ঢাকা ০৬:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবকাঠামো উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবি—দক্ষ জনশক্তির বিকাশে চাই সময়োপযোগী নীতিমালা লেখক: বাদল চৌধুরী, সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড

নিজস্ব সংবাদ :

অবকাঠামো উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা—অবদানের স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতার দাবি
সড়ক-সেতু থেকে বিদ্যুৎ ও ভবন নির্মাণ—উন্নয়নের বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; শিক্ষার সুযোগ, পেশাগত মর্যাদা ও পদোন্নতিতে সুস্পষ্ট নীতিমালা চান সংশ্লিষ্টরা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রাম থেকে শহর, উপজেলা থেকে মহানগর—যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক, সেতু, কালভার্ট, সরকারি ভবন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে। এসব উন্নয়নকাজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নির্মাণ তদারকি, কারিগরি পরিমাপ, মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ভূমিকা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পকে আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি জনশক্তির উচ্চশিক্ষা, পেশাগত অগ্রগতি, কর্মসংস্থান ও যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
দেশের উন্নয়ন যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই বাড়ছে দক্ষ প্রকৌশল জনবলের প্রয়োজন। আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে শুধু অর্থ বরাদ্দ কিংবা নকশা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; দরকার বাস্তবায়ন পর্যায়ে দক্ষতা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, নির্মাণের মান নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি। সেই বিবেচনায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অর্জিত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো জাতীয় উন্নয়নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে তাঁদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা। উচ্চশিক্ষার সুযোগ কীভাবে সম্প্রসারিত হবে, সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার মূল্যায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে, পদোন্নতির পথ কীভাবে স্বচ্ছ হবে এবং প্রকৌশল পেশার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে বাড়ানো যাবে—এসব বিষয়ের সমাধানেই নিহিত রয়েছে একটি আধুনিক ও দক্ষ কারিগরি কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা।
উন্নয়নের বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের দক্ষতা
একটি সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটি পরীক্ষা, ভিত্তি প্রস্তুত, উপকরণের গুণগত মান, নির্মাণের পরিমাপ ও কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সেতু, কালভার্ট, ভবন কিংবা পানি সরবরাহব্যবস্থা নির্মাণেও নির্ধারিত নকশা, কারিগরি নির্দেশনা ও মানদণ্ড অনুসরণ করা অপরিহার্য। প্রকল্পের ধরন ও দায়িত্ব বণ্টন অনুযায়ী এসব কাজে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পৃক্ততা থাকে।
নির্মাণস্থলে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, পরিমাণ নিরূপণ, উপকরণের ব্যবহার যাচাই, কারিগরি নথি সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করার মতো দায়িত্ব প্রকল্পের মান ও কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সময়মতো ত্রুটি শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে অপচয় কমানো, কাজের মান উন্নত করা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি হ্রাস করার সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী একজন কারিগরি পেশাজীবীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই দায়িত্বের প্রকৃতি, কাজের পরিধি, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের পেশাগত অবদান মূল্যায়ন করা জরুরি।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অবকাঠামো প্রকল্পে পরিকল্পনা, নকশা, বিশ্লেষণ, বাস্তবায়ন, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোনো একটি পর্যায়কে গুরুত্ব দিয়ে অন্য পর্যায়কে অবমূল্যায়ন করলে প্রকল্পের সামগ্রিক কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উচ্চশিক্ষার পথ হোক আরও সুস্পষ্ট
ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখেন। কেউ বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করতে চান, কেউ গবেষণায় যুক্ত হতে চান, আবার কেউ কর্মজীবনে আরও বেশি দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের যোগ্যতা বাড়াতে চান। তাঁদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ কতটা সহজলভ্য, তা কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ এমন হওয়া উচিত, যেখানে যোগ্যতা, মেধা ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে পরবর্তী শিক্ষাস্তরে যাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ভর্তি-যোগ্যতা, বিষয়গত সামঞ্জস্য, আসনসংখ্যা ও একাডেমিক মান বিবেচনা করে নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রিজ কোর্স, গণিত ও মৌলিক বিজ্ঞানের অতিরিক্ত প্রস্তুতি এবং পূর্ববর্তী শিক্ষার সঙ্গে পরবর্তী পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্য নিরূপণের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এতে শিক্ষার্থীরা উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একাডেমিক মান বজায় রেখে ভর্তি নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
এখানে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—যোগ্য শিক্ষার্থীদের সামনে অযৌক্তিক বাধা না রাখা, আবার উচ্চশিক্ষার গুণগত মানও অক্ষুণ্ণ রাখা। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের পথ তৈরি করে না; দীর্ঘমেয়াদে দেশের কারিগরি জনশক্তির জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
চাকরিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদা
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁদের জন্য উপযুক্ত পদ, দায়িত্ব ও পদোন্নতির পথ কতটা স্পষ্ট। সরকারি প্রকৌশল বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ খাত এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কারিগরি জনবলের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে কর্মসংস্থানের সুযোগকে কার্যকর করতে হলে শুধু পদ সৃষ্টি করলেই চলবে না; পদগুলোর কাজের ধরন, নিয়োগের যোগ্যতা, দায়িত্বের সীমা এবং পদোন্নতির শর্তও সুস্পষ্ট হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনে একজন দক্ষ পেশাজীবী কীভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন, প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে সামনে এগোতে পারবেন, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদিত পদ, জনবল চাহিদা, শূন্যপদ, নিয়োগবিধি ও পদোন্নতির কাঠামো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। যেখানে অসামঞ্জস্য বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা রয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত নিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে বেসরকারি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতেও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা দরকার। এতে কর্মীদের কর্মপ্রেরণা বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোও দক্ষ জনবল ধরে রাখার সুযোগ পাবে।
ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলী: সমন্বয়ের মধ্যেই সমাধান
প্রকৌশল পেশায় বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষের কাজের ক্ষেত্র, দায়িত্ব ও পেশাগত অগ্রগতি নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পদবি, নিয়োগের যোগ্যতা, পদোন্নতি এবং কর্মক্ষেত্রে সুযোগের প্রশ্নে বিতর্ক দেখা দিলে তা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারে।
কিন্তু দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এই বিতর্ককে সংঘাতে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয়। ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলীদের শিক্ষাগত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ধরনে পার্থক্য রয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ করা গেলে পরস্পরের দক্ষতাকে কাজে লাগানো সম্ভব।
উচ্চতর বিশ্লেষণ, নকশা প্রণয়ন, গবেষণা, নির্মাণ বাস্তবায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রে উপযুক্ত যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রয়োজন। তাই পদ ও দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, কাজের প্রকৃতি এবং জননিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
একজনের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যজনের অবদানকে ছোট করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং স্বচ্ছ নীতিমালা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজনের মাধ্যমে প্রকৌশল পেশায় সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।
কর্মসংস্থান পরিকল্পনায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি
দেশের অবকাঠামো খাতের চাহিদা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন সড়ক ও সেতু নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণের ক্ষেত্রেও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন রয়েছে।
এ কারণে কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষ জনবল প্রয়োজন, কোথায় প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে এবং আগামী দিনে কোন প্রযুক্তিগত দক্ষতার চাহিদা বাড়তে পারে—এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠন যৌথভাবে কাজ করলে কর্মসংস্থান পরিকল্পনা আরও কার্যকর হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন এবং নিয়োগকারীরাও তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী জনবল খুঁজে পেতে পারবেন।
আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই
বর্তমান বিশ্বে প্রকৌশল খাত দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। ডিজিটাল নকশা, আধুনিক জরিপ, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, উপকরণ পরীক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা হালনাগাদের সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক কর্মশালা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং দক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে তাঁদের পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করে শিল্প ও অবকাঠামো খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করা প্রয়োজন।
দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রশিক্ষিত কর্মী কাজের মান উন্নয়নে, অপচয় কমাতে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে
পেশাগত মর্যাদা ও ন্যায্য সুযোগের দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সততা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা। জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।
নির্মাণকাজে মানদণ্ড অনুসরণ, উপকরণের গুণগত মান যাচাই, সঠিক পরিমাপ, কারিগরি নথি সংরক্ষণ এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকি যেন ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে আড়াল না থাকে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মপরিবেশ এমন হওয়া উচিত, যেখানে তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব স্বাধীনভাবে ও সততার সঙ্গে পালন করতে পারেন। একই সঙ্গে তাঁদের কাজের মান ও সিদ্ধান্তের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পেশাগত অগ্রগতির বিষয়গুলো সমাধানে কয়েকটি উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রথমত, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ, যোগ্যতার শর্ত ও প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি করা।
দ্বিতীয়ত, সরকারি প্রকৌশল বিভাগগুলোর পদ, দায়িত্ব, নিয়োগবিধি ও পদোন্নতির কাঠামো পর্যালোচনা করা।
তৃতীয়ত, অবকাঠামো ও শিল্প খাতের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জনবল চাহিদা নিরূপণ করে কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।
চতুর্থত, আধুনিক প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো।
পঞ্চমত, ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলী প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী সংগঠন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠা করা।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তথ্য, গবেষণা, জনবল চাহিদা এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালাকে ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও গ্রহণযোগ্য হবে এবং পেশাগত বিরোধের পরিবর্তে বাস্তব সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
উপসংহার: উন্নয়নের কারিগরদের মূল্যায়ন মানেই জাতীয় সক্ষমতায় বিনিয়োগ
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল কারিগরি জনশক্তি। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এই জনশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্যায়ন এবং পেশাগত অগ্রগতির পথ সুস্পষ্ট করা জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গেই সম্পর্কিত।
এ জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতিমালা, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, যোগ্যতাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা। একই সঙ্গে শিক্ষার মান, পেশাগত নৈতিকতা, জননিরাপত্তা ও জবাবদিহির বিষয়েও কোনো আপস করা যাবে না।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মেধাবী ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী যোগ্যতা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন, একজন দক্ষ পেশাজীবী তাঁর কাজের ন্যায্য মূল্যায়ন পাবেন এবং প্রতিটি অবকাঠামো প্রকল্পে দক্ষতা, সততা ও মানসম্মত কাজ নিশ্চিত হবে।
উন্নয়নের নেপথ্যে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেই গড়ে উঠতে পারে আরও দক্ষ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অধিকার, উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের ন্যায্যতার প্রশ্নে এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ—যেখানে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিরোধ নয়, বরং যোগ্যতা, দক্ষতা ও জনস্বার্থই হবে সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।
লেখক: বাদল চৌধুরী
সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৫:১৭:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
১০ বার পড়া হয়েছে

অবকাঠামো উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবি—দক্ষ জনশক্তির বিকাশে চাই সময়োপযোগী নীতিমালা লেখক: বাদল চৌধুরী, সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড

আপডেট সময় ০৫:১৭:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

অবকাঠামো উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা—অবদানের স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতার দাবি
সড়ক-সেতু থেকে বিদ্যুৎ ও ভবন নির্মাণ—উন্নয়নের বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; শিক্ষার সুযোগ, পেশাগত মর্যাদা ও পদোন্নতিতে সুস্পষ্ট নীতিমালা চান সংশ্লিষ্টরা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রাম থেকে শহর, উপজেলা থেকে মহানগর—যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক, সেতু, কালভার্ট, সরকারি ভবন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে। এসব উন্নয়নকাজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নির্মাণ তদারকি, কারিগরি পরিমাপ, মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ভূমিকা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পকে আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি জনশক্তির উচ্চশিক্ষা, পেশাগত অগ্রগতি, কর্মসংস্থান ও যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
দেশের উন্নয়ন যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই বাড়ছে দক্ষ প্রকৌশল জনবলের প্রয়োজন। আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে শুধু অর্থ বরাদ্দ কিংবা নকশা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; দরকার বাস্তবায়ন পর্যায়ে দক্ষতা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, নির্মাণের মান নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি। সেই বিবেচনায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অর্জিত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো জাতীয় উন্নয়নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে তাঁদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা। উচ্চশিক্ষার সুযোগ কীভাবে সম্প্রসারিত হবে, সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার মূল্যায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে, পদোন্নতির পথ কীভাবে স্বচ্ছ হবে এবং প্রকৌশল পেশার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে বাড়ানো যাবে—এসব বিষয়ের সমাধানেই নিহিত রয়েছে একটি আধুনিক ও দক্ষ কারিগরি কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা।
উন্নয়নের বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের দক্ষতা
একটি সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটি পরীক্ষা, ভিত্তি প্রস্তুত, উপকরণের গুণগত মান, নির্মাণের পরিমাপ ও কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সেতু, কালভার্ট, ভবন কিংবা পানি সরবরাহব্যবস্থা নির্মাণেও নির্ধারিত নকশা, কারিগরি নির্দেশনা ও মানদণ্ড অনুসরণ করা অপরিহার্য। প্রকল্পের ধরন ও দায়িত্ব বণ্টন অনুযায়ী এসব কাজে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পৃক্ততা থাকে।
নির্মাণস্থলে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, পরিমাণ নিরূপণ, উপকরণের ব্যবহার যাচাই, কারিগরি নথি সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করার মতো দায়িত্ব প্রকল্পের মান ও কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সময়মতো ত্রুটি শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে অপচয় কমানো, কাজের মান উন্নত করা এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি হ্রাস করার সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী একজন কারিগরি পেশাজীবীর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই দায়িত্বের প্রকৃতি, কাজের পরিধি, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের পেশাগত অবদান মূল্যায়ন করা জরুরি।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অবকাঠামো প্রকল্পে পরিকল্পনা, নকশা, বিশ্লেষণ, বাস্তবায়ন, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোনো একটি পর্যায়কে গুরুত্ব দিয়ে অন্য পর্যায়কে অবমূল্যায়ন করলে প্রকল্পের সামগ্রিক কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উচ্চশিক্ষার পথ হোক আরও সুস্পষ্ট
ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখেন। কেউ বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করতে চান, কেউ গবেষণায় যুক্ত হতে চান, আবার কেউ কর্মজীবনে আরও বেশি দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের যোগ্যতা বাড়াতে চান। তাঁদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ কতটা সহজলভ্য, তা কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ এমন হওয়া উচিত, যেখানে যোগ্যতা, মেধা ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে পরবর্তী শিক্ষাস্তরে যাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ভর্তি-যোগ্যতা, বিষয়গত সামঞ্জস্য, আসনসংখ্যা ও একাডেমিক মান বিবেচনা করে নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রিজ কোর্স, গণিত ও মৌলিক বিজ্ঞানের অতিরিক্ত প্রস্তুতি এবং পূর্ববর্তী শিক্ষার সঙ্গে পরবর্তী পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্য নিরূপণের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এতে শিক্ষার্থীরা উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একাডেমিক মান বজায় রেখে ভর্তি নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
এখানে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—যোগ্য শিক্ষার্থীদের সামনে অযৌক্তিক বাধা না রাখা, আবার উচ্চশিক্ষার গুণগত মানও অক্ষুণ্ণ রাখা। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের পথ তৈরি করে না; দীর্ঘমেয়াদে দেশের কারিগরি জনশক্তির জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
চাকরিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদা
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁদের জন্য উপযুক্ত পদ, দায়িত্ব ও পদোন্নতির পথ কতটা স্পষ্ট। সরকারি প্রকৌশল বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ খাত এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কারিগরি জনবলের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে কর্মসংস্থানের সুযোগকে কার্যকর করতে হলে শুধু পদ সৃষ্টি করলেই চলবে না; পদগুলোর কাজের ধরন, নিয়োগের যোগ্যতা, দায়িত্বের সীমা এবং পদোন্নতির শর্তও সুস্পষ্ট হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনে একজন দক্ষ পেশাজীবী কীভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন, প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে সামনে এগোতে পারবেন, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদিত পদ, জনবল চাহিদা, শূন্যপদ, নিয়োগবিধি ও পদোন্নতির কাঠামো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। যেখানে অসামঞ্জস্য বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা রয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত নিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে বেসরকারি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতেও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা দরকার। এতে কর্মীদের কর্মপ্রেরণা বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোও দক্ষ জনবল ধরে রাখার সুযোগ পাবে।
ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলী: সমন্বয়ের মধ্যেই সমাধান
প্রকৌশল পেশায় বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষের কাজের ক্ষেত্র, দায়িত্ব ও পেশাগত অগ্রগতি নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পদবি, নিয়োগের যোগ্যতা, পদোন্নতি এবং কর্মক্ষেত্রে সুযোগের প্রশ্নে বিতর্ক দেখা দিলে তা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারে।
কিন্তু দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এই বিতর্ককে সংঘাতে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয়। ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলীদের শিক্ষাগত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ধরনে পার্থক্য রয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ করা গেলে পরস্পরের দক্ষতাকে কাজে লাগানো সম্ভব।
উচ্চতর বিশ্লেষণ, নকশা প্রণয়ন, গবেষণা, নির্মাণ বাস্তবায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রে উপযুক্ত যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রয়োজন। তাই পদ ও দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, কাজের প্রকৃতি এবং জননিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
একজনের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যজনের অবদানকে ছোট করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং স্বচ্ছ নীতিমালা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজনের মাধ্যমে প্রকৌশল পেশায় সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।
কর্মসংস্থান পরিকল্পনায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি
দেশের অবকাঠামো খাতের চাহিদা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন সড়ক ও সেতু নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণের ক্ষেত্রেও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন রয়েছে।
এ কারণে কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষ জনবল প্রয়োজন, কোথায় প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে এবং আগামী দিনে কোন প্রযুক্তিগত দক্ষতার চাহিদা বাড়তে পারে—এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠন যৌথভাবে কাজ করলে কর্মসংস্থান পরিকল্পনা আরও কার্যকর হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন এবং নিয়োগকারীরাও তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী জনবল খুঁজে পেতে পারবেন।
আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই
বর্তমান বিশ্বে প্রকৌশল খাত দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। ডিজিটাল নকশা, আধুনিক জরিপ, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, উপকরণ পরীক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা হালনাগাদের সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক কর্মশালা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং দক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে তাঁদের পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করে শিল্প ও অবকাঠামো খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করা প্রয়োজন।
দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রশিক্ষিত কর্মী কাজের মান উন্নয়নে, অপচয় কমাতে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে
পেশাগত মর্যাদা ও ন্যায্য সুযোগের দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সততা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা। জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।
নির্মাণকাজে মানদণ্ড অনুসরণ, উপকরণের গুণগত মান যাচাই, সঠিক পরিমাপ, কারিগরি নথি সংরক্ষণ এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকি যেন ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে আড়াল না থাকে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মপরিবেশ এমন হওয়া উচিত, যেখানে তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব স্বাধীনভাবে ও সততার সঙ্গে পালন করতে পারেন। একই সঙ্গে তাঁদের কাজের মান ও সিদ্ধান্তের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পেশাগত অগ্রগতির বিষয়গুলো সমাধানে কয়েকটি উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রথমত, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ, যোগ্যতার শর্ত ও প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি করা।
দ্বিতীয়ত, সরকারি প্রকৌশল বিভাগগুলোর পদ, দায়িত্ব, নিয়োগবিধি ও পদোন্নতির কাঠামো পর্যালোচনা করা।
তৃতীয়ত, অবকাঠামো ও শিল্প খাতের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জনবল চাহিদা নিরূপণ করে কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।
চতুর্থত, আধুনিক প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো।
পঞ্চমত, ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলী প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী সংগঠন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রতিষ্ঠা করা।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তথ্য, গবেষণা, জনবল চাহিদা এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালাকে ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও গ্রহণযোগ্য হবে এবং পেশাগত বিরোধের পরিবর্তে বাস্তব সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
উপসংহার: উন্নয়নের কারিগরদের মূল্যায়ন মানেই জাতীয় সক্ষমতায় বিনিয়োগ
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল কারিগরি জনশক্তি। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এই জনশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য মূল্যায়ন এবং পেশাগত অগ্রগতির পথ সুস্পষ্ট করা জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গেই সম্পর্কিত।
এ জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতিমালা, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, যোগ্যতাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা। একই সঙ্গে শিক্ষার মান, পেশাগত নৈতিকতা, জননিরাপত্তা ও জবাবদিহির বিষয়েও কোনো আপস করা যাবে না।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মেধাবী ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী যোগ্যতা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন, একজন দক্ষ পেশাজীবী তাঁর কাজের ন্যায্য মূল্যায়ন পাবেন এবং প্রতিটি অবকাঠামো প্রকল্পে দক্ষতা, সততা ও মানসম্মত কাজ নিশ্চিত হবে।
উন্নয়নের নেপথ্যে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেই গড়ে উঠতে পারে আরও দক্ষ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অধিকার, উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের ন্যায্যতার প্রশ্নে এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ—যেখানে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিরোধ নয়, বরং যোগ্যতা, দক্ষতা ও জনস্বার্থই হবে সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।
লেখক: বাদল চৌধুরী
সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড