যে হাতে একদিন বর্ণমালার হাতেখড়ি, সেই শিক্ষক আজ বার্ধক্যে নীরব! ছাত্র তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষকের হৃদয়জুড়ে শুধু দেশ ও মানুষের কল্যাণের প্রার্থনা।
যাঁর হাতে শৈশবের হাতেখড়ি, সেই শিক্ষক আজ বার্ধক্যে নীরবে! প্রধানমন্ত্রীর প্রথম শিক্ষকের জীবনে স্মৃতির আলো, বাস্তবতায় নিঃসঙ্গতা
ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে আজ তাঁর একসময়ের ছাত্র, অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কোনো দাবি নেই শিক্ষকের—নেই পদ-পদবি, নেই অর্থের প্রত্যাশা; শুধু একটি প্রার্থনা, দেশটা যেন সুন্দর হয়, মানুষের কল্যাণ হয়
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একবার কল্পনা করুন, যে মানুষটি আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী দায়িত্বে অধিষ্ঠিত, যাঁর একটি সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকে কোটি মানুষের প্রত্যাশা, সেই মানুষটিই একদিন ছিল ছোট্ট একটি শিশু। হাতে বই, চোখে বিস্ময়, মনে হাজারো প্রশ্ন। আর সেই শিশুটির হাত ধরে প্রথম অক্ষর চিনিয়েছিলেন একজন শিক্ষক। শিখিয়েছিলেন বর্ণমালা, শিখিয়েছিলেন জীবনের প্রথম পাঠ।
সময় কত দ্রুত বদলে যায়! সেই ছোট্ট শিশুটি আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আর তাঁর শৈশবের স্মৃতি বুকে নিয়ে জীবনের শেষ অধ্যায় পার করছেন শিক্ষক কাজী আব্দুর রশিদ। বরগুনার পাথরঘাটা পৌর শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের একটি সাধারণ বাড়িতে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কাটছে তাঁর বর্তমান জীবন।
এ যেন সময়ের এক আবেগঘন অধ্যায়। একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব, অন্যদিকে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন শিক্ষক। যাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ কিংবা ক্ষমতা নয়, বরং অসংখ্য শিক্ষার্থীর মুখে ফুটে ওঠা সাফল্যের হাসি।
১৯৭২ সালের স্মৃতি, ছোট্ট ‘পিনু’ আর একজন শিক্ষকের ভালোবাসা
কাজী আব্দুর রশিদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করতেন। সে সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ছোট্ট এক শিশুর। শিশুটিকে সবাই আদর করে ‘পিনু’ নামে ডাকতেন বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই শিশুই আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শিক্ষক কাজী আব্দুর রশিদের স্মৃতিতে শিশুটি ছিল অত্যন্ত চটপটে, বুদ্ধিমান ও কৌতূহলী। ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আজও তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় একধরনের আনন্দ ও আবেগ।
একজন শিক্ষকের কাছে ছাত্রের পরিচয় কখনো শুধু নাম কিংবা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ছাত্র যত বড়ই হোক, শিক্ষকের স্মৃতিতে সে অনেক সময় সেই ছোট্ট শিশুটিই থেকে যায়, যে একদিন প্রথম অক্ষর চিনতে শিখেছিল।
আজ তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কাজী আব্দুর রশিদের স্মৃতিতে তিনি এখনো সেই শৈশবের ‘পিনু’।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাড়িতে আগমন: সাধারণ ঘরে অসাধারণ এক স্মৃতি
এই শিক্ষকের স্মৃতির ভান্ডারে রয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক সময়ের গল্প। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একসময় তাঁর সাধারণ বাসায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন।
সেদিনের সেই মুহূর্ত আজও ভুলতে পারেননি তিনি।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কাজী আব্দুর রশিদ জানান, জিয়াউর রহমান তাঁর বাসায় আসার খবর পেয়ে তিনি তাড়াহুড়ো করে বাজার থেকে রসগোল্লা, বিস্কুট ও চা নিয়ে আসেন। সামর্থ্য অনুযায়ী অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন করেন।
কিন্তু তাঁর এই আয়োজন দেখে জিয়াউর রহমান নাকি কিছুটা অবাক হয়েছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এত আয়োজনের কী প্রয়োজন ছিল।
শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, বড় মানুষ তাঁর মতো সাধারণ একজন শিক্ষকের বাড়িতে এসেছেন, তাই সামান্য আয়োজন না করলে হয় কীভাবে!
জিয়াউর রহমান তখন মিষ্টি মুখে দিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, মিষ্টি না দিলেও চলত।
ঘটনাটি বলতে গিয়ে শিক্ষক আজও হাসেন। তাঁর স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান ছিলেন সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন মানুষ। বড় পদে থেকেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশতে পারার সেই স্মৃতি তাঁর কাছে আজও মূল্যবান।
জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন মানুষ গড়ার কাজে
শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব। একজন চিকিৎসক মানুষের জীবন বাঁচান, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন, আর একজন শিক্ষক তৈরি করেন সেই মানুষগুলোকে, যাঁরা একদিন সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন।
কাজী আব্দুর রশিদ তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তাঁর ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বহু পরিচিত ব্যক্তিত্ব। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির নামও তিনি উল্লেখ করেছেন।
একসময় যাঁদের হাতে খাতা-কলম তুলে দিয়েছেন, যাঁদের ভুল শুধরে দিয়েছেন, যাঁদের শাসন করেছেন, আবার স্নেহ দিয়ে আগলে রেখেছেন, তাঁদের অনেকেই আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠিত মানুষগুলোর সাফল্যের আড়ালে কত শিক্ষকের নিঃশব্দ ত্যাগ, কত রাত জাগা পরিশ্রম, কত না বলা কষ্ট জমে থাকে, তার হিসাব কে রাখে?
একজন শিক্ষক যখন তাঁর ছাত্রের সাফল্যের কথা বলেন, তখন তাঁর চোখে নিজের জীবনের অর্জনই যেন প্রতিফলিত হয়।
বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর, কিন্তু স্মৃতিতে আজও অমলিন সোনালি দিন
সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। একদিন যিনি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে পাঠদান করতেন, যাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, যাঁর চোখে ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, আজ বয়সের ভারে সেই মানুষটির চলাফেরাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
পাথরঘাটা পৌর শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সাদামাটা জীবনযাপন করছেন কাজী আব্দুর রশিদ। শরীর আগের মতো সঙ্গ দেয় না। ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে কষ্ট হয় বলে জানা গেছে।
তবুও স্মৃতির দরজা খুলে গেলে যেন ফিরে যান সেই পুরোনো দিনগুলোতে। মনে পড়ে শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষার্থীদের মুখ, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, আর সেই ছোট্ট শিশুটির কথা—যে একদিন তাঁর সামনে বসে প্রথম অক্ষর চিনেছিল।
একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে যে তাঁর কোনো একসময়ের শিক্ষার্থী আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করছেন!
প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিক্ষকের কোনো দাবি নেই, আছে শুধু দেশ ও মানুষের জন্য প্রার্থনা
সবচেয়ে আবেগের বিষয় হলো, নিজের একসময়ের ছাত্র আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী—এ কথা স্মরণ করেও কাজী আব্দুর রশিদের কণ্ঠে কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়নি।
তিনি কোনো পদ চান না, কোনো বিশেষ সুবিধা চান না, ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশাও করেন না বলে জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে শুধু একজন শিক্ষকের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও শুভকামনা।
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, তাঁর নিজের কিছু চাওয়ার নেই। তিনি শুধু দোয়া করেন, আল্লাহ যেন তাঁর ছাত্রকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করার তৌফিক দেন। তিনি যেন দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারেন এবং দেশের মানুষের উপকার করতে পারেন।
কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু একজন শিক্ষকের হৃদয়ের গভীরতা বোঝার জন্য এই কয়েকটি বাক্যই যথেষ্ট।
যে শিক্ষক একসময় একটি শিশুর হাতে কলম তুলে দিয়েছিলেন, আজ সেই শিশুর হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব। অথচ নিজের জন্য তাঁর প্রার্থনা নেই; প্রার্থনা শুধু দেশের জন্য, মানুষের জন্য।
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন: মানুষ গড়ার কারিগরদের শেষ বয়সের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
এই ঘটনাটি কেবল একজন শিক্ষক ও তাঁর ছাত্রের আবেগঘন সম্পর্কের গল্প নয়। এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষকসমাজের মর্যাদা এবং প্রবীণ শিক্ষকদের জীবনমান নিয়েও নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে।
যাঁরা জীবনের সেরা সময়টি ব্যয় করেছেন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে, তাঁদের বার্ধক্য যেন অবহেলা, অসুস্থতা কিংবা আর্থিক অনিশ্চয়তায় না কাটে—এ দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও।
প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা কিংবা সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের পেছনে কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান থাকে। তাঁদের অনেকেই হয়তো আজ নিভৃতে জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁদের খোঁজ নেওয়া, সম্মান জানানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
কাজী আব্দুর রশিদের ক্ষেত্রে তাঁর স্মৃতিচারণের সত্যতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং জীবনযাপনের বাস্তব পরিস্থিতিও সরেজমিনে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একজন শিক্ষকের সম্মান মানে পুরো শিক্ষকসমাজের সম্মান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা, তাঁর শৈশবের শিক্ষক কাজী আব্দুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হলে তিনি যেন তাঁর খোঁজ নেন। একজন প্রবীণ শিক্ষককে সম্মান জানানো কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি মানবিকতা, কৃতজ্ঞতা ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিচয়।
তাঁর প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ, একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের অক্ষর শেখান না; তিনি মানুষের বিবেক তৈরি করেন, চরিত্র গঠন করেন, স্বপ্ন দেখতে শেখান।
আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিচারক কিংবা সমাজের নেতৃত্বদানকারী মানুষ। আর তাঁদের প্রত্যেকের পেছনে কোনো না কোনো শিক্ষকের নিরলস পরিশ্রম জড়িয়ে থাকে।
শেষ কথা
একদিন হয়তো কাজী আব্দুর রশিদের শ্রেণিকক্ষের সেই ছোট্ট শিশুটি বড় হয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছে। সময়ের ব্যবধানে ছাত্র ও শিক্ষকের অবস্থান বদলেছে, বদলেছে পরিচয় ও পরিসর। কিন্তু শিক্ষকের হৃদয়ে ছাত্রের জন্য যে স্নেহ, তা বদলায়নি।
একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রের কাছে কখনো প্রতিদান চান না। তিনি চান, তাঁর ছাত্র ভালো থাকুক, মানুষ ভালো থাকুক, দেশ ভালো থাকুক।
কাজী আব্দুর রশিদের এই প্রার্থনাই যেন আমাদের সমাজের জন্য এক অনন্য শিক্ষা।
যে হাতে একদিন বর্ণমালা শিখেছিল একটি শিশু, সেই হাতের অবদান কোনো রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা দিয়ে মাপা যায় না। একজন শিক্ষককে সম্মান জানানো মানে নিজের শিকড়কে সম্মান জানানো।
শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি, যাঁরা নীরবে মানুষ গড়েন, অথচ নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে অনেক সময় নীরবেই থেকে যান।











