ঢাকা ০৬:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ন্যায্য মর্যাদা ও উচ্চশিক্ষার দাবি -লেখক বাদল চৌধুরী

নিজস্ব সংবাদ :

উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা, তবু উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত মর্যাদায় ন্যায্যতার প্রশ্ন
সড়ক-সেতু, বিদ্যুৎ, ভবন ও শিল্প অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছ পদোন্নতি ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি- লেখক বাদল চৌধুরী।
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক সড়ক, সেতু, কালভার্ট, বহুতল ভবন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানা। এসব অবকাঠামোর পেছনে রয়েছে পরিকল্পনা, নকশা, নির্মাণ, কারিগরি তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের বাস্তবায়ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, কারিগরি জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা দিয়ে তাঁরা উন্নয়ন প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দিতে অবদান রাখেন। অথচ তাঁদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ, কর্মজীবনে অগ্রগতি, পদোন্নতি এবং পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে আরও সুস্পষ্ট ও সময়োপযোগী নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে।
দেশের অবকাঠামো খাত যত সম্প্রসারিত হচ্ছে, ততই বাড়ছে দক্ষ কারিগরি জনশক্তির চাহিদা। শুধু প্রকল্প গ্রহণ কিংবা অর্থ বরাদ্দ করলেই উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত হয় না; নির্মাণকাজের গুণগত মান, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো কাজ সম্পন্ন করা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য শুধু কারিগরি শিক্ষা প্রদান যথেষ্ট নয়। শিক্ষার পর কর্মসংস্থান, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সুযোগ এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পেশাগত উন্নতির পথও সুস্পষ্ট হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি।
উন্নয়নের বাস্তবায়নে যাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
একটি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কারিগরি ধাপের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। মাটির অবস্থা যাচাই, নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান পরীক্ষা, পরিমাপ, কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং নির্ধারিত কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়। একইভাবে সেতু, কালভার্ট, সরকারি ভবন, পানি সরবরাহব্যবস্থা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা নির্মাণেও পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
প্রকল্পের ধরন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এসব কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণকাজের ত্রুটি শনাক্ত, উপকরণের অপচয় কমানো এবং কাজের অগ্রগতি মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে। তবে এ অবদানকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে দায়িত্বের পরিধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহির কাঠামোও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো একটি স্তরের দক্ষতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পরিকল্পনা ও নকশা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সঠিক বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ। প্রকৌশল পেশার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় যত বাড়বে, ততই উন্নয়নকাজে গুণগত মান ও দক্ষতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ: মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ
ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখেন। কেউ বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করতে চান, কেউ গবেষণা ও উদ্ভাবনে যুক্ত হতে চান, আবার কেউ কর্মজীবনে আরও বড় দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের যোগ্যতা বাড়াতে আগ্রহী। তাঁদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ কতটা সহজলভ্য এবং পরবর্তী শিক্ষাস্তরে প্রবেশের পথ কতটা সুস্পষ্ট—এ প্রশ্ন কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী পাঠ্যক্রম, একাডেমিক প্রস্তুতি, বিষয়গত সামঞ্জস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-যোগ্যতা এবং শিক্ষার মান বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রিজ কোর্স, গণিত ও মৌলিক বিজ্ঞানের অতিরিক্ত প্রস্তুতি এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এতে যোগ্য শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ পাবেন, পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মানও বজায় রাখা যাবে।
এখানে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাগত ধারাবাহিকতার বাধাগুলো যুক্তিসংগতভাবে পর্যালোচনা করা। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ সুস্পষ্ট হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাবে দেশের শিল্প, নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতও।
চাকরি, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদায় চাই স্বচ্ছতা
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী উপযুক্ত পদ, দায়িত্ব এবং পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা। সরকারি প্রকৌশল বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ খাতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কারিগরি জনবলের ভূমিকা রয়েছে।
তবে কর্মসংস্থান ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ কার্যকর করতে হলে নিয়োগবিধি, অনুমোদিত পদ, শূন্যপদ, দায়িত্বের সীমা এবং পদোন্নতির শর্ত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একজন কর্মী কীভাবে অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হতে পারবেন, তা নির্ধারণে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় কাঠামো থাকা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল কাঠামো ও নিয়োগবিধি পর্যালোচনা করে কোথায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে, কোথায় পদোন্নতির জটিলতা আছে এবং কোন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন—তা নিরূপণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দাবি কিংবা গোষ্ঠীগত অবস্থানের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা, বাস্তব কর্মপরিধি, যোগ্যতা ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
বেসরকারি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতেও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে কর্মীদের পেশাগত আগ্রহ বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোও দক্ষ জনবল ধরে রাখতে পারবে।
ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলী: বিরোধ নয়, সমন্বয়ই হোক অগ্রাধিকার
প্রকৌশল পেশায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, পদবি, দায়িত্ব বণ্টন ও পদোন্নতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। এসব প্রশ্নের ন্যায্য সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দেশের উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে এ ধরনের মতপার্থক্যকে বিরোধে পরিণত না করে যুক্তিসংগত নীতিমালার মাধ্যমে সমাধান করা জরুরি।
ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলীদের শিক্ষাগত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ক্ষেত্র এক নয়; তাঁদের কাজের ধরনও দায়িত্ব অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই পদ ও দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, প্রযোজ্য বিধিমালা, কাজের জটিলতা এবং জননিরাপত্তাকে বিবেচনায় নিতে হবে।
নকশা প্রণয়ন, বিশ্লেষণ, গবেষণা, বাস্তবায়ন, তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত দক্ষতার প্রয়োজন। এক পক্ষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য পক্ষের অবদানকে খাটো করার প্রয়োজন নেই। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন এবং সহযোগিতার মাধ্যমে প্রকৌশল খাতে আরও কার্যকর কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
কর্মসংস্থান পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি
বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের চাহিদা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন সড়ক ও সেতু নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ বিতরণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণের ক্ষেত্রেও দক্ষ কারিগরি জনশক্তির প্রয়োজন বাড়ছে।
এই চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। কোন খাতে কতজন দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, কোন প্রযুক্তিগত দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে—এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা হলে পরিকল্পনা আরও বাস্তবসম্মত হবে।
সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠন যৌথভাবে কাজ করলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে। শিক্ষার্থীরা তখন কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে শিল্প ও অবকাঠামো খাতও পাবে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনবল।
প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে দক্ষতা হালনাগাদ অপরিহার্য
আধুনিক প্রকৌশল খাত দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। ডিজিটাল নকশা, আধুনিক জরিপ, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, উপকরণ পরীক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা হালনাগাদের সুযোগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক কর্মশালা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে তাঁদের সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করে শিল্প ও অবকাঠামো খাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করা প্রয়োজন।
দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে কাজের মান, উৎপাদনশীলতা, নিরাপত্তা এবং প্রকল্পের স্থায়িত্ব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। প্রশিক্ষিত জনবল যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে উন্নয়ন প্রকল্পের অপচয় কমানো এবং জনসম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগও বাড়বে।
অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে
পেশাগত মর্যাদা, ন্যায্য সুযোগ ও পদোন্নতির দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সততা, দক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতা। জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।
নির্মাণকাজে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ, উপকরণের গুণগত মান যাচাই, সঠিক পরিমাপ, কারিগরি নথি সংরক্ষণ এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। একই সঙ্গে কারিগরি পেশাজীবীদের এমন কর্মপরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব সততা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারেন।
যোগ্যতার স্বীকৃতি ও জবাবদিহি পরস্পরের পরিপূরক। যে পেশাজীবীকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাঁর সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ক্ষমতা ও উপকরণ থাকতে হবে। একই সঙ্গে কাজের মান ও সিদ্ধান্তের জন্য প্রযোজ্য বিধিমালা অনুযায়ী জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন কার্যকর উদ্যোগের প্রশ্ন
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পেশাগত অগ্রগতির প্রশ্নে কয়েকটি উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। প্রথমত, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির যোগ্যতা ও পরবর্তী শিক্ষাস্তরে যাওয়ার পথ সম্পর্কে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পদ, দায়িত্ব, নিয়োগবিধি এবং পদোন্নতির কাঠামো পর্যালোচনা। তৃতীয়ত, অবকাঠামো ও শিল্প খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জনবল চাহিদা নিরূপণ করে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান পরিকল্পনা গ্রহণ।
এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মক্ষেত্রভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে নিয়মিত সংলাপ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলী প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী সংগঠন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে আলোচনায় যুক্ত করা গেলে বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সহজ হবে।
নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত, জনবল চাহিদা, শিক্ষার মান, প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালাকে ভিত্তি করতে হবে। এতে সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং পেশাগত মতপার্থক্যের পরিবর্তে সমাধানমুখী আলোচনার পরিবেশ তৈরি হবে।
টেকসই উন্নয়নের স্বার্থেই দক্ষ জনশক্তির যথাযথ মূল্যায়ন
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত, প্রযুক্তিবান্ধব ও দায়িত্বশীল কারিগরি জনশক্তি। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এই জনশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন এবং পেশাগত অগ্রগতির পথ সুস্পষ্ট করা কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি দেশের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এ জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতিমালা, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, যোগ্যতাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা। একই সঙ্গে প্রকৌশল শিক্ষার মান, পেশাগত নৈতিকতা, জননিরাপত্তা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
উন্নয়নের নেপথ্যে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে অবকাঠামোর মান উন্নত হবে, কর্মক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির বিকাশ ঘটবে এবং জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তাই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী নীতিগত উদ্যোগ—যেখানে বিরোধ নয়, যোগ্যতা; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা; আর ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, প্রাধান্য পাবে জনস্বার্থ ও দেশের টেকসই উন্নয়ন।
লেখক: বাদল চৌধুরী
সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ০৫:৪৫:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
৪ বার পড়া হয়েছে

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ন্যায্য মর্যাদা ও উচ্চশিক্ষার দাবি -লেখক বাদল চৌধুরী

আপডেট সময় ০৫:৪৫:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

উন্নয়নের নেপথ্যের কারিগর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা, তবু উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত মর্যাদায় ন্যায্যতার প্রশ্ন
সড়ক-সেতু, বিদ্যুৎ, ভবন ও শিল্প অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছ পদোন্নতি ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি- লেখক বাদল চৌধুরী।
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক সড়ক, সেতু, কালভার্ট, বহুতল ভবন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানা। এসব অবকাঠামোর পেছনে রয়েছে পরিকল্পনা, নকশা, নির্মাণ, কারিগরি তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের বাস্তবায়ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, কারিগরি জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা দিয়ে তাঁরা উন্নয়ন প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দিতে অবদান রাখেন। অথচ তাঁদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ, কর্মজীবনে অগ্রগতি, পদোন্নতি এবং পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে আরও সুস্পষ্ট ও সময়োপযোগী নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে।
দেশের অবকাঠামো খাত যত সম্প্রসারিত হচ্ছে, ততই বাড়ছে দক্ষ কারিগরি জনশক্তির চাহিদা। শুধু প্রকল্প গ্রহণ কিংবা অর্থ বরাদ্দ করলেই উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত হয় না; নির্মাণকাজের গুণগত মান, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো কাজ সম্পন্ন করা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য শুধু কারিগরি শিক্ষা প্রদান যথেষ্ট নয়। শিক্ষার পর কর্মসংস্থান, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সুযোগ এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পেশাগত উন্নতির পথও সুস্পষ্ট হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি।
উন্নয়নের বাস্তবায়নে যাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
একটি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কারিগরি ধাপের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। মাটির অবস্থা যাচাই, নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান পরীক্ষা, পরিমাপ, কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং নির্ধারিত কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়। একইভাবে সেতু, কালভার্ট, সরকারি ভবন, পানি সরবরাহব্যবস্থা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা নির্মাণেও পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
প্রকল্পের ধরন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এসব কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণকাজের ত্রুটি শনাক্ত, উপকরণের অপচয় কমানো এবং কাজের অগ্রগতি মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে। তবে এ অবদানকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে দায়িত্বের পরিধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহির কাঠামোও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো একটি স্তরের দক্ষতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পরিকল্পনা ও নকশা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সঠিক বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ। প্রকৌশল পেশার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় যত বাড়বে, ততই উন্নয়নকাজে গুণগত মান ও দক্ষতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ: মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ
ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর অনেক শিক্ষার্থী উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখেন। কেউ বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করতে চান, কেউ গবেষণা ও উদ্ভাবনে যুক্ত হতে চান, আবার কেউ কর্মজীবনে আরও বড় দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের যোগ্যতা বাড়াতে আগ্রহী। তাঁদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ কতটা সহজলভ্য এবং পরবর্তী শিক্ষাস্তরে প্রবেশের পথ কতটা সুস্পষ্ট—এ প্রশ্ন কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী পাঠ্যক্রম, একাডেমিক প্রস্তুতি, বিষয়গত সামঞ্জস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-যোগ্যতা এবং শিক্ষার মান বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রিজ কোর্স, গণিত ও মৌলিক বিজ্ঞানের অতিরিক্ত প্রস্তুতি এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এতে যোগ্য শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ পাবেন, পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মানও বজায় রাখা যাবে।
এখানে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাগত ধারাবাহিকতার বাধাগুলো যুক্তিসংগতভাবে পর্যালোচনা করা। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ সুস্পষ্ট হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাবে দেশের শিল্প, নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতও।
চাকরি, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদায় চাই স্বচ্ছতা
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী উপযুক্ত পদ, দায়িত্ব এবং পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা। সরকারি প্রকৌশল বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ খাতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কারিগরি জনবলের ভূমিকা রয়েছে।
তবে কর্মসংস্থান ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ কার্যকর করতে হলে নিয়োগবিধি, অনুমোদিত পদ, শূন্যপদ, দায়িত্বের সীমা এবং পদোন্নতির শর্ত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একজন কর্মী কীভাবে অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হতে পারবেন, তা নির্ধারণে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় কাঠামো থাকা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল কাঠামো ও নিয়োগবিধি পর্যালোচনা করে কোথায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে, কোথায় পদোন্নতির জটিলতা আছে এবং কোন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন—তা নিরূপণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দাবি কিংবা গোষ্ঠীগত অবস্থানের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা, বাস্তব কর্মপরিধি, যোগ্যতা ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
বেসরকারি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতেও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে কর্মীদের পেশাগত আগ্রহ বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোও দক্ষ জনবল ধরে রাখতে পারবে।
ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলী: বিরোধ নয়, সমন্বয়ই হোক অগ্রাধিকার
প্রকৌশল পেশায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, পদবি, দায়িত্ব বণ্টন ও পদোন্নতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। এসব প্রশ্নের ন্যায্য সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দেশের উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে এ ধরনের মতপার্থক্যকে বিরোধে পরিণত না করে যুক্তিসংগত নীতিমালার মাধ্যমে সমাধান করা জরুরি।
ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলীদের শিক্ষাগত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ক্ষেত্র এক নয়; তাঁদের কাজের ধরনও দায়িত্ব অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই পদ ও দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, প্রযোজ্য বিধিমালা, কাজের জটিলতা এবং জননিরাপত্তাকে বিবেচনায় নিতে হবে।
নকশা প্রণয়ন, বিশ্লেষণ, গবেষণা, বাস্তবায়ন, তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত দক্ষতার প্রয়োজন। এক পক্ষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য পক্ষের অবদানকে খাটো করার প্রয়োজন নেই। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন এবং সহযোগিতার মাধ্যমে প্রকৌশল খাতে আরও কার্যকর কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
কর্মসংস্থান পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি
বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের চাহিদা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন সড়ক ও সেতু নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ বিতরণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণের ক্ষেত্রেও দক্ষ কারিগরি জনশক্তির প্রয়োজন বাড়ছে।
এই চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। কোন খাতে কতজন দক্ষ কর্মী প্রয়োজন, কোন প্রযুক্তিগত দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে—এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা হলে পরিকল্পনা আরও বাস্তবসম্মত হবে।
সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠন যৌথভাবে কাজ করলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে। শিক্ষার্থীরা তখন কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে শিল্প ও অবকাঠামো খাতও পাবে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনবল।
প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে দক্ষতা হালনাগাদ অপরিহার্য
আধুনিক প্রকৌশল খাত দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। ডিজিটাল নকশা, আধুনিক জরিপ, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, উপকরণ পরীক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা হালনাগাদের সুযোগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক কর্মশালা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে তাঁদের সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করে শিল্প ও অবকাঠামো খাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করা প্রয়োজন।
দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে কাজের মান, উৎপাদনশীলতা, নিরাপত্তা এবং প্রকল্পের স্থায়িত্ব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। প্রশিক্ষিত জনবল যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে উন্নয়ন প্রকল্পের অপচয় কমানো এবং জনসম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগও বাড়বে।
অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে
পেশাগত মর্যাদা, ন্যায্য সুযোগ ও পদোন্নতির দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সততা, দক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতা। জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।
নির্মাণকাজে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ, উপকরণের গুণগত মান যাচাই, সঠিক পরিমাপ, কারিগরি নথি সংরক্ষণ এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। একই সঙ্গে কারিগরি পেশাজীবীদের এমন কর্মপরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব সততা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারেন।
যোগ্যতার স্বীকৃতি ও জবাবদিহি পরস্পরের পরিপূরক। যে পেশাজীবীকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাঁর সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ক্ষমতা ও উপকরণ থাকতে হবে। একই সঙ্গে কাজের মান ও সিদ্ধান্তের জন্য প্রযোজ্য বিধিমালা অনুযায়ী জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন কার্যকর উদ্যোগের প্রশ্ন
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পেশাগত অগ্রগতির প্রশ্নে কয়েকটি উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। প্রথমত, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির যোগ্যতা ও পরবর্তী শিক্ষাস্তরে যাওয়ার পথ সম্পর্কে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পদ, দায়িত্ব, নিয়োগবিধি এবং পদোন্নতির কাঠামো পর্যালোচনা। তৃতীয়ত, অবকাঠামো ও শিল্প খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জনবল চাহিদা নিরূপণ করে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান পরিকল্পনা গ্রহণ।
এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মক্ষেত্রভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে নিয়মিত সংলাপ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলী প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী সংগঠন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে আলোচনায় যুক্ত করা গেলে বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সহজ হবে।
নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত, জনবল চাহিদা, শিক্ষার মান, প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালাকে ভিত্তি করতে হবে। এতে সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং পেশাগত মতপার্থক্যের পরিবর্তে সমাধানমুখী আলোচনার পরিবেশ তৈরি হবে।
টেকসই উন্নয়নের স্বার্থেই দক্ষ জনশক্তির যথাযথ মূল্যায়ন
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত, প্রযুক্তিবান্ধব ও দায়িত্বশীল কারিগরি জনশক্তি। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা এই জনশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন এবং পেশাগত অগ্রগতির পথ সুস্পষ্ট করা কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি দেশের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এ জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতিমালা, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, যোগ্যতাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা। একই সঙ্গে প্রকৌশল শিক্ষার মান, পেশাগত নৈতিকতা, জননিরাপত্তা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
উন্নয়নের নেপথ্যে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে অবকাঠামোর মান উন্নত হবে, কর্মক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির বিকাশ ঘটবে এবং জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তাই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদার প্রশ্নে এখন প্রয়োজন সময়োপযোগী নীতিগত উদ্যোগ—যেখানে বিরোধ নয়, যোগ্যতা; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা; আর ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, প্রাধান্য পাবে জনস্বার্থ ও দেশের টেকসই উন্নয়ন।
লেখক: বাদল চৌধুরী
সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড