বিপ্লবের সুফল ভোগ করে বিএনপি, ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ হতে চায়: হাসনাতের বিস্ফোরক অভিযোগ
বিপ্লবের সুফল ভোগ করে ক্ষমতার রাজনীতিতে পুরোনো পথেই বিএনপি? হাসনাতের বিস্ফোরক বক্তব্যে নতুন বিতর্ক
‘ব্যর্থ আওয়ামী লীগ’ আখ্যা, কর্তৃত্ববাদ ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিএনপিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন এনসিপির এই সংসদ সদস্য; রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, দেশের বিভিন্ন সময়ে গণআন্দোলন ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক অর্জন এসেছে, বিএনপি সেসব অর্জনের সুবিধা ভোগ করে। অথচ পরবর্তী সময়ে দলটির মধ্যে আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক আচরণ করার প্রবণতা দেখা যায়।
বিএনপিকে ‘ব্যর্থ আওয়ামী লীগ’ আখ্যা দিয়ে তাঁর এমন মন্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ক্ষমতার ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।
বিপ্লবের অর্জন কার স্বার্থে?
হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণআন্দোলনের অর্জন ও রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থানের প্রশ্ন। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, বিএনপি সেসব পরিবর্তনের সুফল ভোগ করেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অবস্থান সুসংহত করার ক্ষেত্রে দলটির মধ্যে পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এখানেই উঠে এসেছে একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন—গণআন্দোলনের উদ্দেশ্য কি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠারও পরিবর্তন?
কারণ, কোনো আন্দোলনে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে, রাজনৈতিক কর্মীরা ঝুঁকি নেন, তরুণেরা জীবন উৎসর্গ করেন; কিন্তু আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি একই ধরনের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ফিরে আসে, তাহলে সেই আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন কোথায়?
দল বদলালেই কি রাজনৈতিক চরিত্র বদলায়?
হাসনাত তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ হওয়াকে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নাম বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর মতে, কর্তৃত্ববাদী মনোভাব, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, ভিন্নমত দমনের প্রবণতা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক আচরণই একটি দলের রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণ করে।
তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, পোশাক, স্লোগান কিংবা দলীয় পরিচয় পরিবর্তন করলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে না। একজন রাজনীতিকের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁর আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেননি, বরং ভবিষ্যতের সব রাজনৈতিক শক্তির জন্যও একটি সতর্কবার্তা তুলে ধরেছেন।
১৯৯০, ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালের রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন
বিএনপির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা তুলে ধরে হাসনাত আব্দুল্লাহ ১৯৯০, ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গ সামনে আনেন। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করতে গিয়ে বিএনপিও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।
নির্বাচনব্যবস্থা নিয়েও তিনি বিএনপির সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ যেভাবে নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রভাবিত ও বিতর্কিত করার পথে এগিয়েছে, বিএনপিও সেদিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে সেই প্রচেষ্টায় দলটি সফল হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ। অভিযোগগুলোর যথার্থতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য, দলগুলোর ভূমিকা এবং বিএনপির বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুরোনো সংস্কৃতির আশঙ্কা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কতটা ঘটেছে, সেই প্রশ্ন দীর্ঘদিনের।
একটি রাজনৈতিক দল বিরোধী দলে থাকাকালে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার কথা বললেও ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে একই মূল্যবোধ ধরে রাখতে পারে কি না, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে বলা যায়, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনে জয়লাভের নাম নয়। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন, জবাবদিহি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, বিরোধী মতের প্রতি সম্মান এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।
যে দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসুক, এসব মৌলিক নীতি অক্ষুণ্ন রাখতে না পারলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেন রাজপথে রক্ত দেবে?
বক্তব্যে হাসনাত আব্দুল্লাহ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন প্রজন্মের আত্মত্যাগের বিষয়টি তুলে ধরেন। নব্বইয়ের দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মানুষকে রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি দেশের প্রতিটি প্রজন্মকেই যদি নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য রক্ত দিতে হয়, তাহলে সেই দেশ কখন স্থিতিশীলভাবে গড়ে উঠবে?
প্রশ্নটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।
এক প্রজন্ম আন্দোলন করে অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে, আরেক প্রজন্ম সেই একই অধিকার আদায়ের জন্য আবার রাজপথে নামে—এমন পরিস্থিতি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য উদ্বেগজনক।
বিএনপির সামনে এখন কী পরীক্ষা?
হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, ক্ষমতার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির মূল্যায়ন জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিএনপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দলটি তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, গণতান্ত্রিক অবস্থান ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করতে পারে, তা প্রমাণ করা। একইভাবে এনসিপিসহ নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেও কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখতে হবে।
কারণ, কর্তৃত্ববাদবিরোধী রাজনীতি করা আর বাস্তবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।
জনগণ কি আবারও হতাশ হবে?
বাংলাদেশের মানুষ বারবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশায় আন্দোলন করেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল—একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতা দখল, প্রভাব বিস্তার, প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা কিংবা প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা ফিরে এলে সেই প্রত্যাশা আবারও বাধাগ্রস্ত হবে।
হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য সেই আশঙ্কাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাল্টা বক্তব্য থাকাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বিএনপিরও এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, রাজনৈতিক ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং জনগণের সামনে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার অংশ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ কি শুধু ক্ষমতার পালাবদল দেখবে, নাকি সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও দেখবে? বিপ্লবের সুফল যদি সাধারণ মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কাজে না আসে, তাহলে সেই বিপ্লবের প্রত্যাশিত অর্জন কতটা পূর্ণতা পাবে?
দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এই প্রশ্নের উত্তর এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।















