স্বামী স্ত্রী ঝগড়ার ক্ষোভে দুই সন্তানকে হত্যা, বাবা আটক
ঝগড়ার ক্ষোভে দুই সন্তানকে দুই হাওরে ফেলে হত্যা: দিরাইয়ে বাবার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ
দিরাই (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পারিবারিক কলহ ও ক্ষোভের জেরে নিজের দুই শিশুসন্তানকে হাওরে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বাবা কামরুল মিয়ার বিরুদ্ধে। নিখোঁজের কয়েক দিন পর পৃথক দুটি হাওর থেকে ৭ বছর বয়সী ছেলে মুহাদ্দিস মিয়া ও ৪ বছর বয়সী মেয়ে তুলনা আক্তারের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এ ঘটনায় শিশু দুটির বাবা কামরুল মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিরাই উপজেলার শ্যামারচর মধুপুর গ্রামের কামরুল মিয়ার দুই সন্তান মুহাদ্দিস ও তুলনা গত শনিবার থেকে নিখোঁজ ছিল। সন্তানদের নিখোঁজের পর তাদের বাবা স্থানীয়দের জানান, শিশুরা কোথায় গেছে তিনি জানেন না এবং তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও বিভিন্ন স্থানে শিশু দুটির সন্ধানে তল্লাশি শুরু করেন।
তবে শিশু দুটির নিখোঁজের ঘটনায় কামরুল মিয়ার কথাবার্তা ও আচরণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। একপর্যায়ে মঙ্গলবার গ্রামবাসী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন তিনি পরদিন সকালে সন্তান দুটির বিষয়ে জানাবেন বলে জানান।
বুধবার সকালে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে কামরুল মিয়া তার দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেন বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। পরে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পৃথক দুটি স্থান থেকে শিশু দুটির মরদেহ উদ্ধারের অভিযান শুরু হয়।
পুলিশ জানায়, দিরাই-সিলেট সড়কের মদনপুর এলাকার দেখার হাওর এবং জাউয়া এলাকা-সংলগ্ন একটি হাওর থেকে পৃথকভাবে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই পরিবারের দুই শিশুর মরদেহ দুই স্থান থেকে উদ্ধারের ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত মুহাদ্দিস মিয়া ছিল ৭ বছরের শিশু। আর তার ছোট বোন তুলনা আক্তারের বয়স ছিল মাত্র ৪ বছর। যে বয়সে তাদের খেলাধুলা, পড়াশোনা আর পরিবারের ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই তাদের এমন করুণ পরিণতি স্থানীয়দের হৃদয় নাড়া দিয়েছে।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, পারিবারিক বিরোধ থেকেই এ হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে। দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, কামরুল মিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে তার মায়ের পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। ওই বিরোধের জেরে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই দুই সন্তানকে হাওরে ফেলে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
তবে পুলিশের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক কলহের বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, কিংবা এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না—সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—পারিবারিক বিরোধের দায় কেন নিতে হলো দুই নিষ্পাপ শিশুকে? স্বামী-স্ত্রী, শ্বশুরবাড়ি কিংবা পরিবারের বড়দের মধ্যে বিরোধ থাকলেও তার বোঝা কখনোই শিশুদের ওপর চাপানো যায় না। একটি পারিবারিক দ্বন্দ্ব কীভাবে মুহূর্তের ক্ষোভে দুটি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো ভয়াবহ পরিণতিতে পৌঁছাতে পারে, দিরাইয়ের এই ঘটনা সেই নির্মম বাস্তবতাই সামনে এনেছে।
মরদেহ দুটি উদ্ধারের পর সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। এলাকার মানুষের একটাই প্রশ্ন—যে দুই শিশু পরিবারের আশ্রয় ও নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাদেরই কেন এমন ভয়াবহ পরিণতি হলো?
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তের সব দিক খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে অভিযুক্ত কামরুল মিয়াকে আদালতে পাঠানো হবে।
দিরাইয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি পারিবারিক কলহ, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষোভ এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সমাজের জন্যও গভীর সতর্কবার্তা।



















