উদ্যোগ দেখতে পেয়ে তিনি আনন্দিত। তিনি এ কার্যক্রমের প্রতি সংহতি ও সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
অন্যান্য সাংবাদিকরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার এবং কুরআন পাঠের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে সহযোগিতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তাঁদের মতে, সমাজে সত্য, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইন বা প্রশাসনিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তা, বিবেক ও আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন। কুরআনের নৈতিক শিক্ষার আলোকে মানুষের মধ্যে সত্যনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে সহযোগিতার আশ্বাস
সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে গজারিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম শেখ কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়ক আবু সাঈদ খানকে এ ধরনের একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও তাৎপর্যপূর্ণ মতবিনিময় সভা আয়োজনের জন্য আন্তরিক মোবারকবাদ জানান।
তিনি বলেন, কুরআন পাঠ জনপ্রিয়করণের লক্ষ্যে কুরআন পাঠ আন্দোলন সমাজের সর্বস্তরে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সে সম্পর্কে তাঁদের আগে বিস্তারিত ধারণা ছিল না। আজকের আলোচনা থেকে আন্দোলনের উদ্দেশ্য, কর্মপরিধি ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে।
তিনি গজারিয়ায় ভবিষ্যতে কুরআন পাঠ আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে সহযোগিতা ও সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে আগামীতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সত্যের পক্ষে কলম, ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান—সমাজ পরিবর্তনের প্রত্যাশা
গজারিয়া প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভা কেবল একটি আলোচনা অনুষ্ঠান ছিল না; বরং সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে নৈতিকতা, বিবেক ও মানবিক মূল্যবোধের সম্পর্ক নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
সাংবাদিকতা তখনই প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমূলক হয়ে ওঠে, যখন সংবাদকর্মী ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য প্রকাশ করেন, দুর্বল ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের কথা তুলে ধরেন এবং অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অবস্থান নেন।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা পরস্পরের পরিপূরক। স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্যতম ভিত্তি হলো সত্যনিষ্ঠা, আর সেই সত্যনিষ্ঠাকে অর্থবহ করে তোলে নৈতিকতা ও পেশাগত জবাবদিহি।
কুরআন পাঠ আন্দোলনের প্রত্যাশা—পবিত্র কুরআনের বক্তব্য মাতৃভাষায় বুঝে পড়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সত্য অনুসন্ধান, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। সাংবাদিক সমাজও যেন সেই মূল্যবোধ ধারণ করে সমাজের দর্পণ হিসেবে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে।
গজারিয়া প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংহতি ও সহযোগিতার অঙ্গীকার এ উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন প্রত্যাশা, এ আলোচনা শুধু সভাকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাংবাদিকতার বাস্তব চর্চা, সংবাদ প্রকাশের নীতি এবং সমাজের প্রতিদিনের জীবনে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৮:৩৯:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
৫ বার পড়া হয়েছে

সাংবাদিকতার কলম হোক সত্য ও ন্যায়ের হাতিয়ার, মিথ্যা-অপপ্রচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কুরআনের নৈতিক শিক্ষায় জাগ্রত হোক সাংবাদিক সমাজ—গজারিয়া প্রেস ক্লাবে ব্যতিক্রমী মতবিনিময় সভায় সহযোগিতার অঙ্গীকার।

আপডেট সময় ০৮:৩৯:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

কুরআনের আলোয় সাংবাদিকতা: সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে নতুন প্রত্যয়ের বার্তা
গজারিয়া প্রেস ক্লাবে ব্যতিক্রমধর্মী মতবিনিময় সভা, সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংহতি ও সহযোগিতার অঙ্গীকার
রাজু আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার :
মুন্সীগঞ্জ: সাংবাদিকতা কি শুধু সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য প্রকাশ আর ঘটনার বিবরণ তুলে ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি এর চেয়েও বড় কোনো সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব রয়েছে? সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা কতটুকু? সংবাদ যাচাই, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার, মানুষের সম্মান ও অধিকার রক্ষায় একজন সংবাদকর্মীর নৈতিক অবস্থান কেমন হওয়া উচিত? এমনই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও বাস্তবতার আলোকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কুরআনের আলোকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক ব্যতিক্রমধর্মী মতবিনিময় সভা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেলে কুরআন পাঠ আন্দোলনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় গজারিয়া প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দসহ উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা অংশ নেন। সভায় সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি নৈতিকতা, সত্যনিষ্ঠা, তথ্য যাচাই, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
গজারিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম শেখের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়ক আবু সাঈদ খান।
সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি সমাজের প্রতি এক গভীর আমানত
আলোচনার শুরুতেই আবু সাঈদ খান মানবজীবনে পবিত্র কুরআন পাঠের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, একজন মানুষ হিসেবে আমাদের কেন কুরআন পড়া প্রয়োজন, কেন এর বক্তব্য মাতৃভাষায় বুঝে উপলব্ধি করা জরুরি—সেই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেকের নিজের জীবন থেকেই খুঁজে নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, গোষ্ঠী কিংবা পেশার মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পথনির্দেশনা। তাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, পেশা ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের কুরআনের বক্তব্য জানার, বোঝার এবং তা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, কুরআনকে শুধু আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবজীবনের সামগ্রিক কল্যাণ, ন্যায়বিচার, সত্যনিষ্ঠা ও মানবিক মূল্যবোধের নির্দেশনা হিসেবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। একজন সাংবাদিকের কলম সমাজের অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। আবার যথাযথ যাচাই ছাড়া একটি সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে কোনো নিরপরাধ মানুষের সম্মানহানি, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা বড় ধরনের ক্ষতির কারণও সৃষ্টি হতে পারে। তাই সাংবাদিকতার প্রতিটি পর্যায়ে সত্যনিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা, আমানতদারি ও ন্যায়বিচারের চর্চা অপরিহার্য।
সংবাদ প্রকাশের আগে যাচাই—কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
সভায় পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ভিত্তি তুলে ধরা হয়।
প্রথমত, সংবাদ যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা: সূরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে সংবাদ যাচাইয়ের নির্দেশনা রয়েছে। কোনো ব্যক্তি সংবাদ নিয়ে এলে তা যাচাই করে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো জনগোষ্ঠীর ক্ষতি করে পরে অনুতপ্ত হতে না হয়।
আলোচনায় বলা হয়, আধুনিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এ নির্দেশনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য, গুজব, অভিযোগ কিংবা কারও দেওয়া বক্তব্য যাচাই না করে প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা: সূরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে নিজের, পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও ন্যায়বিচারে দৃঢ় থাকার নির্দেশনা রয়েছে।
এর মাধ্যমে সাংবাদিকতার একটি মৌলিক নীতি সামনে আসে—ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় আনুগত্য, আর্থিক স্বার্থ কিংবা ক্ষমতাবানদের প্রভাব যেন সত্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। অন্যায় যার দ্বারাই সংঘটিত হোক, সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি তুলে ধরা।
তৃতীয়ত, জ্ঞান ও প্রমাণ ছাড়া কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নয়: সূরা ইসরার ৩৬ নম্বর আয়াতে যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানুষের কান, চোখ ও অন্তর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য হলো—শোনা কথা, অনুমান, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা যাচাইহীন অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ তৈরি করা উচিত নয়। প্রত্যক্ষ তথ্য, নির্ভরযোগ্য সূত্র, নথিপত্র ও প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।
চতুর্থত, ন্যায়বিচার ও সদাচরণের চর্চা: সূরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এই নৈতিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ পরিবেশনের সময় কারও প্রতি বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণ নয়; বরং ন্যায়সংগত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা: সূরা হুজুরাতের ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উপহাস, অপবাদ, কুধারণা ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে।
আলোচনায় বলা হয়, অপরাধের অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা, অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণ এবং নিরপরাধ মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা জরুরি।
সাংবাদিকতার নৈতিক সংকট ও বর্তমান বাস্তবতা
সভায় আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে তৈরি হওয়া নৈতিক চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির বিস্তার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার কারণে এখন মুহূর্তের মধ্যে কোনো তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু তথ্যের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভুল তথ্য, গুজব, অপপ্রচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
এ বাস্তবতায় সাংবাদিকদের শুধু দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং সত্যতা যাচাই, দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত সততার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
একটি সংবাদ যেমন অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, তেমনি ভুল সংবাদ একটি পরিবারের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করতে পারে, আবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন নিরপরাধ মানুষের সামাজিক সম্মান নষ্ট করতে পারে।
তাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি হওয়া উচিত সত্য, বস্তুনিষ্ঠতা ও জনস্বার্থ। ক্ষমতাবান কিংবা প্রভাবশালীদের সন্তুষ্ট করা নয়, বরং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের প্রধান অঙ্গীকার।
কুরআন পাঠ আন্দোলনের লক্ষ্য—কুরআন বুঝে পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা
কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়ক আবু সাঈদ খান আন্দোলনের লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য কাউকে কোনো বিশেষ সংগঠনের সদস্য করা কিংবা নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়। বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে কুরআন পাঠ, অনুধাবন ও চিন্তাচর্চার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, কুরআন সবার জন্য। তাই এর বক্তব্য জানার ও বোঝার সুযোগও সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। এ কাজে দল-মত, ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পান। তাঁদের লেখনী, বক্তব্য ও প্রচারমাধ্যমের মাধ্যমে জনমত গঠিত হয়। ফলে সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি সমৃদ্ধ করাও অত্যন্ত জরুরি। মাতৃভাষায় কুরআন বুঝে পড়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানগত ও নৈতিক অনুশীলন হতে পারে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে সাংবাদিকদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ
মূল বক্তব্যের পর উপস্থিত সাংবাদিকরা কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়কের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সাংবাদিকতার বাস্তবতা, কুরআনের নির্দেশনা, নৈতিকতা, তথ্য যাচাই এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
আবু সাঈদ খান কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে সভায় প্রাণবন্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের পরিবেশ তৈরি হয়।
সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংহতি, সহযোগিতার অঙ্গীকার
সভাটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল উপস্থিত সাংবাদিকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও সহযোগিতার আগ্রহ। তাঁরা কুরআন পাঠ আন্দোলনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী, ব্যতিক্রমধর্মী এবং সমাজের নৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রচেষ্টা হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
একজন সাংবাদিক জানান, তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে কুরআন পাঠ ও এর বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করে আসছেন। সমাজে সংগঠিতভাবে কুরআন পাঠের সংস্কৃতি বিস্তারে এমন একটি উদ্যোগ দেখতে পেয়ে তিনি আনন্দিত। তিনি এ কার্যক্রমের প্রতি সংহতি ও সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
অন্যান্য সাংবাদিকরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার এবং কুরআন পাঠের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে সহযোগিতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তাঁদের মতে, সমাজে সত্য, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইন বা প্রশাসনিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তা, বিবেক ও আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন। কুরআনের নৈতিক শিক্ষার আলোকে মানুষের মধ্যে সত্যনিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে সহযোগিতার আশ্বাস
সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে গজারিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম শেখ কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়ক আবু সাঈদ খানকে এ ধরনের একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও তাৎপর্যপূর্ণ মতবিনিময় সভা আয়োজনের জন্য আন্তরিক মোবারকবাদ জানান।
তিনি বলেন, কুরআন পাঠ জনপ্রিয়করণের লক্ষ্যে কুরআন পাঠ আন্দোলন সমাজের সর্বস্তরে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সে সম্পর্কে তাঁদের আগে বিস্তারিত ধারণা ছিল না। আজকের আলোচনা থেকে আন্দোলনের উদ্দেশ্য, কর্মপরিধি ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে।
তিনি গজারিয়ায় ভবিষ্যতে কুরআন পাঠ আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে সহযোগিতা ও সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে আগামীতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সত্যের পক্ষে কলম, ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান—সমাজ পরিবর্তনের প্রত্যাশা
গজারিয়া প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভা কেবল একটি আলোচনা অনুষ্ঠান ছিল না; বরং সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে নৈতিকতা, বিবেক ও মানবিক মূল্যবোধের সম্পর্ক নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
সাংবাদিকতা তখনই প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমূলক হয়ে ওঠে, যখন সংবাদকর্মী ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য প্রকাশ করেন, দুর্বল ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের কথা তুলে ধরেন এবং অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অবস্থান নেন।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা পরস্পরের পরিপূরক। স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্যতম ভিত্তি হলো সত্যনিষ্ঠা, আর সেই সত্যনিষ্ঠাকে অর্থবহ করে তোলে নৈতিকতা ও পেশাগত জবাবদিহি।
কুরআন পাঠ আন্দোলনের প্রত্যাশা—পবিত্র কুরআনের বক্তব্য মাতৃভাষায় বুঝে পড়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সত্য অনুসন্ধান, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। সাংবাদিক সমাজও যেন সেই মূল্যবোধ ধারণ করে সমাজের দর্পণ হিসেবে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে।
গজারিয়া প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংহতি ও সহযোগিতার অঙ্গীকার এ উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন প্রত্যাশা, এ আলোচনা শুধু সভাকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাংবাদিকতার বাস্তব চর্চা, সংবাদ প্রকাশের নীতি এবং সমাজের প্রতিদিনের জীবনে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।