আগুন নিভেছে, ক্ষত নয়: মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছরে হৃদয়বিদারক বাস্তবতা
এক বছর পরও শুকায়নি মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত: বেঁচে ফেরাদের প্রতিদিনই এক নতুন যুদ্ধ
আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে রাজধানীর দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সেই বিভীষিকাময় দুর্ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে হাসি-আনন্দে ভরা একটি শিক্ষাঙ্গন পরিণত হয়েছিল শোক, আতঙ্ক আর অসহায়তার প্রতীকে। সময়ের ক্যালেন্ডারে একটি বছর পেরিয়ে গেলেও, সেই দিনের আগুনে পোড়া ক্ষত আজও বহন করছেন বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও তাদের পরিবার।
অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কারও হাত আর আগের মতো কাজ করে না, কারও মুখমণ্ডলে আগুনের দাগ চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। কেউ নিজের হাতে খাবার খেতে পারেন না, আবার কেউ মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি এড়াতে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দস্তানা বা মুখ ঢেকে চলেন। শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক আঘাতও তাদের প্রতিদিন তাড়া করে ফিরছে।
দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে বর্তমানে ৬৩ জন জীবিত রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, গুরুতর দগ্ধ রোগীদের সুস্থ হওয়ার পথ দীর্ঘ ও কঠিন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলেই চিকিৎসা শেষ হয় না; বরং বছরের পর বছর পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার, ফিজিওথেরাপি, আলোকচিকিৎসা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে মানসিক পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি এখনো অনেক শিশুর মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। কেউ বিদ্যালয়ে যেতে ভয় পায়, কেউ মানুষের সঙ্গে মিশতে চায় না, আবার কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের চিকিৎসা, ওষুধ, পুনর্বাসন ও যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, শুধু সহানুভূতি নয়—দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি প্রস্তুতি এবং মানবিক দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেন আর কখনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না ঘটে, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অঙ্গীকার।
এক বছর পরও সেই দিনের আগুন নিভে গেছে, কিন্তু অসংখ্য পরিবারের হৃদয়ে জ্বলছে শোক, বেদনা আর অপূরণীয় ক্ষতির স্মৃতি। নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যাশাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।










