হাসপাতাল থেকে ফের কারাগারে ইমরান খান
হাসপাতাল থেকে আবারও কারাগারে ইমরান খান: চিকিৎসা, আদালতের নির্দেশ ও পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে হাসপাতাল থেকে আবারও কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার ভোরে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসা পরীক্ষা শেষে তাকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে নেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আবার কারাগারে ফেরানো হয়।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই হাসপাতালে
ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল তার পরিবার, আইনজীবী ও দলীয় নেতারা। বিশেষ করে তার দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে তার আইনজীবীরা দাবি করে আসছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ১৮ আগস্ট ইমরান খানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়। আদালত একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠনের কথাও বলে, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
আদালতের নির্দেশের পর হাসপাতাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুলিশ ও রেঞ্জার্সের বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। এরপর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ইমরান খানকে আদিয়ালা কারাগার থেকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয়।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের কারাগারে
হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা পরীক্ষার পর ইমরান খানকে শারীরিকভাবে ‘ফিট’ ঘোষণা করা হয় এবং তাকে পুনরায় আদিয়ালা কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে এই দ্রুত হাসপাতাল-জেল যাতায়াত নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। ইমরান খানের দল দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণের দাবি করে আসছিল। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং চিকিৎসকরা তাকে কারাগারে ফেরানোর উপযোগী মনে করেছেন।
চোখের সমস্যা নিয়ে ভিন্ন দাবি
ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে। তার আইনজীবী ও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার সময়ে তার দৃষ্টিশক্তির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে করা কিছু গুরুতর দাবির সঙ্গে একমত নয়। সরকারি চিকিৎসা মূল্যায়নে তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং তাকে চিকিৎসাগতভাবে কারাগারে থাকার উপযোগী বলা হয়েছে। ফলে ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে এখন দুটি পরস্পরবিরোধী বয়ান সামনে রয়েছে।
সরকারের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের টানাপোড়েন
ইমরান খানকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার আদালতের নির্দেশটি পাকিস্তানের সরকারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার ওই নির্দেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার অফিস নথিপত্র-সংক্রান্ত আপত্তি তুলে আবেদনটি ফেরত দেয়। সরকার প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পুনরায় আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এখানেই ইমরান খানের চিকিৎসার বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্যগত ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থা, কারা প্রশাসন এবং সরকারের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
তিন বছর ধরে কারাগারে ইমরান
ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও দণ্ড রয়েছে। এসব মামলার বেশ কয়েকটির বিরুদ্ধে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
কারাগারে থাকার মধ্যেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরানের প্রভাব কমেনি। তার দল পিটিআই নিয়মিত তার মুক্তি, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
হাসপাতালকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা
ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। হাসপাতাল ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তার সমর্থকদের একাংশ এটিকে ইমরানের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রমাণ হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে সরকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ইমরানকে হাসপাতাল থেকে দ্রুত কারাগারে ফেরানোও সেই নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক অবস্থানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামনে কী?
ইমরান খানকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফেরানো হলেও তার স্বাস্থ্য নিয়ে বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না। বরং আদালতের নির্দেশ, সরকারের অবস্থান, চিকিৎসকদের মূল্যায়ন এবং পিটিআইয়ের দাবির মধ্যে পার্থক্য আগামী দিনগুলোতে আরও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে স্বচ্ছ ও স্বাধীন চিকিৎসা মূল্যায়ন কতটা নিয়মিত হবে এবং আদালতের দেওয়া চিকিৎসা-সংক্রান্ত নির্দেশনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে।
ইমরান খানকে ঘিরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট এমনিতেই দীর্ঘদিনের। এবার তার স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার বিষয়টি সেই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। হাসপাতাল থেকে আবার কারাগারে ফেরার এই ঘটনা তাই শুধু একজন বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসার খবর নয়; পাকিস্তানের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও এটি নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।



















