মিষ্টির শূন্য আসনে এলিজা জামান, সংসদ সদস্য হওয়া এখন নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষায়
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার পথে এলিজা জামান
মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপির মনোনয়ন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা—তৃণমূলের রাজনীতি থেকে জাতীয় সংসদে যাওয়ার নতুন অধ্যায়
নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে এবার জাতীয় সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এলিজা জামানের সামনে। দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি, পিরোজপুর জেলা বিএনপিতে সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার পর সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন এই বিএনপি নেত্রী। মনোনয়নপত্র বৈধ হলে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষে আর কোনো বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন তিনি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর এই সম্ভাব্য উত্তরণকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্বে পৌঁছানো একজন রাজনৈতিক নেত্রীর জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, তেমনি তা নতুন দায়িত্ব ও জবাবদিহিরও সূচনা। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন, তৃণমূলের উন্নয়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে তাঁর ভূমিকা কেমন হবে, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।
মনোনয়নপত্র জমা, এখন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেন এলিজা জামান। নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মঈন উদ্দীন খান তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগে আসনটি শূন্য হয়। গত ১ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর নির্বাচন কমিশন উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, ২৮ অক্টোবর বাছাইয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল এবং ২৯ অক্টোবর আপিল নিষ্পত্তির কথা রয়েছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১ নভেম্বর এবং প্রতীক বরাদ্দের দিন ২ নভেম্বর। ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ নভেম্বর। তবে এলিজা জামান একমাত্র বৈধ প্রার্থী হিসেবে বহাল থাকলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন ছাড়াই তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করার সুযোগ রয়েছে।
বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে অবস্থান
এলিজা জামান বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পিরোজপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। পাশাপাশি তিনি জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এসব পদে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনাকে শুধু একটি সংসদীয় আসনে প্রার্থী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বের সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।
সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার আগে পিরোজপুর-১ আসনে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্যও তিনি দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে। এবার সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় জাতীয় সংসদে যাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁর সামনে।
স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ: অভিজ্ঞতার নতুন পরীক্ষা
এলিজা জামানের রাজনৈতিক পরিচয়ের আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা একজন জনপ্রতিনিধিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, স্থানীয় উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং প্রশাসনিক জটিলতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিতে পারে।
তবে স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদের দায়িত্ব এক নয়। ইউনিয়ন পরিষদে যেখানে স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা প্রধান বিষয়, সেখানে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় নীতি পর্যালোচনা, বাজেট নিয়ে আলোচনা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
এলিজা জামান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তাঁর সামনে থাকবে স্থানীয় পর্যায়ে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ। বিশেষ করে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলোতে তিনি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পুরস্কার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন
প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালে এলিজা জামান জাতীয় মহিলা সংস্থার পিরোজপুর জেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। পরের বছর সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক দেওয়া হয় বলে উল্লেখ রয়েছে।
তবে পুরস্কারগুলোর প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, সুনির্দিষ্ট পদবি এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রামাণ্য নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এসব তথ্য যাচাই হলে তাঁর অতীত কর্মজীবন ও সামাজিক অবদান সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
রাজনীতিতে কোনো নেতার গ্রহণযোগ্যতা শুধু পদ-পদবি কিংবা পুরস্কারের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। জনসম্পৃক্ততা, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংরক্ষিত নারী আসনের গুরুত্ব
জাতীয় সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সাধারণ নির্বাচনে দল ও জোটের অর্জিত আসনের অনুপাতে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। এ ব্যবস্থায় সংসদে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হলেও তাঁদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের সামনে দলীয় অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদীয় আলোচনায় অংশ নেওয়া, বিভিন্ন আইন ও নীতির প্রভাব পর্যালোচনা এবং নারীদের অধিকার ও সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো সামনে আনার সুযোগ থাকে।
এলিজা জামান সংসদে গেলে তাঁর জন্যও এই দায়িত্বগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে তৃণমূলের নারীদের সমস্যা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে তিনি কী ধরনের উদ্যোগ নেন, তা তাঁর সংসদীয় ভূমিকা মূল্যায়নে বিবেচিত হতে পারে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া আর জনসমর্থন এক বিষয় নয়
এলিজা জামানের সংসদ সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করা সঠিক হবে না। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বৈধতা, আপিলের নিষ্পত্তি এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা অতিক্রম করার পরই চূড়ান্ত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।
এ ছাড়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া এবং সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জনসমর্থন যাচাই হওয়া এক বিষয় নয়। সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনী কাঠামো সাধারণ আসনের নির্বাচন থেকে আলাদা। ফলে এ ধরনের আসনে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
বরং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দায়িত্ব পালনের মান, সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, জনগণের সমস্যা তুলে ধরা এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে একজন প্রতিনিধির ভূমিকা মূল্যায়িত হয়।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
সব মিলিয়ে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার সম্ভাব্য যাত্রা এলিজা জামানের রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে যাচ্ছে। বিএনপির মনোনয়ন ও নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এখন তাঁর সংসদ সদস্য হওয়া নির্ভর করছে নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার ওপর।
তবে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাওয়াই শেষ কথা নয়; বরং সেখান থেকে জনস্বার্থে কী অর্জন করা যায়, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। দলীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি কতটা কার্যকর সংসদীয় ভূমিকা রাখতে পারেন, তা ভবিষ্যতেই প্রমাণিত হবে।






















