ঢাকা ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন দিনের ছুটিতে সাড়ে তিন বছর বিদেশে প্রধান শিক্ষক

নিজস্ব সংবাদ :

তিন দিনের ছুটি, সাড়ে তিন বছর বিদেশে—সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক কোথায়?
অনুমতি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের অভিযোগ, ২০২২ সালেই চিঠি; তবু এখনো শূন্য হয়নি পদ
নিজস্ব প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুর
মাত্র তিন দিনের ছুটি। সেই ছুটির মেয়াদ শেষ হয়েছে বহু আগেই। কিন্তু কর্মস্থলে ফেরেননি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমির প্রধান শিক্ষক মো. জিল্লুর রহমান। বিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার পর থেকে তিনি আর বিদ্যালয়ে যোগ দেননি। এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন বছর। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিদেশে অবস্থানের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছিলেন কি না। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেই অনুমতিও তিনি নেননি।
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এর আগেও ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। প্রায় পাঁচ মাস চার দিন পর দেশে ফেরেন। ওই সময় বিদ্যালয় থেকে দুই মাসের ছুটি নেওয়া হলেও বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশে ফেরার পর তিনি সরকারি বেতন-ভাতাও গ্রহণ করেছেন বলে বিদ্যালয় সূত্রের দাবি।
তিন দিনের ছুটির পর কী হলো?
বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২২ আগস্ট থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। পরদিন ২৩ আগস্ট তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। কিন্তু তিন দিনের ছুটি শেষ হওয়ার পরও তিনি কর্মস্থলে ফেরেননি।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ছুটি শেষ হওয়ার পর তিনি কি নতুন করে ছুটির আবেদন করেছিলেন? করে থাকলে সেটি কে অনুমোদন করেছেন? বিদেশে অবস্থানের অনুমতি কি পরে দেওয়া হয়েছিল? তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে কোন বিধির আওতায় রাখা হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র প্রকাশ্যে আনা জরুরি।
২০২২ সালেই প্রশাসনের নজরে
প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রশাসনের নজরের বাইরে ছিল না। ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন দাশ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
অর্থাৎ একজন সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থান করছেন—এমন অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে চিঠি যাওয়ার পরও পরবর্তী সাড়ে তিন বছরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
চিঠির পর তদন্ত হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে প্রতিবেদন কী বলেছে, কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল কি না—এসব তথ্য সামনে আসেনি।
পদটি এখনো শূন্য নয় কেন?
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও জিল্লুর রহমানের পদটি এখনো শূন্য ঘোষণা করা হয়নি। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা ফারুকী জানিয়েছেন, তাঁরা জিল্লুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন; কিন্তু যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিনি কবে বিদ্যালয়ে যোগ দেবেন, সেটিও নিশ্চিত নয়।
এখানেই প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন প্রধান শিক্ষক বছরের পর বছর কর্মস্থলে না থেকেও যদি পদে বহাল থাকেন, তাহলে তাঁর দায়িত্ব কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হচ্ছে—এ বিষয়ে শিক্ষা বিভাগের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়
রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ফলে প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতি কোনো ব্যক্তিগত চাকরিগত বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে একটি বড় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও শিক্ষা কার্যক্রমে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় প্রশাসনিক কাজে নানা সংকট তৈরি হয়েছে। নেতৃত্বের অনুপস্থিতির প্রভাব শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও পড়ছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন।
শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন
অভিভাবকদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার কথা। অভিভাবক জাকির হোসেন ও রাজিব হোসেন জানান, কয়েক বছর আগেও বিদ্যালয়টির এসএসসি ফল ভালো ছিল এবং সেখানে সন্তান ভর্তি করাতে অভিভাবকদের আগ্রহ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে।
তবে শিক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। এর জন্য শিক্ষকসংখ্যা, পাঠদানের মান, ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার ফলাফলসহ অন্যান্য বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন।
এবার প্রয়োজন নথির তদন্ত
এই ঘটনার প্রকৃত সত্য বের করতে মুখের কথার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অন্তত পাঁচটি বিষয় যাচাই করা—
এক. ২০২২ সালের তিন দিনের ছুটির আবেদন ও অনুমোদনপত্র।
দুই. ২৩ আগস্ট ২০২২-এর পর বিদেশে অবস্থানের কোনো অনুমোদন বা বর্ধিত ছুটি ছিল কি না।
তিন. তাঁর উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির সরকারি রেকর্ড।
চার. ২০২১ ও ২০২২ সালের বিদেশযাত্রার সময় বেতন-ভাতা গ্রহণের তথ্য।
পাঁচ. ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রশাসনের পাঠানো চিঠির পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
এই পাঁচটি নথি সামনে এলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
ইউএনওর বক্তব্য কী?
রায়পুরের বর্তমান ইউএনও মেহেদী হাসান কাউসার বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ যেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জিল্লুর রহমান বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুমতি নেননি। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে মো. জিল্লুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে WhatsApp ও Messenger-এ যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বিদেশে অবস্থানের কারণ, ছুটি বা অনুমোদনের বিষয়ে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন এখন একটাই—জবাবদিহি কোথায়?
একজন সরকারি প্রধান শিক্ষক তিন দিনের ছুটি নিয়ে সাড়ে তিন বছর কর্মস্থলের বাইরে—এমন ঘটনা সত্য হলে এটি নিছক একজন কর্মকর্তার অনুপস্থিতির বিষয় নয়। এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছুটি ব্যবস্থাপনা, বিদেশযাত্রার অনুমোদন, উপস্থিতি তদারকি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় প্রশ্ন সামনে আনে।
আর যদি কোনো পর্যায়ে তাঁর দীর্ঘ বিদেশ অবস্থানের অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই অনুমোদনের কপি প্রকাশ করাও জরুরি। কারণ জনস্বার্থের প্রশ্নটি এখানেই—কোন নিয়মে, কার অনুমতিতে এবং কোন প্রক্রিয়ায় একজন সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলের বাইরে থেকেও পদে বহাল রয়েছেন?
প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেখানে জড়িত, সেখানে বিষয়টি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। প্রশাসনের নথি, শিক্ষা বিভাগের সিদ্ধান্ত এবং প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য—সব পক্ষের তথ্য সামনে এলেই পরিষ্কার হবে, এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির পেছনে আসলে কী ঘটেছিল।
তিন দিনের ছুটি থেকে সাড়ে তিন বছরের অনুপস্থিতি—এই সময়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তের হিসাব এখন জনসমক্ষে আসার অপেক্ষায়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ১০:৫৬:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
১ বার পড়া হয়েছে

তিন দিনের ছুটিতে সাড়ে তিন বছর বিদেশে প্রধান শিক্ষক

আপডেট সময় ১০:৫৬:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

তিন দিনের ছুটি, সাড়ে তিন বছর বিদেশে—সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক কোথায়?
অনুমতি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের অভিযোগ, ২০২২ সালেই চিঠি; তবু এখনো শূন্য হয়নি পদ
নিজস্ব প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুর
মাত্র তিন দিনের ছুটি। সেই ছুটির মেয়াদ শেষ হয়েছে বহু আগেই। কিন্তু কর্মস্থলে ফেরেননি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমির প্রধান শিক্ষক মো. জিল্লুর রহমান। বিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার পর থেকে তিনি আর বিদ্যালয়ে যোগ দেননি। এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন বছর। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিদেশে অবস্থানের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছিলেন কি না। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেই অনুমতিও তিনি নেননি।
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এর আগেও ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। প্রায় পাঁচ মাস চার দিন পর দেশে ফেরেন। ওই সময় বিদ্যালয় থেকে দুই মাসের ছুটি নেওয়া হলেও বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশে ফেরার পর তিনি সরকারি বেতন-ভাতাও গ্রহণ করেছেন বলে বিদ্যালয় সূত্রের দাবি।
তিন দিনের ছুটির পর কী হলো?
বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২২ আগস্ট থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। পরদিন ২৩ আগস্ট তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। কিন্তু তিন দিনের ছুটি শেষ হওয়ার পরও তিনি কর্মস্থলে ফেরেননি।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ছুটি শেষ হওয়ার পর তিনি কি নতুন করে ছুটির আবেদন করেছিলেন? করে থাকলে সেটি কে অনুমোদন করেছেন? বিদেশে অবস্থানের অনুমতি কি পরে দেওয়া হয়েছিল? তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে কোন বিধির আওতায় রাখা হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র প্রকাশ্যে আনা জরুরি।
২০২২ সালেই প্রশাসনের নজরে
প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রশাসনের নজরের বাইরে ছিল না। ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন দাশ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
অর্থাৎ একজন সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থান করছেন—এমন অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে চিঠি যাওয়ার পরও পরবর্তী সাড়ে তিন বছরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
চিঠির পর তদন্ত হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে প্রতিবেদন কী বলেছে, কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল কি না—এসব তথ্য সামনে আসেনি।
পদটি এখনো শূন্য নয় কেন?
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও জিল্লুর রহমানের পদটি এখনো শূন্য ঘোষণা করা হয়নি। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা ফারুকী জানিয়েছেন, তাঁরা জিল্লুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন; কিন্তু যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিনি কবে বিদ্যালয়ে যোগ দেবেন, সেটিও নিশ্চিত নয়।
এখানেই প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন প্রধান শিক্ষক বছরের পর বছর কর্মস্থলে না থেকেও যদি পদে বহাল থাকেন, তাহলে তাঁর দায়িত্ব কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হচ্ছে—এ বিষয়ে শিক্ষা বিভাগের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়
রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ফলে প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতি কোনো ব্যক্তিগত চাকরিগত বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে একটি বড় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও শিক্ষা কার্যক্রমে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় প্রশাসনিক কাজে নানা সংকট তৈরি হয়েছে। নেতৃত্বের অনুপস্থিতির প্রভাব শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও পড়ছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন।
শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন
অভিভাবকদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার কথা। অভিভাবক জাকির হোসেন ও রাজিব হোসেন জানান, কয়েক বছর আগেও বিদ্যালয়টির এসএসসি ফল ভালো ছিল এবং সেখানে সন্তান ভর্তি করাতে অভিভাবকদের আগ্রহ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে।
তবে শিক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। এর জন্য শিক্ষকসংখ্যা, পাঠদানের মান, ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার ফলাফলসহ অন্যান্য বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন।
এবার প্রয়োজন নথির তদন্ত
এই ঘটনার প্রকৃত সত্য বের করতে মুখের কথার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অন্তত পাঁচটি বিষয় যাচাই করা—
এক. ২০২২ সালের তিন দিনের ছুটির আবেদন ও অনুমোদনপত্র।
দুই. ২৩ আগস্ট ২০২২-এর পর বিদেশে অবস্থানের কোনো অনুমোদন বা বর্ধিত ছুটি ছিল কি না।
তিন. তাঁর উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির সরকারি রেকর্ড।
চার. ২০২১ ও ২০২২ সালের বিদেশযাত্রার সময় বেতন-ভাতা গ্রহণের তথ্য।
পাঁচ. ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রশাসনের পাঠানো চিঠির পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
এই পাঁচটি নথি সামনে এলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
ইউএনওর বক্তব্য কী?
রায়পুরের বর্তমান ইউএনও মেহেদী হাসান কাউসার বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ যেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জিল্লুর রহমান বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুমতি নেননি। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে মো. জিল্লুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে WhatsApp ও Messenger-এ যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বিদেশে অবস্থানের কারণ, ছুটি বা অনুমোদনের বিষয়ে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন এখন একটাই—জবাবদিহি কোথায়?
একজন সরকারি প্রধান শিক্ষক তিন দিনের ছুটি নিয়ে সাড়ে তিন বছর কর্মস্থলের বাইরে—এমন ঘটনা সত্য হলে এটি নিছক একজন কর্মকর্তার অনুপস্থিতির বিষয় নয়। এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছুটি ব্যবস্থাপনা, বিদেশযাত্রার অনুমোদন, উপস্থিতি তদারকি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় প্রশ্ন সামনে আনে।
আর যদি কোনো পর্যায়ে তাঁর দীর্ঘ বিদেশ অবস্থানের অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই অনুমোদনের কপি প্রকাশ করাও জরুরি। কারণ জনস্বার্থের প্রশ্নটি এখানেই—কোন নিয়মে, কার অনুমতিতে এবং কোন প্রক্রিয়ায় একজন সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলের বাইরে থেকেও পদে বহাল রয়েছেন?
প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেখানে জড়িত, সেখানে বিষয়টি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। প্রশাসনের নথি, শিক্ষা বিভাগের সিদ্ধান্ত এবং প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য—সব পক্ষের তথ্য সামনে এলেই পরিষ্কার হবে, এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির পেছনে আসলে কী ঘটেছিল।
তিন দিনের ছুটি থেকে সাড়ে তিন বছরের অনুপস্থিতি—এই সময়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তের হিসাব এখন জনসমক্ষে আসার অপেক্ষায়।