ঢাকা ১০:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেসরকারি শিক্ষকদের সাংবাদিকতা নিয়ে বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞার আইনগত ভিত্তি কোথায়?

নিজস্ব সংবাদ :

শিক্ষকদের সাংবাদিকতায় নিষেধাজ্ঞা, আইনি ভিত্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন
প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যানের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক; এমপিও নীতিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট, পেশাগত স্বাধীনতা ও চাকরিবিধি নিয়ে আলোচনায় শিক্ষকসমাজ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
শিক্ষকতা করবেন, নাকি সাংবাদিকতা—এবার সেই প্রশ্নের মুখে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। ‘শিক্ষকদের সাংবাদিকতা করার সুযোগ নেই’—প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করার ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিও নীতিমালায় বিধিনিষেধ রয়েছে, অন্যদিকে সেই বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষকদের সাংবাদিকতা করার সুযোগ বন্ধের আইনগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, এ নিষেধাজ্ঞার পরিধি কতটুকু এবং পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য কোথায়?
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫-এর ১১.১৭(ক) ও ১১.১৭(খ) উপবিধিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের একাধিক চাকরি বা আর্থিক লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকার বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় কাজের বিনিময়ে বেতন, ভাতা বা সম্মানী গ্রহণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে এমপিও বাতিলসহ বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথম আলো
আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ নীতিমালা
২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ নতুন এমপিও নীতিমালা জারি করে। এর ১১.১৭(ক) ও ১১.১৭(খ) উপবিধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক মুহাম্মদ মাসুদ হাসানসহ ১০ জন হাইকোর্টে রিট করেন। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
তবে আদালতের রুল জারি হওয়া মানেই নীতিমালা বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং আদালতের পরবর্তী আদেশের ওপরই এ বিষয়ে আইনগত অবস্থান নির্ধারিত হবে। ফলে বিধানটি বাতিল হয়েছে—এমন দাবি যেমন এখনই করা যাবে না, তেমনি আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বিতর্কের সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলারও সুযোগ নেই। প্রথম আলো
প্রেস কাউন্সিলের বক্তব্য বনাম চাকরিবিধি
প্রেস কাউন্সিলের দায়িত্বের মধ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন এবং পেশাগত আচরণবিধি অনুসরণের বিষয় রয়েছে। অন্যদিকে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চাকরি ও আর্থিক সুবিধার শর্ত নির্ধারণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নীতিমালা।
তাই প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে সব শিক্ষকের জন্য সর্বজনীন আইনগত নিষেধাজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করার আগে বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং প্রযোজ্য বিধান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক, নন-এমপিও শিক্ষক, স্বতন্ত্রভাবে সংবাদ লেখা ব্যক্তি এবং বেতন বা সম্মানীর বিনিময়ে নিয়মিত সাংবাদিকতায় যুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থান এক নয়।
শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা—দুটি দায়িত্বের সমন্বয় কি অসম্ভব?
শিক্ষকতার মূল দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের পাঠদান, মূল্যায়ন ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে সাংবাদিকতার দায়িত্ব তথ্য যাচাই, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরা এবং অনিয়মের বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা। দুটি পেশার দায়িত্ব আলাদা হলেও একটিকে অন্যটির স্বাভাবিক বিরোধী হিসেবে দেখার আগে চাকরিবিধি ও পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্ন বিবেচনা করা জরুরি।
শিক্ষকতার দায়িত্বে অবহেলা, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ কিংবা সংবাদ প্রকাশে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পেশাগত স্বাধীনতা ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের সুযোগ কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
স্পষ্ট ব্যাখ্যা চায় শিক্ষকসমাজ
বিতর্কের অবসানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সংশ্লিষ্ট বিধানের পরিধি, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বেতন, ভাতা বা সম্মানী গ্রহণের বিষয়টি কীভাবে বিবেচিত হবে—তা স্পষ্ট করার দাবি উঠছে। একই সঙ্গে হাইকোর্টে চলমান রিটের সর্বশেষ অবস্থা এবং সরকারের আইনগত অবস্থান জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, শিক্ষকদের সাংবাদিকতা নিয়ে বিতর্কটি শুধু একটি পেশা বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চাকরির শর্ত, পেশাগত জবাবদিহি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং আইনগত কর্তৃত্বের বিষয়। বক্তব্য বা অনুমানের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট বিধান, সরকারি ব্যাখ্যা ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এ বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৭:৪৪:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
৮ বার পড়া হয়েছে

বেসরকারি শিক্ষকদের সাংবাদিকতা নিয়ে বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞার আইনগত ভিত্তি কোথায়?

আপডেট সময় ০৭:৪৪:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষকদের সাংবাদিকতায় নিষেধাজ্ঞা, আইনি ভিত্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন
প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যানের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক; এমপিও নীতিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট, পেশাগত স্বাধীনতা ও চাকরিবিধি নিয়ে আলোচনায় শিক্ষকসমাজ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
শিক্ষকতা করবেন, নাকি সাংবাদিকতা—এবার সেই প্রশ্নের মুখে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। ‘শিক্ষকদের সাংবাদিকতা করার সুযোগ নেই’—প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করার ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিও নীতিমালায় বিধিনিষেধ রয়েছে, অন্যদিকে সেই বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষকদের সাংবাদিকতা করার সুযোগ বন্ধের আইনগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, এ নিষেধাজ্ঞার পরিধি কতটুকু এবং পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য কোথায়?
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫-এর ১১.১৭(ক) ও ১১.১৭(খ) উপবিধিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের একাধিক চাকরি বা আর্থিক লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকার বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় কাজের বিনিময়ে বেতন, ভাতা বা সম্মানী গ্রহণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে এমপিও বাতিলসহ বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথম আলো
আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ নীতিমালা
২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ নতুন এমপিও নীতিমালা জারি করে। এর ১১.১৭(ক) ও ১১.১৭(খ) উপবিধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক মুহাম্মদ মাসুদ হাসানসহ ১০ জন হাইকোর্টে রিট করেন। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
তবে আদালতের রুল জারি হওয়া মানেই নীতিমালা বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং আদালতের পরবর্তী আদেশের ওপরই এ বিষয়ে আইনগত অবস্থান নির্ধারিত হবে। ফলে বিধানটি বাতিল হয়েছে—এমন দাবি যেমন এখনই করা যাবে না, তেমনি আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বিতর্কের সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলারও সুযোগ নেই। প্রথম আলো
প্রেস কাউন্সিলের বক্তব্য বনাম চাকরিবিধি
প্রেস কাউন্সিলের দায়িত্বের মধ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন এবং পেশাগত আচরণবিধি অনুসরণের বিষয় রয়েছে। অন্যদিকে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চাকরি ও আর্থিক সুবিধার শর্ত নির্ধারণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নীতিমালা।
তাই প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে সব শিক্ষকের জন্য সর্বজনীন আইনগত নিষেধাজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করার আগে বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং প্রযোজ্য বিধান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক, নন-এমপিও শিক্ষক, স্বতন্ত্রভাবে সংবাদ লেখা ব্যক্তি এবং বেতন বা সম্মানীর বিনিময়ে নিয়মিত সাংবাদিকতায় যুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থান এক নয়।
শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা—দুটি দায়িত্বের সমন্বয় কি অসম্ভব?
শিক্ষকতার মূল দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের পাঠদান, মূল্যায়ন ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে সাংবাদিকতার দায়িত্ব তথ্য যাচাই, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরা এবং অনিয়মের বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা। দুটি পেশার দায়িত্ব আলাদা হলেও একটিকে অন্যটির স্বাভাবিক বিরোধী হিসেবে দেখার আগে চাকরিবিধি ও পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্ন বিবেচনা করা জরুরি।
শিক্ষকতার দায়িত্বে অবহেলা, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ কিংবা সংবাদ প্রকাশে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পেশাগত স্বাধীনতা ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের সুযোগ কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
স্পষ্ট ব্যাখ্যা চায় শিক্ষকসমাজ
বিতর্কের অবসানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সংশ্লিষ্ট বিধানের পরিধি, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বেতন, ভাতা বা সম্মানী গ্রহণের বিষয়টি কীভাবে বিবেচিত হবে—তা স্পষ্ট করার দাবি উঠছে। একই সঙ্গে হাইকোর্টে চলমান রিটের সর্বশেষ অবস্থা এবং সরকারের আইনগত অবস্থান জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, শিক্ষকদের সাংবাদিকতা নিয়ে বিতর্কটি শুধু একটি পেশা বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চাকরির শর্ত, পেশাগত জবাবদিহি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং আইনগত কর্তৃত্বের বিষয়। বক্তব্য বা অনুমানের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট বিধান, সরকারি ব্যাখ্যা ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এ বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত।