ঢাকা ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চেয়ারম্যানের চেয়ার এক, দাবিদার শ্যালক-দুলাভাই দুজন! একই পাড়া, একই দল, একই পদে লড়াই—‘কাকে সমর্থন দিই, কাকে খুশি রাখি’, বেকায়দায় কানাইনগরবাসী

নিজস্ব সংবাদ :

একই পাড়ায় শ্যালক-দুলাভাইয়ের চেয়ারম্যান যুদ্ধ!
একদিকে আত্মীয়তা, অন্যদিকে রাজনীতির মাঠ—‘কাকে খুশি রাখি, কাকে সমর্থন দিই’, ভেবেই কপালে চিন্তার ভাঁজ কানাইনগরবাসীর
নিজস্ব প্রতিবেদক :
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার জগতপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এবার জমে উঠেছে এক মজার পারিবারিক রাজনৈতিক সমীকরণ। একই পাড়া, একই দল, একই পদে লড়াইয়ের প্রস্তুতি—আর তার ওপর দুই প্রার্থী আপন শ্যালক-দুলাভাই! একজন আরেকজনের বোনজামাই। ফলে রাজনীতির মাঠে শুরু হয়েছে অন্য রকম হিসাব-নিকাশ। আর মাঝখানে পড়ে কানাইনগর গ্রামের বাসিন্দারা যেন পড়েছেন একেবারে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ সমস্যায়!
ভাবুন তো, সকালে বাজারে গিয়ে যদি কেউ দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ‘দুলাভাই, আপনার জন্য দোয়া করি’, বিকেলে শ্যালকের সঙ্গে দেখা হলে কী বলবেন? আবার একজনের গণসংযোগে গেলে অন্যজন যদি জানতে চান, ‘কী ব্যাপার, আমাদের বাড়ির লোক হয়ে ওদিকে কেন?’—তখন ভোটারের উত্তর কী হবে? অবশ্য এসব সম্ভাব্য মজার পরিস্থিতি; বাস্তবে কে কী বলছেন, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে আত্মীয়তার এই রাজনৈতিক সমীকরণ গ্রামজুড়ে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।
একই পাড়ায় দুই প্রার্থী, আত্মীয়তার বন্ধনে দুই শিবির!
তিতাস উপজেলার ২ নম্বর জগতপুর ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের দুই পরিচিত রাজনৈতিক মুখ মো. মুকবুল হোসেন ও আক্তারুল হক মাস্টার। দুজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মুকবুল হোসেন তিতাস উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আক্তারুল হক মাস্টার জগতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি।
রাজনীতিতে দুজনেরই নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু এবার চেয়ারম্যান পদে দলীয় সমর্থন চাওয়ায় তাঁদের সম্পর্কের আরেকটি দিক আলোচনায় এসেছে—একজন অন্যজনের শ্যালক, আবার একজন অন্যজনের বোনজামাই!
দুই বাড়ির দূরত্বও নাকি মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের পথ। অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কাউকে দূরে কোথাও খুঁজতে হচ্ছে না। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যেতে যতক্ষণ লাগে, তার চেয়ে বেশি সময় হয়তো লাগে একটি চায়ের কাপ শেষ করতে!
তবে বিষয়টি নিছক হাসি-ঠাট্টার নয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রেখে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কে কতটা এগিয়ে থাকবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
চার প্রার্থীর লড়াই, আলোচনার কেন্দ্রে দুই আত্মীয়
চেয়ারম্যান পদে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশা করছেন আরও দুই নেতা—তিতাস উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মুন্সি আমিরুল ইসলাম মানিক এবং প্রচার সম্পাদক মো. সামির হোসেন। অর্থাৎ, লড়াইয়ে আলোচিত মুখ চারজন।
আমিরুল ইসলাম মানিক ২০১৬ সালে বিএনপির দলীয় প্রতীক নিয়ে এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ফলে তাঁরও রয়েছে নির্বাচনী অভিজ্ঞতা।
কিন্তু চারজনের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলেও মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে শ্যালক-দুলাভাইয়ের প্রার্থিতার গল্প। কারণ অন্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে দলীয় সমর্থনের হিসাব থাকলেও এই দুই প্রার্থীর ক্ষেত্রে রয়েছে পারিবারিক সম্পর্কের বাড়তি সমীকরণ।
একদিকে দলের সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশা, অন্যদিকে আত্মীয়তার বন্ধন—দুই দিক সামলে কে কতটা এগোতে পারেন, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
গ্রামবাসীর সামনে কঠিন প্রশ্ন: চা খাব কার বাড়িতে?
কানাইনগর গ্রামের সাধারণ ভোটারদের অবস্থাটা অনেকটা এমন—একদিকে গেলে আত্মীয়তার সম্মান, অন্যদিকে গেলে রাজনৈতিক সম্পর্ক! অবশ্য ভোটারদের প্রত্যেকেই যে এমন সমস্যায় পড়েছেন, তা বলার সুযোগ নেই। তবে স্থানীয়দের বক্তব্যে বোঝা যায়, দুই প্রার্থীর সম্পর্কের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভোটার জানিয়েছেন, দুজনই তাঁদের পরিচিত এবং গ্রামের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তাই আগেভাগে কাউকে সমর্থন না দিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে চান তাঁরা।
এখানেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক কৌতুকের পরিস্থিতি। ধরুন, কোনো ভোটার একদিন শ্যালকের গণসংযোগে গেলেন, পরদিন দুলাভাইয়ের সভায়ও উপস্থিত হলেন। তখন তাঁকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, ‘আপনি আসলে কার লোক?’—তিনি হয়তো বলতে পারেন, ‘আমি গ্রামের লোক, আগে দলীয় সিদ্ধান্তটা আসুক!’
এটি অবশ্য কল্পিত সংলাপ, কোনো ভোটারের প্রকৃত বক্তব্য নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতি যে স্থানীয় রাজনীতিতে হাস্যরসের উপাদান তৈরি করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
‘দল যাকে সমর্থন দেবে, তার পক্ষেই থাকব’
এ বিষয়ে আক্তারুল হক মাস্টার বলেছেন, শ্যালক-বোনজামাই হলেও গ্রাম বা পাড়ায় তাঁদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। দল যাঁকে সমর্থন দেবে, সবাই দলের নির্দেশনা মেনে তাঁর পক্ষেই কাজ করবেন।
অন্যদিকে মুকবুল হোসেনও তাঁদের পারিবারিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, তাঁরা এখন দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দল যাঁকে সমর্থন দেবে, গ্রামবাসীও তাঁর পক্ষেই কাজ করবেন।
দুই প্রার্থীর বক্তব্যে আপাতত সংঘাতের চেয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্যের কথাই বেশি উঠে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত বিএনপির সমর্থন কার ভাগ্যে জোটে এবং অন্য প্রার্থীরা কী অবস্থান নেন।
দলীয় সিদ্ধান্তই কি মেটাবে আত্মীয়তার অঙ্ক?
রাজনীতিতে আত্মীয়তা কখনো সহযোগিতার সেতু তৈরি করে, আবার কখনো একই পদে একাধিক আত্মীয় প্রার্থী হলে তৈরি হয় প্রতিযোগিতা। কানাইনগরের ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি মজার উদাহরণ।
এখানে কেউ কাউকে প্রকাশ্যে শত্রু বলছেন না; বরং দুজনেই দলীয় সমর্থনের অপেক্ষায়। কিন্তু তাঁদের একই পাড়ায় বসবাস, পারিবারিক বন্ধন এবং একই পদে প্রার্থী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ঘটনাটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
এখন প্রশ্ন—দলীয় সমর্থন একজন পেলেই কি সব হিসাব সহজ হয়ে যাবে? নাকি তখন শুরু হবে নতুন সমীকরণ—কে কার পক্ষে মাঠে নামবেন, কার কর্মীরা কাকে সমর্থন করবেন, আর পারিবারিক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক আলোচনা কতটা জায়গা পাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, দলীয় সমর্থন ঘোষণার আগে কানাইনগরবাসীর সামনে সবচেয়ে বড় কৌশল হতে পারে—সম্পর্ক ঠিক রাখা, কাউকে অযথা মনঃক্ষুণ্ন না করা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা।
শেষ কথা: ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আত্মীয়তায় থাকুক সৌহার্দ্য
শ্যালক-দুলাভাইয়ের এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা হতে পারে, চায়ের দোকানে জমতে পারে আলোচনা, তৈরি হতে পারে নানা মজার গল্প। কিন্তু নির্বাচনের আসল সৌন্দর্য হওয়া উচিত প্রতিযোগিতা, সৌহার্দ্য ও ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্তে।
একই পাড়ার দুই আত্মীয় যদি শেষ পর্যন্ত পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রেখে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, সেটিই হবে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কারণ চেয়ারম্যানের চেয়ার একটি, প্রার্থী একাধিক হতে পারেন; কিন্তু আত্মীয়তার সম্পর্ক ও সামাজিক সম্প্রীতি যেন নির্বাচনী প্রতিযোগিতার কারণে নষ্ট না হয়।
কানাইনগরবাসী তাই হয়তো মনে মনে বলছেন—‘চেয়ারম্যান যিনিই হোন, পাড়ার শান্তিটা যেন অটুট থাকে! আর শ্যালক-দুলাভাইয়ের সম্পর্কটা যেন ভোটের বাক্সে গিয়ে আটকে না যায়।’
এখন সবার অপেক্ষা বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তের। তারপরই বোঝা যাবে, কানাইনগরের রাজনৈতিক মঞ্চে শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থী এগিয়ে যান—আর শ্যালক-দুলাভাইয়ের এই মজার সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১১:০৯:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
৬ বার পড়া হয়েছে

চেয়ারম্যানের চেয়ার এক, দাবিদার শ্যালক-দুলাভাই দুজন! একই পাড়া, একই দল, একই পদে লড়াই—‘কাকে সমর্থন দিই, কাকে খুশি রাখি’, বেকায়দায় কানাইনগরবাসী

আপডেট সময় ১১:০৯:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

একই পাড়ায় শ্যালক-দুলাভাইয়ের চেয়ারম্যান যুদ্ধ!
একদিকে আত্মীয়তা, অন্যদিকে রাজনীতির মাঠ—‘কাকে খুশি রাখি, কাকে সমর্থন দিই’, ভেবেই কপালে চিন্তার ভাঁজ কানাইনগরবাসীর
নিজস্ব প্রতিবেদক :
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার জগতপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এবার জমে উঠেছে এক মজার পারিবারিক রাজনৈতিক সমীকরণ। একই পাড়া, একই দল, একই পদে লড়াইয়ের প্রস্তুতি—আর তার ওপর দুই প্রার্থী আপন শ্যালক-দুলাভাই! একজন আরেকজনের বোনজামাই। ফলে রাজনীতির মাঠে শুরু হয়েছে অন্য রকম হিসাব-নিকাশ। আর মাঝখানে পড়ে কানাইনগর গ্রামের বাসিন্দারা যেন পড়েছেন একেবারে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ সমস্যায়!
ভাবুন তো, সকালে বাজারে গিয়ে যদি কেউ দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ‘দুলাভাই, আপনার জন্য দোয়া করি’, বিকেলে শ্যালকের সঙ্গে দেখা হলে কী বলবেন? আবার একজনের গণসংযোগে গেলে অন্যজন যদি জানতে চান, ‘কী ব্যাপার, আমাদের বাড়ির লোক হয়ে ওদিকে কেন?’—তখন ভোটারের উত্তর কী হবে? অবশ্য এসব সম্ভাব্য মজার পরিস্থিতি; বাস্তবে কে কী বলছেন, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে আত্মীয়তার এই রাজনৈতিক সমীকরণ গ্রামজুড়ে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।
একই পাড়ায় দুই প্রার্থী, আত্মীয়তার বন্ধনে দুই শিবির!
তিতাস উপজেলার ২ নম্বর জগতপুর ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের দুই পরিচিত রাজনৈতিক মুখ মো. মুকবুল হোসেন ও আক্তারুল হক মাস্টার। দুজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মুকবুল হোসেন তিতাস উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আক্তারুল হক মাস্টার জগতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি।
রাজনীতিতে দুজনেরই নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু এবার চেয়ারম্যান পদে দলীয় সমর্থন চাওয়ায় তাঁদের সম্পর্কের আরেকটি দিক আলোচনায় এসেছে—একজন অন্যজনের শ্যালক, আবার একজন অন্যজনের বোনজামাই!
দুই বাড়ির দূরত্বও নাকি মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের পথ। অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কাউকে দূরে কোথাও খুঁজতে হচ্ছে না। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যেতে যতক্ষণ লাগে, তার চেয়ে বেশি সময় হয়তো লাগে একটি চায়ের কাপ শেষ করতে!
তবে বিষয়টি নিছক হাসি-ঠাট্টার নয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রেখে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কে কতটা এগিয়ে থাকবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
চার প্রার্থীর লড়াই, আলোচনার কেন্দ্রে দুই আত্মীয়
চেয়ারম্যান পদে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশা করছেন আরও দুই নেতা—তিতাস উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মুন্সি আমিরুল ইসলাম মানিক এবং প্রচার সম্পাদক মো. সামির হোসেন। অর্থাৎ, লড়াইয়ে আলোচিত মুখ চারজন।
আমিরুল ইসলাম মানিক ২০১৬ সালে বিএনপির দলীয় প্রতীক নিয়ে এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ফলে তাঁরও রয়েছে নির্বাচনী অভিজ্ঞতা।
কিন্তু চারজনের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলেও মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে শ্যালক-দুলাভাইয়ের প্রার্থিতার গল্প। কারণ অন্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে দলীয় সমর্থনের হিসাব থাকলেও এই দুই প্রার্থীর ক্ষেত্রে রয়েছে পারিবারিক সম্পর্কের বাড়তি সমীকরণ।
একদিকে দলের সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশা, অন্যদিকে আত্মীয়তার বন্ধন—দুই দিক সামলে কে কতটা এগোতে পারেন, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
গ্রামবাসীর সামনে কঠিন প্রশ্ন: চা খাব কার বাড়িতে?
কানাইনগর গ্রামের সাধারণ ভোটারদের অবস্থাটা অনেকটা এমন—একদিকে গেলে আত্মীয়তার সম্মান, অন্যদিকে গেলে রাজনৈতিক সম্পর্ক! অবশ্য ভোটারদের প্রত্যেকেই যে এমন সমস্যায় পড়েছেন, তা বলার সুযোগ নেই। তবে স্থানীয়দের বক্তব্যে বোঝা যায়, দুই প্রার্থীর সম্পর্কের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভোটার জানিয়েছেন, দুজনই তাঁদের পরিচিত এবং গ্রামের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তাই আগেভাগে কাউকে সমর্থন না দিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে চান তাঁরা।
এখানেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক কৌতুকের পরিস্থিতি। ধরুন, কোনো ভোটার একদিন শ্যালকের গণসংযোগে গেলেন, পরদিন দুলাভাইয়ের সভায়ও উপস্থিত হলেন। তখন তাঁকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, ‘আপনি আসলে কার লোক?’—তিনি হয়তো বলতে পারেন, ‘আমি গ্রামের লোক, আগে দলীয় সিদ্ধান্তটা আসুক!’
এটি অবশ্য কল্পিত সংলাপ, কোনো ভোটারের প্রকৃত বক্তব্য নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতি যে স্থানীয় রাজনীতিতে হাস্যরসের উপাদান তৈরি করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
‘দল যাকে সমর্থন দেবে, তার পক্ষেই থাকব’
এ বিষয়ে আক্তারুল হক মাস্টার বলেছেন, শ্যালক-বোনজামাই হলেও গ্রাম বা পাড়ায় তাঁদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। দল যাঁকে সমর্থন দেবে, সবাই দলের নির্দেশনা মেনে তাঁর পক্ষেই কাজ করবেন।
অন্যদিকে মুকবুল হোসেনও তাঁদের পারিবারিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, তাঁরা এখন দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দল যাঁকে সমর্থন দেবে, গ্রামবাসীও তাঁর পক্ষেই কাজ করবেন।
দুই প্রার্থীর বক্তব্যে আপাতত সংঘাতের চেয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্যের কথাই বেশি উঠে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত বিএনপির সমর্থন কার ভাগ্যে জোটে এবং অন্য প্রার্থীরা কী অবস্থান নেন।
দলীয় সিদ্ধান্তই কি মেটাবে আত্মীয়তার অঙ্ক?
রাজনীতিতে আত্মীয়তা কখনো সহযোগিতার সেতু তৈরি করে, আবার কখনো একই পদে একাধিক আত্মীয় প্রার্থী হলে তৈরি হয় প্রতিযোগিতা। কানাইনগরের ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি মজার উদাহরণ।
এখানে কেউ কাউকে প্রকাশ্যে শত্রু বলছেন না; বরং দুজনেই দলীয় সমর্থনের অপেক্ষায়। কিন্তু তাঁদের একই পাড়ায় বসবাস, পারিবারিক বন্ধন এবং একই পদে প্রার্থী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ঘটনাটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
এখন প্রশ্ন—দলীয় সমর্থন একজন পেলেই কি সব হিসাব সহজ হয়ে যাবে? নাকি তখন শুরু হবে নতুন সমীকরণ—কে কার পক্ষে মাঠে নামবেন, কার কর্মীরা কাকে সমর্থন করবেন, আর পারিবারিক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক আলোচনা কতটা জায়গা পাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, দলীয় সমর্থন ঘোষণার আগে কানাইনগরবাসীর সামনে সবচেয়ে বড় কৌশল হতে পারে—সম্পর্ক ঠিক রাখা, কাউকে অযথা মনঃক্ষুণ্ন না করা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা।
শেষ কথা: ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আত্মীয়তায় থাকুক সৌহার্দ্য
শ্যালক-দুলাভাইয়ের এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা হতে পারে, চায়ের দোকানে জমতে পারে আলোচনা, তৈরি হতে পারে নানা মজার গল্প। কিন্তু নির্বাচনের আসল সৌন্দর্য হওয়া উচিত প্রতিযোগিতা, সৌহার্দ্য ও ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্তে।
একই পাড়ার দুই আত্মীয় যদি শেষ পর্যন্ত পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রেখে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, সেটিই হবে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কারণ চেয়ারম্যানের চেয়ার একটি, প্রার্থী একাধিক হতে পারেন; কিন্তু আত্মীয়তার সম্পর্ক ও সামাজিক সম্প্রীতি যেন নির্বাচনী প্রতিযোগিতার কারণে নষ্ট না হয়।
কানাইনগরবাসী তাই হয়তো মনে মনে বলছেন—‘চেয়ারম্যান যিনিই হোন, পাড়ার শান্তিটা যেন অটুট থাকে! আর শ্যালক-দুলাভাইয়ের সম্পর্কটা যেন ভোটের বাক্সে গিয়ে আটকে না যায়।’
এখন সবার অপেক্ষা বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তের। তারপরই বোঝা যাবে, কানাইনগরের রাজনৈতিক মঞ্চে শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থী এগিয়ে যান—আর শ্যালক-দুলাভাইয়ের এই মজার সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।