ঢাকা ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৬ লাখ ৯০ হাজার ফেল, ৩১২ প্রতিষ্ঠানে পাস করেনি কেউ!

নিজস্ব সংবাদ :

এসএসসির ফলে বড় ধাক্কা: ৬ লাখ ৯০ হাজার ফেল, ৩১২ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস!
শিক্ষার মান নিয়ে কঠিন প্রশ্ন—কোথায় ব্যর্থতা, দায় কার?
নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। বিপরীতে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। সার্বিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে। এর মধ্যে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬টি, সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিদেশের একটি পরীক্ষাকেন্দ্রেও কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি।
ফেল বেড়েছে, পরীক্ষার্থী কমেছে
ফল বিশ্লেষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র সামনে এসেছে। গত বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯০ হাজার। ২০২৫ সালের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থী কমেছে ৭৪ হাজার ৬০১ জন, অথচ অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৯ হাজার ৯২৮ জন।
এমন ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে এটি বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষকতার মান, একাডেমিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত প্রস্তুতি—সবকিছুকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মানবিকে ফল সবচেয়ে হতাশাজনক
বিভাগভিত্তিক ফলেও বড় বৈষম্য দেখা গেছে। মানবিক বিভাগে পাসের হার নেমে এসেছে ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে। অর্থাৎ মানবিক বিভাগের প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ জনের বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
এই ব্যবধান শিক্ষাব্যবস্থায় বিভাগভিত্তিক প্রস্তুতি, পাঠদানের সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তার বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
৩১২ প্রতিষ্ঠানে একজনও পাস না করা—কী বলছে এই পরিসংখ্যান?
একটি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করার ঘটনা নিছক পরীক্ষার ফল নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী একই সঙ্গে ব্যর্থ হলে সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির পাশাপাশি শিক্ষাদান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে তদন্ত ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে দায়ী করা সমীচীন নয়। বরং শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক উপস্থিতি, নিয়মিত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক ফল, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব চিত্র খতিয়ে দেখা জরুরি।
জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি?
এবারের ফলাফল শিক্ষা প্রশাসনের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—যে প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পাঠদান চলেছে, সেখানে পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হলো না কেন?
শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে দায় শেষ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কোথায় শিক্ষক সংকট, কোথায় পাঠদানে অনিয়ম, কোথায় শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি এবং কোথায় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—প্রতিটি কারণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়েও কার্যকর পরিকল্পনা দরকার। একটি পরীক্ষার ফল যেন তাদের শিক্ষাজীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে না দাঁড়ায়—সেদিকেও নজর দিতে হবে।
অনুসন্ধানের দাবি এখন একটাই—
৩১২টি প্রতিষ্ঠানে কেন একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারল না, আর প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী কেন ব্যর্থ হলো—এর পেছনের প্রকৃত কারণ কি শিক্ষা প্রশাসন প্রকাশ্যে আনবে?
২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার মান, তদারকি ও জবাবদিহির বড় পরীক্ষা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ০৭:৫৬:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
৬ বার পড়া হয়েছে

৬ লাখ ৯০ হাজার ফেল, ৩১২ প্রতিষ্ঠানে পাস করেনি কেউ!

আপডেট সময় ০৭:৫৬:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

এসএসসির ফলে বড় ধাক্কা: ৬ লাখ ৯০ হাজার ফেল, ৩১২ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস!
শিক্ষার মান নিয়ে কঠিন প্রশ্ন—কোথায় ব্যর্থতা, দায় কার?
নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। বিপরীতে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। সার্বিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে। এর মধ্যে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬টি, সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিদেশের একটি পরীক্ষাকেন্দ্রেও কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি।
ফেল বেড়েছে, পরীক্ষার্থী কমেছে
ফল বিশ্লেষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র সামনে এসেছে। গত বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯০ হাজার। ২০২৫ সালের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থী কমেছে ৭৪ হাজার ৬০১ জন, অথচ অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৯ হাজার ৯২৮ জন।
এমন ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে এটি বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষকতার মান, একাডেমিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত প্রস্তুতি—সবকিছুকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মানবিকে ফল সবচেয়ে হতাশাজনক
বিভাগভিত্তিক ফলেও বড় বৈষম্য দেখা গেছে। মানবিক বিভাগে পাসের হার নেমে এসেছে ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে। অর্থাৎ মানবিক বিভাগের প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫১ জনের বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
এই ব্যবধান শিক্ষাব্যবস্থায় বিভাগভিত্তিক প্রস্তুতি, পাঠদানের সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তার বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
৩১২ প্রতিষ্ঠানে একজনও পাস না করা—কী বলছে এই পরিসংখ্যান?
একটি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করার ঘটনা নিছক পরীক্ষার ফল নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী একই সঙ্গে ব্যর্থ হলে সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির পাশাপাশি শিক্ষাদান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে তদন্ত ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে দায়ী করা সমীচীন নয়। বরং শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক উপস্থিতি, নিয়মিত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক ফল, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব চিত্র খতিয়ে দেখা জরুরি।
জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি?
এবারের ফলাফল শিক্ষা প্রশাসনের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—যে প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পাঠদান চলেছে, সেখানে পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হলো না কেন?
শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে দায় শেষ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কোথায় শিক্ষক সংকট, কোথায় পাঠদানে অনিয়ম, কোথায় শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি এবং কোথায় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—প্রতিটি কারণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়েও কার্যকর পরিকল্পনা দরকার। একটি পরীক্ষার ফল যেন তাদের শিক্ষাজীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে না দাঁড়ায়—সেদিকেও নজর দিতে হবে।
অনুসন্ধানের দাবি এখন একটাই—
৩১২টি প্রতিষ্ঠানে কেন একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারল না, আর প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী কেন ব্যর্থ হলো—এর পেছনের প্রকৃত কারণ কি শিক্ষা প্রশাসন প্রকাশ্যে আনবে?
২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার মান, তদারকি ও জবাবদিহির বড় পরীক্ষা।