ঢাকা ১২:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাতের ভেতর কাঁচ রেখেই সেলাই! এক মাস যন্ত্রণায় দিনমজুর, চিকিৎসকের ‘স্যরি’তে কি দায়ভার শেষ?

নিজস্ব সংবাদ :

হাতের ভেতরে কাঁচ রেখে সেলাই, এক মাস যন্ত্রণায় দিনমজুর! চিকিৎসকের ‘স্যরি’তেই কি শেষ দায়?
চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন, ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক :
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে এক অসহায় দিনমজুরের হাতের মাংসপেশির ভেতরে কাঁচের দুটি টুকরা রেখেই চিকিৎসা শেষ করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অসহনীয় ব্যথা ও যন্ত্রণা সহ্য করার পর অন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাত থেকে কাঁচের টুকরা বের করতে হয়েছে ভুক্তভোগী সাইদার মিয়াকে। ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এমন গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘ওটা ভুলবশত হয়ে গেছে। এজন্য স্যরি। আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।’
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন অসহায় মানুষের শরীরে চিকিৎসার সময় এমন ভুল হলে শুধু ‘স্যরি’ বললেই কি সব দায় শেষ হয়ে যায়? একজন রোগীকে এক মাসের বেশি সময় যন্ত্রণা ভোগ করতে হলে, তার কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হলে, সেই ক্ষতির দায় কে নেবে? সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কি কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার নাম, নাকি রোগীর নিরাপত্তা ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব?
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চিলমারী উপজেলার মজিদের পাড় এলাকার বাসিন্দা সাইদার মিয়া একজন ভূমিহীন দিনমজুর। অন্যের জমিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন তিনি। এক মাসেরও বেশি সময় আগে বাড়িতে বিদ্যুতের সুইচ মেরামতের কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পড়ে যান তিনি। এ সময় ভাঙা কাঁচের আঘাতে তার বাম হাত গভীরভাবে কেটে যায় এবং হাতের মাংসপেশির ভেতরে কাঁচের টুকরা ঢুকে পড়ে।
স্থানীয় লোকজন তাকে দ্রুত চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকার কথা জানিয়ে তাকে ভর্তি করা হয়নি। প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যান্ডেজ করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু হাতের ভেতরে কাঁচের টুকরা রয়ে গেছে কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা সেগুলো অপসারণের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে অভিযোগ তার।
এরপর শুরু হয় এক অসহায় মানুষের দীর্ঘ যন্ত্রণার দিন। হাতের ব্যথা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেননি তিনি। দিনমজুরের জীবনে কাজ বন্ধ থাকা মানেই পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া। একদিকে শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে সংসারের চিন্তা—দুই সংকটে পড়ে যান সাইদার মিয়া।
এক্স-রেতে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য
দীর্ঘদিনেও ব্যথা না কমায় শেষ পর্যন্ত অন্য চিকিৎসকের পরামর্শে এক্স-রে করান তিনি। পরীক্ষায় হাতের মাংসপেশির ভেতরে কাঁচের দুটি টুকরা থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেগুলো বের করা হয়।
এ ঘটনা শুধু একজন রোগীর দুর্ভোগের চিত্র নয়; এটি সরকারি হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবা, ক্ষত পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ইমেজিং এবং রোগীকে যথাযথভাবে রেফার করার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
‘স্যরি’ বললেই কি দায়িত্ব শেষ?
চিকিৎসক ভুল করতে পারেন—চিকিৎসাবিজ্ঞানে জটিলতা থাকতে পারে, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। কিন্তু কোনো চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। ভুল স্বীকার করা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই রোগীর ক্ষতি পূরণ হয় না।
একজন অসহায় দিনমজুরের হাতের ভেতরে কাঁচের টুকরা থেকে যাওয়ার অভিযোগ কেন উঠল, প্রথমবার চিকিৎসার সময় ক্ষত যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, প্রয়োজনীয় এক্স-রে বা অন্য পরীক্ষা কেন করা হয়নি, চিকিৎসার নথিতে কী লেখা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসা জরুরি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি ভুলবশত হয়েছে। কিন্তু ভুলটি কীভাবে হলো, কার দায়িত্বে হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্ধারিত চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন কি না, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
একজন দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার অধিকার কি কম?
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। বিশেষ করে দরিদ্র, ভূমিহীন ও দিনমজুর মানুষের কাছে সরকারি হাসপাতালই শেষ আশ্রয়। তাদের অনেকের পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়।
সাইদার মিয়ার মতো একজন দিনমজুরের কাছে হাত শুধু শরীরের একটি অঙ্গ নয়, এটি তার জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। হাতের আঘাতের কারণে কাজ করতে না পারলে তার পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।
তাই সরকারি হাসপাতালে আসা কোনো রোগীকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। রোগীর আর্থিক অবস্থা, সামাজিক পরিচয় কিংবা পেশা বিবেচনা না করে প্রত্যেককে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব।
কর্তৃপক্ষের কাছে যেসব প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন
১. সাইদার মিয়াকে প্রথমবার হাসপাতালে নেওয়ার পর তার ক্ষত যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না?
২. হাতের গভীর ক্ষতের ভেতরে কাঁচের টুকরা থাকার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়নি কেন?
৩. রোগীকে ভর্তি না করার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন এবং চিকিৎসার নথিতে কী কারণ উল্লেখ রয়েছে?
৪. হাসপাতালের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা চিকিৎসার প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করেছিলেন কি না?
৫. চিকিৎসকের ভুল বা অবহেলার কারণে রোগীর অতিরিক্ত ভোগান্তি হয়ে থাকলে তার দায়ভার কে নেবে?
৬. হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান ও রোগী ব্যবস্থাপনা তদারকিতে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনকে।
কী হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের?
এ ঘটনায় আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার দাবি নয়; বরং আইন, চিকিৎসাবিধি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সুষ্ঠু তদন্তই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—
ঘটনাটি তদন্তে নিরপেক্ষ মেডিকেল তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
রোগীর চিকিৎসার নথি, প্রাথমিক ক্ষতের বিবরণ এবং পরবর্তী এক্স-রে ও অস্ত্রোপচারের তথ্য পর্যালোচনা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের বক্তব্য নিতে হবে।
চিকিৎসায় পেশাগত অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
রোগীর অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় ও ক্ষতির বিষয়ে যথাযথভাবে খোঁজ নিয়ে আইনসম্মত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনা, ক্ষত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে।
ক্ষমা নয়, জবাবদিহি ও কার্যকর প্রতিকার চাই
সাইদার মিয়ার ঘটনায় সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, চিকিৎসাসেবায় ছোট বলে কোনো ভুলকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। একটি অবহেলা বা ভুল সিদ্ধান্ত একজন দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবার ও ভবিষ্যৎকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
চিকিৎসকের ‘স্যরি’ বলা হয়তো অনুশোচনার প্রকাশ। কিন্তু সেই অনুশোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হবে, রোগীর ক্ষতির যথাযথ প্রতিকার হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমরা চাই না, কোনো দরিদ্র রোগী সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার পরিবর্তে নতুন দুর্ভোগের শিকার হোক। আমরা চাই, সরকারি হাসপাতাল হোক অসহায় মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। চিকিৎসকের দায়িত্ব হোক মানবিকতা, সততা ও পেশাগত নিষ্ঠার সঙ্গে রোগীর পাশে দাঁড়ানো।
একটি প্রশ্ন আজ জনমনে—একজন দিনমজুরের হাতের ভেতরে কাঁচ রেখে চিকিৎসা শেষ করার অভিযোগ উঠল, এক মাস পর অস্ত্রোপচার করে সেই কাঁচ বের করতে হলো; এরপর শুধু ‘স্যরি’ বলেই কি দায়িত্ব শেষ? নাকি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে?
এই প্রশ্নের জবাব এখন সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাছেই প্রত্যাশিত।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:৫১:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
৪ বার পড়া হয়েছে

হাতের ভেতর কাঁচ রেখেই সেলাই! এক মাস যন্ত্রণায় দিনমজুর, চিকিৎসকের ‘স্যরি’তে কি দায়ভার শেষ?

আপডেট সময় ১০:৫১:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

হাতের ভেতরে কাঁচ রেখে সেলাই, এক মাস যন্ত্রণায় দিনমজুর! চিকিৎসকের ‘স্যরি’তেই কি শেষ দায়?
চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন, ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক :
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে এক অসহায় দিনমজুরের হাতের মাংসপেশির ভেতরে কাঁচের দুটি টুকরা রেখেই চিকিৎসা শেষ করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অসহনীয় ব্যথা ও যন্ত্রণা সহ্য করার পর অন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাত থেকে কাঁচের টুকরা বের করতে হয়েছে ভুক্তভোগী সাইদার মিয়াকে। ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এমন গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘ওটা ভুলবশত হয়ে গেছে। এজন্য স্যরি। আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।’
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন অসহায় মানুষের শরীরে চিকিৎসার সময় এমন ভুল হলে শুধু ‘স্যরি’ বললেই কি সব দায় শেষ হয়ে যায়? একজন রোগীকে এক মাসের বেশি সময় যন্ত্রণা ভোগ করতে হলে, তার কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হলে, সেই ক্ষতির দায় কে নেবে? সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কি কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার নাম, নাকি রোগীর নিরাপত্তা ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব?
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চিলমারী উপজেলার মজিদের পাড় এলাকার বাসিন্দা সাইদার মিয়া একজন ভূমিহীন দিনমজুর। অন্যের জমিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন তিনি। এক মাসেরও বেশি সময় আগে বাড়িতে বিদ্যুতের সুইচ মেরামতের কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পড়ে যান তিনি। এ সময় ভাঙা কাঁচের আঘাতে তার বাম হাত গভীরভাবে কেটে যায় এবং হাতের মাংসপেশির ভেতরে কাঁচের টুকরা ঢুকে পড়ে।
স্থানীয় লোকজন তাকে দ্রুত চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকার কথা জানিয়ে তাকে ভর্তি করা হয়নি। প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যান্ডেজ করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু হাতের ভেতরে কাঁচের টুকরা রয়ে গেছে কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা সেগুলো অপসারণের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে অভিযোগ তার।
এরপর শুরু হয় এক অসহায় মানুষের দীর্ঘ যন্ত্রণার দিন। হাতের ব্যথা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেননি তিনি। দিনমজুরের জীবনে কাজ বন্ধ থাকা মানেই পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া। একদিকে শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে সংসারের চিন্তা—দুই সংকটে পড়ে যান সাইদার মিয়া।
এক্স-রেতে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য
দীর্ঘদিনেও ব্যথা না কমায় শেষ পর্যন্ত অন্য চিকিৎসকের পরামর্শে এক্স-রে করান তিনি। পরীক্ষায় হাতের মাংসপেশির ভেতরে কাঁচের দুটি টুকরা থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেগুলো বের করা হয়।
এ ঘটনা শুধু একজন রোগীর দুর্ভোগের চিত্র নয়; এটি সরকারি হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবা, ক্ষত পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ইমেজিং এবং রোগীকে যথাযথভাবে রেফার করার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
‘স্যরি’ বললেই কি দায়িত্ব শেষ?
চিকিৎসক ভুল করতে পারেন—চিকিৎসাবিজ্ঞানে জটিলতা থাকতে পারে, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। কিন্তু কোনো চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। ভুল স্বীকার করা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই রোগীর ক্ষতি পূরণ হয় না।
একজন অসহায় দিনমজুরের হাতের ভেতরে কাঁচের টুকরা থেকে যাওয়ার অভিযোগ কেন উঠল, প্রথমবার চিকিৎসার সময় ক্ষত যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, প্রয়োজনীয় এক্স-রে বা অন্য পরীক্ষা কেন করা হয়নি, চিকিৎসার নথিতে কী লেখা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসা জরুরি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি ভুলবশত হয়েছে। কিন্তু ভুলটি কীভাবে হলো, কার দায়িত্বে হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্ধারিত চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন কি না, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
একজন দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার অধিকার কি কম?
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। বিশেষ করে দরিদ্র, ভূমিহীন ও দিনমজুর মানুষের কাছে সরকারি হাসপাতালই শেষ আশ্রয়। তাদের অনেকের পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়।
সাইদার মিয়ার মতো একজন দিনমজুরের কাছে হাত শুধু শরীরের একটি অঙ্গ নয়, এটি তার জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। হাতের আঘাতের কারণে কাজ করতে না পারলে তার পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।
তাই সরকারি হাসপাতালে আসা কোনো রোগীকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। রোগীর আর্থিক অবস্থা, সামাজিক পরিচয় কিংবা পেশা বিবেচনা না করে প্রত্যেককে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব।
কর্তৃপক্ষের কাছে যেসব প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন
১. সাইদার মিয়াকে প্রথমবার হাসপাতালে নেওয়ার পর তার ক্ষত যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না?
২. হাতের গভীর ক্ষতের ভেতরে কাঁচের টুকরা থাকার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়নি কেন?
৩. রোগীকে ভর্তি না করার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন এবং চিকিৎসার নথিতে কী কারণ উল্লেখ রয়েছে?
৪. হাসপাতালের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা চিকিৎসার প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করেছিলেন কি না?
৫. চিকিৎসকের ভুল বা অবহেলার কারণে রোগীর অতিরিক্ত ভোগান্তি হয়ে থাকলে তার দায়ভার কে নেবে?
৬. হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান ও রোগী ব্যবস্থাপনা তদারকিতে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনকে।
কী হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের?
এ ঘটনায় আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার দাবি নয়; বরং আইন, চিকিৎসাবিধি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সুষ্ঠু তদন্তই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—
ঘটনাটি তদন্তে নিরপেক্ষ মেডিকেল তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
রোগীর চিকিৎসার নথি, প্রাথমিক ক্ষতের বিবরণ এবং পরবর্তী এক্স-রে ও অস্ত্রোপচারের তথ্য পর্যালোচনা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের বক্তব্য নিতে হবে।
চিকিৎসায় পেশাগত অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
রোগীর অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় ও ক্ষতির বিষয়ে যথাযথভাবে খোঁজ নিয়ে আইনসম্মত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনা, ক্ষত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে।
ক্ষমা নয়, জবাবদিহি ও কার্যকর প্রতিকার চাই
সাইদার মিয়ার ঘটনায় সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, চিকিৎসাসেবায় ছোট বলে কোনো ভুলকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। একটি অবহেলা বা ভুল সিদ্ধান্ত একজন দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবার ও ভবিষ্যৎকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
চিকিৎসকের ‘স্যরি’ বলা হয়তো অনুশোচনার প্রকাশ। কিন্তু সেই অনুশোচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হবে, রোগীর ক্ষতির যথাযথ প্রতিকার হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমরা চাই না, কোনো দরিদ্র রোগী সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার পরিবর্তে নতুন দুর্ভোগের শিকার হোক। আমরা চাই, সরকারি হাসপাতাল হোক অসহায় মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। চিকিৎসকের দায়িত্ব হোক মানবিকতা, সততা ও পেশাগত নিষ্ঠার সঙ্গে রোগীর পাশে দাঁড়ানো।
একটি প্রশ্ন আজ জনমনে—একজন দিনমজুরের হাতের ভেতরে কাঁচ রেখে চিকিৎসা শেষ করার অভিযোগ উঠল, এক মাস পর অস্ত্রোপচার করে সেই কাঁচ বের করতে হলো; এরপর শুধু ‘স্যরি’ বলেই কি দায়িত্ব শেষ? নাকি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে?
এই প্রশ্নের জবাব এখন সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাছেই প্রত্যাশিত।