. সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান থেকে বাদ পরীমনি, পেশাগত মর্যাদায় ঐক্যবদ্ধ গণমাধ্যমকর্মীরা
সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে চট্টগ্রামের অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান থেকে বাদ পরীমনি: গণমাধ্যমের মর্যাদা ও সাংবাদিকের আত্মসম্মানের প্রশ্নে নতুন আলোচনা
সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ গণমাধ্যমকর্মীরা, চাপের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন আয়োজকদের—শিল্পী ও আয়োজকদের দায়বদ্ধতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
চিত্রনায়িকা পরীমনিকে ঘিরে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে চট্টগ্রামের একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান থেকে তাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আয়োজকরা। গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকদের সম্মিলিত অবস্থানের পর আয়োজকদের এ সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনায় এনেছে সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং শিল্পীসমাজের দায়িত্বশীলতার বিষয়টি।
শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে আয়োজকরা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা আদালত চত্বরে সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনার ১৭ দিন আগেই পরীমনির সঙ্গে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিষয়ে তাদের চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমকর্মীকে অসম্মান করার অভিযোগ এবং চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে আয়োজক কমিটি তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে পরীমনিকে অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ঘটনাটি কেবল একটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান থেকে কোনো তারকাকে বাদ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে সাংবাদিকদের পেশাগত সম্মান, সহকর্মীর প্রতি সংহতি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।কী ঘটেছিল, কেন প্রতিবাদের সূত্রপাত?
ঘটনার সূত্রপাত পরীমনির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে। গত শুক্রবার রাতে নিজের ফেসবুক ওয়ালে ‘চট্টগ্রাম ফ্যাশন ভ্যানগার্ড অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এর পোস্টার শেয়ার করে পরীমনি লেখেন, ‘দেখা হচ্ছে প্রিয় চট্টগ্রাম।’
তার এই পোস্টের পর জাতীয় দৈনিকের একজন প্রতিবেদক আয়োজকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, দৈনিক সমকালের সাংবাদিক রবির সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে পরীমনির প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের মায়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান না হলে আয়োজকদের বিকল্প অতিথি নির্বাচন করা উচিত।
এরপর বিষয়টি চট্টগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সাংবাদিকদের একাংশ মনে করেন, একজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণের অভিযোগের যথাযথ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননামূলক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো পেশাগত সংহতির পরিপন্থী।সাংবাদিকদের এই প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত অবস্থান পরিবর্তন করেন আয়োজকরা। পরীমনিকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠানের নতুন পোস্টারও প্রকাশ করা হয়েছে।
সাংবাদিকের মর্যাদা কি শুধু প্রতিবাদের বিষয়?
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের পেশা নয়। রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন ও জনজীবনের নানা অসংগতি তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব। একজন সাংবাদিক যখন মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন, তখন তাকে নানা প্রতিকূলতা, চাপ, হুমকি ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে কোনো গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণের অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, একজন সাংবাদিকের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়া মানে শুধু একজন ব্যক্তির সম্মানহানি নয়; এটি বৃহত্তর গণমাধ্যমকর্মী সমাজের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
তবে প্রতিবাদের পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত বিবরণ, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও জরুরি। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধান ও প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।তারকাদের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাও জরুরি
দেশের বিনোদন অঙ্গনের শিল্পীরা সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থনের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাদের উপস্থিতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয় করে তোলে। কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বও জড়িয়ে থাকে।
সাংবাদিক ও শিল্পী—উভয়েই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন শিল্পীর যেমন সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তেমনি একজন সাংবাদিকেরও পেশাগত সম্মান ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
মতবিরোধ কিংবা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে সংযম, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে নেওয়াই দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয়।
আয়োজকদের সিদ্ধান্তে কী বার্তা গেল?
চট্টগ্রামের ‘ফ্যাশন ভ্যানগার্ড অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ থেকে পরীমনিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেক সাংবাদিক সহকর্মীর প্রতি সংহতির বার্তা হিসেবে দেখছেন। আয়োজকদের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে অতিথির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।তবে এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মূল ঘটনার নিষ্পত্তি হয়েছে—এমনটি বলার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে পরীমনির বক্তব্য, ব্যাখ্যা কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান
আয়োজকদের ঘোষণামতে, আগামী ২৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের খুলশী থানাধীন একটি কমিউনিটি সেন্টারে ‘চট্টগ্রাম ফ্যাশন ভ্যানগার্ড অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরীমনিকে বাদ দিয়ে ইতোমধ্যে অনুষ্ঠানের নতুন পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, আয়োজকদের এই সিদ্ধান্তের পর অনুষ্ঠানটি কীভাবে এগিয়ে যায় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না।
শেষ কথা: সাংবাদিকের সম্মান রক্ষায় ঐক্যই হোক শক্তি
সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষের কথা বলার, সত্য তুলে ধরার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক অসম্মান, হুমকি কিংবা হয়রানির শিকার হলে তার প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন।তবে প্রতিবাদ হতে হবে তথ্যনির্ভর, শালীন ও ন্যায়সংগত। ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং পেশাগত মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিই হোক সাংবাদিক সমাজের মূল দাবি।
চট্টগ্রামের এই ঘটনা আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—সাংবাদিকরা যদি নিজেদের সহকর্মীর সম্মান রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ না হন, তাহলে পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দেওয়া নয়, সাংবাদিকের মর্যাদা নিশ্চিত করাই হোক সভ্য সমাজের অঙ্গীকার।















