ঢাকা ১১:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্ধ্যার পর স্কুল -কলেজ পড়ুয়াদের রাস্তায় পেলে গ্রেফতার করা হবে – চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি

নিজস্ব সংবাদ :

সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীদের অবাধ বিচরণ বন্ধে দেশব্যাপী নিয়ম চালুর দাবি
রাত ৮টার পর শিক্ষার্থী কোথায়, কার সঙ্গে—জবাবদিহির আওতায় আসুক অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; কিশোর গ্যাং, মাদক ও অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান নিশ্চিত করলেই চলবে না, প্রয়োজন পারিবারিক শাসন, সামাজিক সচেতনতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের একটি অংশের অযথা রাস্তাঘাট, বাজার, অলিগলি ও বিভিন্ন আড্ডাস্থলে সময় কাটানোর প্রবণতা নিয়ে অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রবণতা থেকে অনেক সময় কিশোরদের মধ্যে সংঘাত, মারামারি, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং এবং নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী কক্সবাজারে এক সুধী সমাবেশে সন্ধ্যার পর স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাস্তায় পাওয়া গেলে আটক ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে মন্তব্য করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে কিশোর গ্যাং নির্মূল, পারিবারিক শাসন এবং অভিভাবক-শিক্ষকদের দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও রাতের বেলা অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা ও ইউনিয়নে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা
সন্ধ্যার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ নীতিমালা শুধু কোনো একটি জেলা বা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা অপ্রয়োজনে দলবদ্ধভাবে রাস্তাঘাট, বাজার, চায়ের দোকান কিংবা বিভিন্ন আড্ডাস্থলে অবস্থান করছে কি না, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারি করতে পারে। বিশেষ করে দুই-তিনজন বা তার বেশি শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে আড্ডা দিলে তাদের পরিচয় ও বাসার ঠিকানা জেনে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
তবে কোচিং, প্রাইভেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, জরুরি প্রয়োজন, পারিবারিক কাজ কিংবা অন্য কোনো বৈধ কারণে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা যাবে না। শিক্ষার্থীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে প্রথমে তার নিরাপত্তা, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি যাচাই করতে হবে।
রাতের আড্ডা থেকে সংঘাত, অপরাধ ও বিপথগামিতার ঝুঁকি
বাস্তবতা হলো, সন্ধ্যার পর অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে পড়াশোনা না করে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে সময় কাটায়। কেউ কেউ রাত ৯টা, ১০টা এমনকি আরও পরে বাড়ি ফেরে। দীর্ঘ সময় ধরে উদ্দেশ্যহীন আড্ডা, অসৎ সঙ্গ, অনলাইন ও অফলাইন অপরাধী চক্রের সংস্পর্শ এবং মাদকের প্রলোভন কিশোরদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
কিশোর বয়সে আবেগ, কৌতূহল ও বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশি কাজ করে। এ বয়সে ভুল সঙ্গ বা অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সামান্য কথাকাটাকাটি থেকে মারামারি, দলগত বিরোধ কিংবা বড় ধরনের সংঘাতের ঘটনাও ঘটতে পারে।
তবে রাতের বেলা বাইরে থাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থীই অপরাধপ্রবণ—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। বরং অপরাধের ঝুঁকি, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা এবং তার পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
অভিভাবকদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কখন বাড়ি ফিরছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজ রাখা জরুরি। শুধু সন্তানকে স্কুলে পাঠানো কিংবা মাসিক বেতন ও পড়াশোনার খরচ বহন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তানের নৈতিক শিক্ষা, আচরণ, বন্ধুমহল ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিও নজর দিতে হবে।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সন্তান বাইরে থাকলে তার অবস্থান সম্পর্কে অভিভাবকের জানা থাকা উচিত। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে অভিভাবককে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের সমস্যা ও ভুলের কথা মা-বাবাকে জানাতে পারে।
পুলিশের ভূমিকা হবে প্রতিরোধমূলক, হয়রানিমূলক নয়
প্রতিটি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কিশোর সুরক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
রাতের বেলা অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো শিক্ষার্থীকে অযথা ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলে প্রথমে তার পরিচয় নিশ্চিত করে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, প্রয়োজন হলে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবহিত করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে মাদক বিক্রি, কিশোর গ্যাং পরিচালনা, অস্ত্র বহন, ছিনতাই, মারামারি কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধী চক্রের প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে আইনগত সুরক্ষা ও শিশু-ন্যায়বিচারের নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। কেবল রাতে বাইরে থাকার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার বা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমাধান হতে পারে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রয়োজন নজরদারি ও নৈতিক শিক্ষা
শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না; তাদের নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। স্কুল-কলেজে নিয়মিত অভিভাবক সভা, কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দেয়, দীর্ঘ সময় বাইরে থাকে কিংবা আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তাদের প্রতি শাস্তিমূলক মনোভাব না নিয়ে শিক্ষকদের সহানুভূতিশীল হতে হবে। প্রয়োজনে অভিভাবক ও কাউন্সেলরের সহযোগিতা নিতে হবে।
সরকারের কাছে প্রস্তাব
কিশোর গ্যাং, মাদক ও অপরাধপ্রবণতা প্রতিরোধে সরকার চাইলে কয়েকটি বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে—
১. প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা ও ইউনিয়নে কিশোর সুরক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠন।
২. রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় দলবদ্ধ আড্ডা নিরুৎসাহিত করতে স্থানীয়ভাবে সচেতনতামূলক নিয়ম চালু।
৩. বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা।
৪. মাদক, অস্ত্র, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ অভিযান।
৫. প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের আচরণ ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ।
৬. কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধি।
৭. শিক্ষার্থীদের হয়রানি, অযৌক্তিক আটক কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
কঠোর শাসন নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণ
শিক্ষার্থীদের রাতের বেলা অযথা বাইরে ঘোরাফেরা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নয়; বরং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধের ঝুঁকি কমানো এবং পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করা। শৃঙ্খলা প্রয়োজন, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা হতে হবে মানবিক, আইনসম্মত ও শিক্ষার্থীবান্ধব।
আজকের শিক্ষার্থী আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তাদের হাতে বই-খাতা থাকার কথা, অপরাধী চক্রের হাতে নয়। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সরকারের প্রতি সচেতন মহলের প্রত্যাশা, সন্ধ্যার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অবাধ চলাচল নিয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হোক। একই সঙ্গে প্রতিটি এলাকায় অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর সামাজিক নজরদারি গড়ে তোলা হোক।
শিক্ষার্থীরা নিয়মের মধ্যে থাকবে, অভিভাবকরা দায়িত্ব পালন করবেন, আর প্রশাসন নিশ্চিত করবে নিরাপত্তা—এমন সমন্বিত উদ্যোগই পারে আগামী প্রজন্মকে অপরাধের ঝুঁকি থেকে দূরে রেখে শিক্ষার আলোয় এগিয়ে নিতে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১১:৪৯:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
২ বার পড়া হয়েছে

সন্ধ্যার পর স্কুল -কলেজ পড়ুয়াদের রাস্তায় পেলে গ্রেফতার করা হবে – চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি

আপডেট সময় ১১:৪৯:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীদের অবাধ বিচরণ বন্ধে দেশব্যাপী নিয়ম চালুর দাবি
রাত ৮টার পর শিক্ষার্থী কোথায়, কার সঙ্গে—জবাবদিহির আওতায় আসুক অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; কিশোর গ্যাং, মাদক ও অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান নিশ্চিত করলেই চলবে না, প্রয়োজন পারিবারিক শাসন, সামাজিক সচেতনতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের একটি অংশের অযথা রাস্তাঘাট, বাজার, অলিগলি ও বিভিন্ন আড্ডাস্থলে সময় কাটানোর প্রবণতা নিয়ে অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রবণতা থেকে অনেক সময় কিশোরদের মধ্যে সংঘাত, মারামারি, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং এবং নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী কক্সবাজারে এক সুধী সমাবেশে সন্ধ্যার পর স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাস্তায় পাওয়া গেলে আটক ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে মন্তব্য করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে কিশোর গ্যাং নির্মূল, পারিবারিক শাসন এবং অভিভাবক-শিক্ষকদের দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও রাতের বেলা অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা ও ইউনিয়নে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা
সন্ধ্যার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ নীতিমালা শুধু কোনো একটি জেলা বা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা অপ্রয়োজনে দলবদ্ধভাবে রাস্তাঘাট, বাজার, চায়ের দোকান কিংবা বিভিন্ন আড্ডাস্থলে অবস্থান করছে কি না, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারি করতে পারে। বিশেষ করে দুই-তিনজন বা তার বেশি শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে আড্ডা দিলে তাদের পরিচয় ও বাসার ঠিকানা জেনে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
তবে কোচিং, প্রাইভেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, জরুরি প্রয়োজন, পারিবারিক কাজ কিংবা অন্য কোনো বৈধ কারণে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা যাবে না। শিক্ষার্থীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে প্রথমে তার নিরাপত্তা, প্রয়োজন ও পরিস্থিতি যাচাই করতে হবে।
রাতের আড্ডা থেকে সংঘাত, অপরাধ ও বিপথগামিতার ঝুঁকি
বাস্তবতা হলো, সন্ধ্যার পর অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে পড়াশোনা না করে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে সময় কাটায়। কেউ কেউ রাত ৯টা, ১০টা এমনকি আরও পরে বাড়ি ফেরে। দীর্ঘ সময় ধরে উদ্দেশ্যহীন আড্ডা, অসৎ সঙ্গ, অনলাইন ও অফলাইন অপরাধী চক্রের সংস্পর্শ এবং মাদকের প্রলোভন কিশোরদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
কিশোর বয়সে আবেগ, কৌতূহল ও বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশি কাজ করে। এ বয়সে ভুল সঙ্গ বা অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সামান্য কথাকাটাকাটি থেকে মারামারি, দলগত বিরোধ কিংবা বড় ধরনের সংঘাতের ঘটনাও ঘটতে পারে।
তবে রাতের বেলা বাইরে থাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থীই অপরাধপ্রবণ—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। বরং অপরাধের ঝুঁকি, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা এবং তার পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
অভিভাবকদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কখন বাড়ি ফিরছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজ রাখা জরুরি। শুধু সন্তানকে স্কুলে পাঠানো কিংবা মাসিক বেতন ও পড়াশোনার খরচ বহন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তানের নৈতিক শিক্ষা, আচরণ, বন্ধুমহল ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিও নজর দিতে হবে।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সন্তান বাইরে থাকলে তার অবস্থান সম্পর্কে অভিভাবকের জানা থাকা উচিত। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে অভিভাবককে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের সমস্যা ও ভুলের কথা মা-বাবাকে জানাতে পারে।
পুলিশের ভূমিকা হবে প্রতিরোধমূলক, হয়রানিমূলক নয়
প্রতিটি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কিশোর সুরক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
রাতের বেলা অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো শিক্ষার্থীকে অযথা ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলে প্রথমে তার পরিচয় নিশ্চিত করে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, প্রয়োজন হলে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবহিত করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে মাদক বিক্রি, কিশোর গ্যাং পরিচালনা, অস্ত্র বহন, ছিনতাই, মারামারি কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধী চক্রের প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে আইনগত সুরক্ষা ও শিশু-ন্যায়বিচারের নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। কেবল রাতে বাইরে থাকার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার বা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমাধান হতে পারে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রয়োজন নজরদারি ও নৈতিক শিক্ষা
শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না; তাদের নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। স্কুল-কলেজে নিয়মিত অভিভাবক সভা, কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দেয়, দীর্ঘ সময় বাইরে থাকে কিংবা আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তাদের প্রতি শাস্তিমূলক মনোভাব না নিয়ে শিক্ষকদের সহানুভূতিশীল হতে হবে। প্রয়োজনে অভিভাবক ও কাউন্সেলরের সহযোগিতা নিতে হবে।
সরকারের কাছে প্রস্তাব
কিশোর গ্যাং, মাদক ও অপরাধপ্রবণতা প্রতিরোধে সরকার চাইলে কয়েকটি বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে—
১. প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা ও ইউনিয়নে কিশোর সুরক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠন।
২. রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় দলবদ্ধ আড্ডা নিরুৎসাহিত করতে স্থানীয়ভাবে সচেতনতামূলক নিয়ম চালু।
৩. বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনে অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা।
৪. মাদক, অস্ত্র, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ অভিযান।
৫. প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের আচরণ ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ।
৬. কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধি।
৭. শিক্ষার্থীদের হয়রানি, অযৌক্তিক আটক কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
কঠোর শাসন নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণ
শিক্ষার্থীদের রাতের বেলা অযথা বাইরে ঘোরাফেরা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নয়; বরং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধের ঝুঁকি কমানো এবং পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করা। শৃঙ্খলা প্রয়োজন, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা হতে হবে মানবিক, আইনসম্মত ও শিক্ষার্থীবান্ধব।
আজকের শিক্ষার্থী আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তাদের হাতে বই-খাতা থাকার কথা, অপরাধী চক্রের হাতে নয়। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সরকারের প্রতি সচেতন মহলের প্রত্যাশা, সন্ধ্যার পর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অবাধ চলাচল নিয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হোক। একই সঙ্গে প্রতিটি এলাকায় অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর সামাজিক নজরদারি গড়ে তোলা হোক।
শিক্ষার্থীরা নিয়মের মধ্যে থাকবে, অভিভাবকরা দায়িত্ব পালন করবেন, আর প্রশাসন নিশ্চিত করবে নিরাপত্তা—এমন সমন্বিত উদ্যোগই পারে আগামী প্রজন্মকে অপরাধের ঝুঁকি থেকে দূরে রেখে শিক্ষার আলোয় এগিয়ে নিতে।