ঢাকা ০৬:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতি ঢাকতে সাংবাদিকরাই কেন টার্গেট? নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে হয়রানি ও লাঞ্চনা

নিজস্ব সংবাদ :

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | (পর্ব-১) নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ বা ঘুষ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই পাসপোর্ট সংক্রান্ত ফাইল এগোয় না। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে দালালদের মাধ্যমে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। শুধু সেবাগ্রহীতাই নন, এসব অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও নানাভাবে বাধার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান করতে দৈনিক সময়ের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধি এবং আরেকটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে যান। সাংবাদিকদের উপস্থিতির খবর পেয়ে অফিস সহকারী ফারুক ইসলাম নিচে নেমে এসে মূল ফটকের সামনেই তাদের প্রবেশে বাধা দেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি দাবি করেন, পাসপোর্ট অফিসে প্রবেশ করতে হলে ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিভাগীয় কার্যালয় থেকে লিখিত অনুমতি আনতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ফারুক ইসলাম তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং নিরাপত্তারক্ষীদের ডেকে সাংবাদিকদের অফিস প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দিতে বলেন। এ সময় ঘটনার ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তিনি প্রতিবেদকের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অফিস সহকারী হওয়া সত্ত্বেও ফারুক ইসলাম পুরো কার্যালয়ের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে সাধারণ সেবাগ্রহীতা থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মীরাও সেখানে কাজ করতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন। এর আগেও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম দুর্নীতির চিত্র গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে সেখানে গেলে তাকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ আখ্যা দিয়ে আটক করা হয়। পরে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুনিম সোহানার নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে সাত দিনের কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা জরিমানা করেন। ঘটনার সময় উপস্থিত আরেক সাংবাদিক প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ছবি তোলা কোনো অপরাধ নয়। তবুও তাকে কিছু সময় আটকে রেখে মুচলেকা নিয়ে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই ধরনের ঘটনার শিকার হন সাংবাদিক শফিকুর রহমানও। বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট ২০২৫) দুপুরে দুর্নীতির ফুটেজ সংগ্রহ করতে গেলে অফিস কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সোপর্দ করে। পরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে ‘সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না’ এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিলে মাতৃভূমির খবর পত্রিকার সম্পাদক রেজাউল করিমও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, বিষয়টি সরেজমিনে জানতে তিনি নিজেই নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে যান। সেখানে এক আনসার সদস্যকে নিজের পরিচয় দিয়ে উপ-পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার কথা জানান। পরে তাকে চারতলায় নিয়ে গিয়ে মিথ্যা অভিযোগে চাঁদাবাজ আখ্যা দিয়ে আটকে রাখা হয়। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক মুচলেকা দিতে বাধ্য করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে ঘুষ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই কোনো কাজ সম্পন্ন হয় না। অথচ এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে কিংবা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গেলেই সাংবাদিকদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সচেতন মহল বলছেন, পাসপোর্ট অফিসে চলমান দুর্নীতি ও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এতে যেমন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে, তেমনি সেবা কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা ফিরে আসবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ১০:৫৯:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
৪৬ বার পড়া হয়েছে

দুর্নীতি ঢাকতে সাংবাদিকরাই কেন টার্গেট? নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে হয়রানি ও লাঞ্চনা

আপডেট সময় ১০:৫৯:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | (পর্ব-১) নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ বা ঘুষ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই পাসপোর্ট সংক্রান্ত ফাইল এগোয় না। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে দালালদের মাধ্যমে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। শুধু সেবাগ্রহীতাই নন, এসব অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও নানাভাবে বাধার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান করতে দৈনিক সময়ের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধি এবং আরেকটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে যান। সাংবাদিকদের উপস্থিতির খবর পেয়ে অফিস সহকারী ফারুক ইসলাম নিচে নেমে এসে মূল ফটকের সামনেই তাদের প্রবেশে বাধা দেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি দাবি করেন, পাসপোর্ট অফিসে প্রবেশ করতে হলে ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিভাগীয় কার্যালয় থেকে লিখিত অনুমতি আনতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ফারুক ইসলাম তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং নিরাপত্তারক্ষীদের ডেকে সাংবাদিকদের অফিস প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দিতে বলেন। এ সময় ঘটনার ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তিনি প্রতিবেদকের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অফিস সহকারী হওয়া সত্ত্বেও ফারুক ইসলাম পুরো কার্যালয়ের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে সাধারণ সেবাগ্রহীতা থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মীরাও সেখানে কাজ করতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন। এর আগেও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম দুর্নীতির চিত্র গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে সেখানে গেলে তাকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ আখ্যা দিয়ে আটক করা হয়। পরে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুনিম সোহানার নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে সাত দিনের কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা জরিমানা করেন। ঘটনার সময় উপস্থিত আরেক সাংবাদিক প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ছবি তোলা কোনো অপরাধ নয়। তবুও তাকে কিছু সময় আটকে রেখে মুচলেকা নিয়ে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই ধরনের ঘটনার শিকার হন সাংবাদিক শফিকুর রহমানও। বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট ২০২৫) দুপুরে দুর্নীতির ফুটেজ সংগ্রহ করতে গেলে অফিস কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সোপর্দ করে। পরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে ‘সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না’ এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিলে মাতৃভূমির খবর পত্রিকার সম্পাদক রেজাউল করিমও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, বিষয়টি সরেজমিনে জানতে তিনি নিজেই নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে যান। সেখানে এক আনসার সদস্যকে নিজের পরিচয় দিয়ে উপ-পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার কথা জানান। পরে তাকে চারতলায় নিয়ে গিয়ে মিথ্যা অভিযোগে চাঁদাবাজ আখ্যা দিয়ে আটকে রাখা হয়। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক মুচলেকা দিতে বাধ্য করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে ঘুষ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই কোনো কাজ সম্পন্ন হয় না। অথচ এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে কিংবা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গেলেই সাংবাদিকদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সচেতন মহল বলছেন, পাসপোর্ট অফিসে চলমান দুর্নীতি ও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এতে যেমন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে, তেমনি সেবা কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা ফিরে আসবে।


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home2/rojkhobor/public_html/wp-includes/functions.php on line 5481