ঢাকা ০৯:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকের কলম থামানো যাবে না, নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন—অবিলম্বে চাই সাংবাদিক সুরক্ষা আইন

নিজস্ব সংবাদ :

জাতীয় সম্পাদকীয় দাবি ও সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত আহ্বান
আর কোনো দাবি নয়, সাংবাদিকদের একটাই দাবি—‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই’
সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দেওয়া মানে জনগণের কণ্ঠরোধ করা; হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানি থেকে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় চাই পৃথক, কঠোর ও কার্যকর আইন
সরকার কি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করবে? সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশা—কথা নয়, এবার আইনের বাস্তবায়ন চাই।
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একজন সাংবাদিক যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেন, তখন তিনি শুধু একটি সংবাদ প্রকাশ করেন না; তিনি সমাজের অসংগতি, রাষ্ট্রের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের অধিকারহরণের বিরুদ্ধে কথা বলেন। একজন সাংবাদিক যখন কোনো অসহায় মানুষের কান্না তুলে ধরেন, তখন তাঁর কলমে উঠে আসে সেই মানুষের ন্যায়বিচারের আকুতি। যখন কোনো অপরাধী চক্র, ভূমিদস্যু, মাদক কারবারি, দুর্নীতিবাজ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তখন সেই সংবাদ সমাজকে সতর্ক করে, প্রশাসনকে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যাঁরা সবার নিরাপত্তা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের কথা বলেন, তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তা কোথায়?
যে সাংবাদিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেন, তাঁকেই যদি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়, যে সাংবাদিক দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধান করেন, তাঁকেই যদি মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো হয়, যে সংবাদকর্মী মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেন, তাঁকেই যদি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়—তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কোথায়?
আজ সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে একটি স্পষ্ট, যৌক্তিক এবং জাতীয় পর্যায়ের দাবি উত্থাপন করা প্রয়োজন।
আর কোনো দাবি নেই, সাংবাদিকদের একটাই দাবি—সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই।
এটি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সংগঠনের একক দাবি নয়। এটি দেশের পেশাদার সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক, টেলিভিশন সংবাদকর্মী, ফটোসাংবাদিক, ভিডিও সাংবাদিক, অনলাইন সংবাদকর্মী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংবাদকর্মীসহ সমগ্র গণমাধ্যম অঙ্গনের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড, প্রশাসনের দায়িত্ব পালন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনদুর্ভোগ, দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর জনগণের সামনে তুলে ধরেন সাংবাদিকরা।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
কোথাও সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিককে বাধার মুখে পড়তে হয়। কোথাও ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কোথাও সংবাদ প্রকাশের কারণে হুমকি আসে। কোথাও রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপে সাংবাদিককে সংবাদ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়। আবার কোথাও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, চাকরিচ্যুতি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
বিশেষ করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকদের পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাঁরা অনেক সময় সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই কাজ করেন। তাঁদের কাছে নেই পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা, নেই সব ক্ষেত্রে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
একজন সংবাদকর্মী যখন স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেন, তখন তাঁকে পরবর্তী সময়ে একই এলাকায় বসবাস ও কাজ করতে হয়। তাঁর পরিবারও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।
এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য সতর্কবার্তা
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ শুধু আবেগের বিষয় নয়; বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদনেও এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশে সাংবাদিকদের ওপর ২৮৮টি হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫১৮ জন সাংবাদিক আক্রান্ত বা হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ২৯৭ জন আহত হয়েছেন।
এ ধরনের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বিচ্ছিন্ন আলোচনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধ, দ্রুত তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর সম্পাদক পরিষদ সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, হয়রানি ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
অর্থাৎ সাংবাদিকদের নিরাপত্তার দাবি কোনো একক কণ্ঠের দাবি নয়; এটি গণমাধ্যমের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ: এবার বাস্তবায়নের সময়
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবির পেছনে ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ২২ মার্চ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে। সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের সময় হুমকি, হয়রানি, হামলা ও পেশাগত বাধা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পায়।
২০২৫ সালের ৪ মে তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের খসড়া পর্যালোচনা এবং আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট সাংবাদিক নেতারাও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষায় পৃথক আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
অতএব প্রশ্নটি এখন আর সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আইন বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ কবে নেওয়া হবে?
কমিশনের সুপারিশ, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দাবি এবং মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীদের অভিজ্ঞতা একত্র করে সরকার চাইলে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইনে যে বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে
সাংবাদিক সমাজের প্রস্তাবিত দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
১. দায়িত্ব পালনের সময় হামলায় কঠোর শাস্তি
সংবাদ সংগ্রহ, ছবি ধারণ, ভিডিও ধারণ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ কিংবা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকের ওপর পরিকল্পিত হামলা, মারধর, অপহরণ, হত্যার হুমকি কিংবা পেশাগত কাজে বাধা সৃষ্টি করলে দ্রুত মামলা গ্রহণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে হবে।
২. সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক মামলা ও হয়রানি বন্ধ
কোনো সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিককে ভয় দেখানো, মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর চেষ্টা, অযৌক্তিক আইনি হয়রানি কিংবা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি সুরক্ষা থাকতে হবে। তবে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধের অভিযোগ থাকলে যথাযথ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. হুমকির ঘটনায় তাৎক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা
কোনো সাংবাদিক দায়িত্ব পালনের কারণে বিশ্বাসযোগ্য প্রাণনাশের হুমকি পেলে সংশ্লিষ্ট থানাকে দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার
সাংবাদিক হত্যা, গুরুতর নির্যাতন ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় বিশেষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা আর্থিক প্রভাব বিবেচনা না করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
৫. সাংবাদিকের পরিবারকে নিরাপত্তা ও সহায়তা
সাংবাদিকের ওপর হামলা বা হত্যার হুমকির কারণে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঝুঁকিতে পড়লে তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিক নিহত বা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারালে তাঁর পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৬. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা
জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকতে হবে। সাংবাদিকের নোট, রেকর্ডিং, ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল তথ্য জব্দ কিংবা তল্লাশির ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়া ও বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
৭. নারী সাংবাদিকদের বিশেষ সুরক্ষা
নারী সাংবাদিকরা মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ ও অনলাইন সাংবাদিকতায় নানা ধরনের হয়রানি, হুমকি, অশালীন মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখোমুখি হন। তাঁদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিকারের জন্য পৃথক কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৮. জেলা ও উপজেলা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা
শুধু রাজধানী বা বড় শহরের সাংবাদিকদের নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা সংবাদকর্মীদেরও সমান আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। তাঁদের পরিচয়পত্র, দায়িত্ব পালনের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং হুমকির ঘটনায় প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৯. স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত অধিকার ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশনে সাংবাদিক প্রতিনিধি, সম্পাদক, আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
১০. ন্যায্য বেতন, নিয়োগপত্র ও চাকরির নিরাপত্তা
সাংবাদিকের নিরাপত্তা শুধু হামলা থেকে বেঁচে থাকার বিষয় নয়। একজন সংবাদকর্মীর ন্যায্য বেতন, নিয়োগপত্র, নিয়মিত বেতন পরিশোধ, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ছুটি, চিকিৎসা, জীবনবিমা, ঝুঁকি ভাতা ও অবসরকালীন সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রিন্ট, টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন—সব মাধ্যমের সাংবাদিকদের অধিকার সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন মানে সাংবাদিকদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখা নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সাংবাদিক সুরক্ষা আইন কোনো সাংবাদিককে অপরাধ করার ছাড়পত্র দেবে না। সাংবাদিক পরিচয়ে কেউ চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, মিথ্যা তথ্য প্রচার কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত হলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
কিন্তু একজন সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদে কেউ ক্ষুব্ধ হলেই তাঁকে মারধর, হুমকি, হয়রানি কিংবা প্রতিশোধের শিকার করার অধিকার কারও নেই।
সংবাদে ভুল থাকলে প্রতিবাদ, সংশোধন, জবাব প্রকাশ কিংবা আইনসম্মত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিককে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার কোনো বৈধতা নেই।
তাই সাংবাদিক সুরক্ষা আইনে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। আইনটি হতে হবে সাংবাদিকের অধিকার রক্ষার ঢাল, কোনো ব্যক্তির অন্যায় আড়াল করার হাতিয়ার নয়।
সরকারের কাছে সাংবাদিক সমাজের জাতীয় পর্যায়ের ১০ দফা দাবি
১. অবিলম্বে সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করতে হবে।
২. সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীদের মতামত নিয়ে আইনটি চূড়ান্ত করতে হবে।
৩. দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন, অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
৪. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক মামলা, ভয়ভীতি ও পেশাগত হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।
৫. হুমকির মুখে থাকা সাংবাদিকদের দ্রুত পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচারহীনতা বন্ধে বিশেষ তদন্ত ও দ্রুত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
৭. জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকদের জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, নিয়োগপত্র, চিকিৎসা, বিমা ও চাকরির অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
৯. স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে।
১০. আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করতে হবে।
সরকার ও সাংবাদিক—সম্পর্কের ভিত্তি হোক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জবাবদিহি
সরকার ও সাংবাদিক সমাজের সম্পর্ক হওয়া উচিত দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। সাংবাদিকের কাজ সরকারের প্রশংসা করা নয়, আবার সরকারের প্রতিটি উদ্যোগের বিরোধিতা করাও নয়। সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সত্য অনুসন্ধান করা, তথ্য যাচাই করা এবং জনগণের সামনে বাস্তব চিত্র তুলে ধরা।
সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করা যেমন সাংবাদিকতার অংশ, তেমনি ভুলত্রুটি ও অনিয়ম তুলে ধরাও সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
কোনো সরকার যদি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং সংবাদ প্রকাশের কারণে প্রতিশোধমূলক হয়রানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সেই সরকারের প্রতি গণমাধ্যমের আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। তবে সাংবাদিকদের সমর্থন কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়; তা হবে ন্যায়সংগত নীতি, জনগণের স্বার্থ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে।
সাংবাদিকরা সরকারের প্রতিপক্ষ নন। তাঁরা রাষ্ট্রেরও প্রতিপক্ষ নন। তাঁরা জনগণের তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। তাঁদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকলেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো আরও জবাবদিহিমূলক হওয়ার সুযোগ পায়।
একটি সাংবাদিকের কলম থেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ
একজন সাংবাদিক যখন নিরাপত্তাহীনতার কারণে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করতে ভয় পান, তখন শুধু একজন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই এলাকার সাধারণ মানুষও।
যখন কোনো সংবাদকর্মী হুমকির কারণে মাদক ব্যবসা, অবৈধ দখল, নারী নির্যাতন, মানবপাচার কিংবা প্রশাসনিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন, তখন অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।
তাই সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিরোধকে শক্তিশালী করা।
সাংবাদিককে নিরাপদ রাখুন, সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন রাখুন, জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করুন।
জাতীয় সম্পাদকীয় আহ্বান: এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকেই
আমরা সরকারের কাছে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা চাই না। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার আইন চাই না। চাই না সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে কেউ অপরাধ করার সুযোগ পাক।
আমরা চাই একটি ন্যায়সংগত, শক্তিশালী ও কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন, যা দেশের প্রতিটি পেশাদার সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান—সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের দাবি আর দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে রাখবেন না। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করুন, সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে জাতীয় সংলাপ আয়োজন করুন, খসড়া আইন প্রকাশ করুন এবং সংসদীয় ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিন।
আইনটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে দ্রুত তদন্ত হবে, কোনো সাংবাদিক হুমকি পেলে নিরাপত্তা দেওয়া হবে, কোনো অপরাধী প্রভাবশালী পরিচয়ে পার পাবে না—এমন নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
একটি রাষ্ট্রে সাংবাদিক নিরাপদ না হলে সাধারণ মানুষের কণ্ঠও নিরাপদ থাকে না। সংবাদমাধ্যম স্বাধীন না হলে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
আজ সময় এসেছে সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের। সাংবাদিকরা বিশেষ সুবিধা চান না, ক্ষমতা চান না, আইনের ঊর্ধ্বে থাকার অধিকার চান না। তাঁরা শুধু চান, সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে যেন জীবন দিতে না হয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে যেন পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে না হয়।
আমাদের শেষ কথা—আর কোনো দাবি নেই, সাংবাদিকদের একটাই দাবি: সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই।
সাংবাদিক বাঁচলে সংবাদ বাঁচবে, সংবাদ বাঁচলে জনগণের কণ্ঠ বাঁচবে, আর জনগণের কণ্ঠ বাঁচলেই শক্তিশালী হবে গণতন্ত্র।
সরকারের কাছে সাংবাদিক সমাজের এই সম্মিলিত আহ্বান—সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করুন। এটিকে শুধু একটি প্রতিশ্রুতি নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করুন।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুযোগ নয়—এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য শর্ত।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৮:৪৫:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
৮ বার পড়া হয়েছে

সাংবাদিকের কলম থামানো যাবে না, নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন—অবিলম্বে চাই সাংবাদিক সুরক্ষা আইন

আপডেট সময় ০৮:৪৫:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় সম্পাদকীয় দাবি ও সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত আহ্বান
আর কোনো দাবি নয়, সাংবাদিকদের একটাই দাবি—‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই’
সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দেওয়া মানে জনগণের কণ্ঠরোধ করা; হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানি থেকে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় চাই পৃথক, কঠোর ও কার্যকর আইন
সরকার কি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করবে? সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশা—কথা নয়, এবার আইনের বাস্তবায়ন চাই।
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একজন সাংবাদিক যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেন, তখন তিনি শুধু একটি সংবাদ প্রকাশ করেন না; তিনি সমাজের অসংগতি, রাষ্ট্রের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের অধিকারহরণের বিরুদ্ধে কথা বলেন। একজন সাংবাদিক যখন কোনো অসহায় মানুষের কান্না তুলে ধরেন, তখন তাঁর কলমে উঠে আসে সেই মানুষের ন্যায়বিচারের আকুতি। যখন কোনো অপরাধী চক্র, ভূমিদস্যু, মাদক কারবারি, দুর্নীতিবাজ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তখন সেই সংবাদ সমাজকে সতর্ক করে, প্রশাসনকে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যাঁরা সবার নিরাপত্তা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের কথা বলেন, তাঁদের নিজেদের নিরাপত্তা কোথায়?
যে সাংবাদিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেন, তাঁকেই যদি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়, যে সাংবাদিক দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধান করেন, তাঁকেই যদি মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো হয়, যে সংবাদকর্মী মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেন, তাঁকেই যদি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়—তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কোথায়?
আজ সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে একটি স্পষ্ট, যৌক্তিক এবং জাতীয় পর্যায়ের দাবি উত্থাপন করা প্রয়োজন।
আর কোনো দাবি নেই, সাংবাদিকদের একটাই দাবি—সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই।
এটি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সংগঠনের একক দাবি নয়। এটি দেশের পেশাদার সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক, টেলিভিশন সংবাদকর্মী, ফটোসাংবাদিক, ভিডিও সাংবাদিক, অনলাইন সংবাদকর্মী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংবাদকর্মীসহ সমগ্র গণমাধ্যম অঙ্গনের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড, প্রশাসনের দায়িত্ব পালন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনদুর্ভোগ, দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর জনগণের সামনে তুলে ধরেন সাংবাদিকরা।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
কোথাও সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিককে বাধার মুখে পড়তে হয়। কোথাও ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কোথাও সংবাদ প্রকাশের কারণে হুমকি আসে। কোথাও রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপে সাংবাদিককে সংবাদ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়। আবার কোথাও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, চাকরিচ্যুতি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
বিশেষ করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকদের পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাঁরা অনেক সময় সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই কাজ করেন। তাঁদের কাছে নেই পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা, নেই সব ক্ষেত্রে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
একজন সংবাদকর্মী যখন স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেন, তখন তাঁকে পরবর্তী সময়ে একই এলাকায় বসবাস ও কাজ করতে হয়। তাঁর পরিবারও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।
এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য সতর্কবার্তা
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ শুধু আবেগের বিষয় নয়; বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদনেও এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশে সাংবাদিকদের ওপর ২৮৮টি হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫১৮ জন সাংবাদিক আক্রান্ত বা হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ২৯৭ জন আহত হয়েছেন।
এ ধরনের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বিচ্ছিন্ন আলোচনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধ, দ্রুত তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর সম্পাদক পরিষদ সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, হয়রানি ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
অর্থাৎ সাংবাদিকদের নিরাপত্তার দাবি কোনো একক কণ্ঠের দাবি নয়; এটি গণমাধ্যমের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ: এবার বাস্তবায়নের সময়
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবির পেছনে ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ২২ মার্চ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে। সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের সময় হুমকি, হয়রানি, হামলা ও পেশাগত বাধা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পায়।
২০২৫ সালের ৪ মে তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের খসড়া পর্যালোচনা এবং আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট সাংবাদিক নেতারাও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষায় পৃথক আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
অতএব প্রশ্নটি এখন আর সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আইন বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ কবে নেওয়া হবে?
কমিশনের সুপারিশ, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দাবি এবং মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীদের অভিজ্ঞতা একত্র করে সরকার চাইলে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইনে যে বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে
সাংবাদিক সমাজের প্রস্তাবিত দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
১. দায়িত্ব পালনের সময় হামলায় কঠোর শাস্তি
সংবাদ সংগ্রহ, ছবি ধারণ, ভিডিও ধারণ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ কিংবা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকের ওপর পরিকল্পিত হামলা, মারধর, অপহরণ, হত্যার হুমকি কিংবা পেশাগত কাজে বাধা সৃষ্টি করলে দ্রুত মামলা গ্রহণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান থাকতে হবে।
২. সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক মামলা ও হয়রানি বন্ধ
কোনো সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিককে ভয় দেখানো, মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর চেষ্টা, অযৌক্তিক আইনি হয়রানি কিংবা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি সুরক্ষা থাকতে হবে। তবে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধের অভিযোগ থাকলে যথাযথ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. হুমকির ঘটনায় তাৎক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা
কোনো সাংবাদিক দায়িত্ব পালনের কারণে বিশ্বাসযোগ্য প্রাণনাশের হুমকি পেলে সংশ্লিষ্ট থানাকে দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার
সাংবাদিক হত্যা, গুরুতর নির্যাতন ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় বিশেষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা আর্থিক প্রভাব বিবেচনা না করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
৫. সাংবাদিকের পরিবারকে নিরাপত্তা ও সহায়তা
সাংবাদিকের ওপর হামলা বা হত্যার হুমকির কারণে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঝুঁকিতে পড়লে তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিক নিহত বা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারালে তাঁর পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৬. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা
জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকতে হবে। সাংবাদিকের নোট, রেকর্ডিং, ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল তথ্য জব্দ কিংবা তল্লাশির ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়া ও বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
৭. নারী সাংবাদিকদের বিশেষ সুরক্ষা
নারী সাংবাদিকরা মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ ও অনলাইন সাংবাদিকতায় নানা ধরনের হয়রানি, হুমকি, অশালীন মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখোমুখি হন। তাঁদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিকারের জন্য পৃথক কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৮. জেলা ও উপজেলা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা
শুধু রাজধানী বা বড় শহরের সাংবাদিকদের নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা সংবাদকর্মীদেরও সমান আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। তাঁদের পরিচয়পত্র, দায়িত্ব পালনের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং হুমকির ঘটনায় প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৯. স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত অধিকার ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশনে সাংবাদিক প্রতিনিধি, সম্পাদক, আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
১০. ন্যায্য বেতন, নিয়োগপত্র ও চাকরির নিরাপত্তা
সাংবাদিকের নিরাপত্তা শুধু হামলা থেকে বেঁচে থাকার বিষয় নয়। একজন সংবাদকর্মীর ন্যায্য বেতন, নিয়োগপত্র, নিয়মিত বেতন পরিশোধ, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ছুটি, চিকিৎসা, জীবনবিমা, ঝুঁকি ভাতা ও অবসরকালীন সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রিন্ট, টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন—সব মাধ্যমের সাংবাদিকদের অধিকার সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন মানে সাংবাদিকদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখা নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সাংবাদিক সুরক্ষা আইন কোনো সাংবাদিককে অপরাধ করার ছাড়পত্র দেবে না। সাংবাদিক পরিচয়ে কেউ চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, মিথ্যা তথ্য প্রচার কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত হলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
কিন্তু একজন সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদে কেউ ক্ষুব্ধ হলেই তাঁকে মারধর, হুমকি, হয়রানি কিংবা প্রতিশোধের শিকার করার অধিকার কারও নেই।
সংবাদে ভুল থাকলে প্রতিবাদ, সংশোধন, জবাব প্রকাশ কিংবা আইনসম্মত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিককে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার কোনো বৈধতা নেই।
তাই সাংবাদিক সুরক্ষা আইনে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। আইনটি হতে হবে সাংবাদিকের অধিকার রক্ষার ঢাল, কোনো ব্যক্তির অন্যায় আড়াল করার হাতিয়ার নয়।
সরকারের কাছে সাংবাদিক সমাজের জাতীয় পর্যায়ের ১০ দফা দাবি
১. অবিলম্বে সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করতে হবে।
২. সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীদের মতামত নিয়ে আইনটি চূড়ান্ত করতে হবে।
৩. দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন, অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
৪. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক মামলা, ভয়ভীতি ও পেশাগত হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।
৫. হুমকির মুখে থাকা সাংবাদিকদের দ্রুত পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচারহীনতা বন্ধে বিশেষ তদন্ত ও দ্রুত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
৭. জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকদের জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, নিয়োগপত্র, চিকিৎসা, বিমা ও চাকরির অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
৯. স্বাধীন সাংবাদিক সুরক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে।
১০. আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করতে হবে।
সরকার ও সাংবাদিক—সম্পর্কের ভিত্তি হোক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জবাবদিহি
সরকার ও সাংবাদিক সমাজের সম্পর্ক হওয়া উচিত দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। সাংবাদিকের কাজ সরকারের প্রশংসা করা নয়, আবার সরকারের প্রতিটি উদ্যোগের বিরোধিতা করাও নয়। সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সত্য অনুসন্ধান করা, তথ্য যাচাই করা এবং জনগণের সামনে বাস্তব চিত্র তুলে ধরা।
সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করা যেমন সাংবাদিকতার অংশ, তেমনি ভুলত্রুটি ও অনিয়ম তুলে ধরাও সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
কোনো সরকার যদি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং সংবাদ প্রকাশের কারণে প্রতিশোধমূলক হয়রানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সেই সরকারের প্রতি গণমাধ্যমের আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। তবে সাংবাদিকদের সমর্থন কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়; তা হবে ন্যায়সংগত নীতি, জনগণের স্বার্থ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে।
সাংবাদিকরা সরকারের প্রতিপক্ষ নন। তাঁরা রাষ্ট্রেরও প্রতিপক্ষ নন। তাঁরা জনগণের তথ্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। তাঁদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকলেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো আরও জবাবদিহিমূলক হওয়ার সুযোগ পায়।
একটি সাংবাদিকের কলম থেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ
একজন সাংবাদিক যখন নিরাপত্তাহীনতার কারণে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করতে ভয় পান, তখন শুধু একজন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই এলাকার সাধারণ মানুষও।
যখন কোনো সংবাদকর্মী হুমকির কারণে মাদক ব্যবসা, অবৈধ দখল, নারী নির্যাতন, মানবপাচার কিংবা প্রশাসনিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন, তখন অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।
তাই সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিরোধকে শক্তিশালী করা।
সাংবাদিককে নিরাপদ রাখুন, সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন রাখুন, জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করুন।
জাতীয় সম্পাদকীয় আহ্বান: এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকেই
আমরা সরকারের কাছে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা চাই না। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার আইন চাই না। চাই না সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে কেউ অপরাধ করার সুযোগ পাক।
আমরা চাই একটি ন্যায়সংগত, শক্তিশালী ও কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন, যা দেশের প্রতিটি পেশাদার সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান—সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের দাবি আর দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে রাখবেন না। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করুন, সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে জাতীয় সংলাপ আয়োজন করুন, খসড়া আইন প্রকাশ করুন এবং সংসদীয় ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিন।
আইনটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে দ্রুত তদন্ত হবে, কোনো সাংবাদিক হুমকি পেলে নিরাপত্তা দেওয়া হবে, কোনো অপরাধী প্রভাবশালী পরিচয়ে পার পাবে না—এমন নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
একটি রাষ্ট্রে সাংবাদিক নিরাপদ না হলে সাধারণ মানুষের কণ্ঠও নিরাপদ থাকে না। সংবাদমাধ্যম স্বাধীন না হলে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
আজ সময় এসেছে সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের। সাংবাদিকরা বিশেষ সুবিধা চান না, ক্ষমতা চান না, আইনের ঊর্ধ্বে থাকার অধিকার চান না। তাঁরা শুধু চান, সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে যেন জীবন দিতে না হয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে যেন পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে না হয়।
আমাদের শেষ কথা—আর কোনো দাবি নেই, সাংবাদিকদের একটাই দাবি: সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই।
সাংবাদিক বাঁচলে সংবাদ বাঁচবে, সংবাদ বাঁচলে জনগণের কণ্ঠ বাঁচবে, আর জনগণের কণ্ঠ বাঁচলেই শক্তিশালী হবে গণতন্ত্র।
সরকারের কাছে সাংবাদিক সমাজের এই সম্মিলিত আহ্বান—সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করুন। এটিকে শুধু একটি প্রতিশ্রুতি নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করুন।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুযোগ নয়—এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য শর্ত।