অন্তর্বর্তী সময়ের চেয়ে দেশ এখন ভালো: তথ্য উপদেষ্টা
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
নৈরাজ্য নেই, অন্তর্বর্তী সময়ের চেয়ে দেশ ভালো—সরকারের দাবি কতটা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে?
অপরাধ কমেছে, আবার বেড়েছেও—তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে উঠছে তুলনামূলক চিত্রের প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে যখন নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে, ঠিক তখনই সরকারের পক্ষ থেকে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ভালো এবং দেশে এখন নৈরাজ্য নেই।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে—দেশে অপরাধ ঘটছে এবং কোনো কোনো ধরনের অপরাধ আগের তুলনায় বেড়েছে, আবার কোনো কোনো অপরাধ কমেছেও। অর্থাৎ সরকারের মূল্যায়ন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একমাত্রিক নয়; অপরাধের ধরনভেদে চিত্র ভিন্ন।
‘নৈরাজ্য নেই’—কোন সূচকে পরিবর্তন?
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘নৈরাজ্য’ ও ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’কে আলাদা করে দেখার চেষ্টা। তিনি বলেন, কিছু অপরাধ বেড়েছে, কিছু কমেছে; তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ‘এনার্কি’র অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তথ্যের প্রশ্ন। একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নে শুধু মোট অপরাধের সংখ্যা নয়—হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা নিষ্পত্তি, গ্রেপ্তার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতির মতো একাধিক সূচক বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগের সময়ের তুলনায় কিছু অপরাধ কমেছে এবং কিছু বেড়েছে। ফলে কোন অপরাধ কত শতাংশ কমেছে বা বেড়েছে, কোন সময়ের সঙ্গে কোন সময়ের তথ্য তুলনা করা হয়েছে—সেই পূর্ণাঙ্গ ডেটাসেট প্রকাশ্যে থাকলে সরকারের দাবিটি আরও যাচাইযোগ্য হয়ে উঠবে।
‘সরকার খুব খারাপ করছে না’—দাবির পাশাপাশি স্বীকারোক্তিও
তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন, তুলনামূলকভাবে সরকার খুব খারাপ করছে বলে তিনি মনে করেন না। একই সঙ্গে তিনি পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব পালনে কোথাও গাফিলতি বা ব্যত্যয় ঘটছে না—এমন দাবিও করেননি। বরং কোথাও দায়িত্বে অবহেলা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারের অবস্থানের দুটি দিক সামনে আসে। একদিকে সরকার বর্তমান পরিস্থিতিকে আগের তুলনায় উন্নত হিসেবে তুলে ধরছে; অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা বা দায়িত্বে অবহেলার সম্ভাবনাও স্বীকার করছে।
সুতরাং প্রশ্নটি শুধু ‘দেশ ভালো আছে কি না’—এতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি পরিমাপের জন্য সরকার কোন নির্দিষ্ট সূচক ব্যবহার করছে এবং সেই তথ্য জনগণের সামনে কতটা স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
অতীতের সঙ্গে তুলনা কতটা কার্যকর?
তথ্য উপদেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় পুলিশ বাহিনী দুর্বল অবস্থায় ছিল এবং বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটেছিল; বর্তমানে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তিনি মাজার ভাঙচুর, মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধের ঘোষণা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের মতো ঘটনাগুলোরও উল্লেখ করেন।
তবে অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—একটি সরকারের বর্তমান কর্মদক্ষতা শুধু পূর্ববর্তী সরকারের তুলনায় বিচার করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। জনগণের নিরাপত্তা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, পুলিশের জবাবদিহি এবং বিচার পাওয়ার সুযোগ—এসবের বর্তমান বাস্তবতাও আলাদাভাবে পরিমাপ করা জরুরি।
অর্থাৎ ‘আগের চেয়ে ভালো’ এবং ‘বর্তমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক’—দুটি বক্তব্য এক নয়। প্রথমটি তুলনামূলক দাবি, দ্বিতীয়টি বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে
তথ্য উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘পারসেপশন’ গুরুত্বপূর্ণ হলেও ছয় মাসের সঙ্গে আগের ছয় মাসের তথ্য তুলনা করলে অপরাধের চিত্র মিশ্র।
এখানেই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ—পরিসংখ্যান ও মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো।
কারণ কোনো এলাকায় অপরাধের সংখ্যা কমলেও যদি মানুষ নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে, তাহলে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে সেই উদ্বেগ দূর করা কঠিন। আবার কোনো ঘটনার ব্যাপক প্রচার হলেও সামগ্রিক অপরাধের হার কমে থাকতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে সরকারি পরিসংখ্যান, মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি এবং নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধ—সবকিছুকেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
পুলিশের ভূমিকা ও জবাবদিহিই এখন বড় পরীক্ষা
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজন হলে পুলিশ তাদের কার্যক্রম আরও বাড়াবে এবং রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে আইনগত সীমার মধ্যে থেকে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
অর্থাৎ সরকারের বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোরতার পাশাপাশি আইনি কাঠামোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির প্রয়োগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
কোনো অপরাধ ঘটার পর গ্রেপ্তার করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্তের নিরপেক্ষতা, নিরপরাধ ব্যক্তির সুরক্ষা এবং আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতি ও জনজীবনের চাপও পরিস্থিতির অংশ
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং এতে সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে বলে তথ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে ৫৫ লাখ মানুষের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চলার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নে শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নয়, বাজার পরিস্থিতি ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানের কেন্দ্রে এখন তিনটি প্রশ্ন
সরকারের বক্তব্যকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, অন্তর্বর্তী সময়ের তুলনায় কোন কোন অপরাধ কমেছে এবং কোনগুলো বেড়েছে?
দ্বিতীয়ত, ‘দেশে নৈরাজ্য নেই’—এই মূল্যায়নের পেছনে কোন নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও সূচক রয়েছে?
তৃতীয়ত, যেসব ক্ষেত্রে পুলিশ বা প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠছে, সেসব ঘটনায় তদন্ত ও জবাবদিহির ফল কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সরকারি পরিসংখ্যান, স্বাধীন গবেষণা, মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য দিয়ে যাচাই করা গেলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি অধিকতর নিরপেক্ষ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
শেষ কথা
তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য সরকারের বর্তমান অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে—সরকার মনে করছে, অন্তর্বর্তী সময়ের তুলনায় দেশের পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে এবং বর্তমানে নৈরাজ্য নেই। একই সঙ্গে সরকার স্বীকার করছে, অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং অপরাধের ধরনভেদে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হওয়া উচিত যাচাইযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছ পরিসংখ্যান, আইনের শাসন, নাগরিক নিরাপত্তা এবং জবাবদিহির বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সরকার যে উন্নতির দাবি করছে, তার পক্ষে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনগণের সামনে কতটা উন্মুক্ত করা হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সেই তথ্যকে কতটা সমর্থন করছে।
সরকারের দাবি যেমন যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন, তেমনি সরকারের সমালোচনাও হওয়া উচিত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।



















