সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ নয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন—সরকারের কাছে সাংবাদিক সমাজের জোরালো আহ্বান সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার অধিকার চাই—সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্র আর কত নীরব থাকবে? কি হবে সাংবাদিক সেজে! সত্য বলার স্বাধীনতা নেই, নিরাপত্তা নেই, মর্যাদা নেই—সাংবাদিক সুরক্ষা আইন এখনই চাই
কি হবে সাংবাদিক সেজে! কলম আছে, ক্যামেরা আছে, পরিচয়পত্র আছে—কিন্তু সাংবাদিকের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা কোথায়?
সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা, পেশাগত নিরাপত্তা ও জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া সাংবাদিকতা কত দিন টিকে থাকবে? সাংবাদিক সুরক্ষা আইন এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঢাকা, ৬ নভেম্বর ২০২৬:
‘কি হবে সাংবাদিক সেজে, যদি সত্য কথা বলতে না পারি? কি হবে হাতে কলম নিয়ে, যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখতে না পারি? কি হবে ক্যামেরা নিয়ে, যদি ঘটনার ছবি তুলতে গিয়ে নিজের জীবন নিয়েই শঙ্কায় থাকতে হয়? কি হবে সাংবাদিকতার পরিচয় বহন করে, যদি একজন নির্যাতিত সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানোর মতো নিরাপদ পরিবেশটুকুও না থাকে?’
এ প্রশ্নগুলো শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়। এটি দেশের হাজারো সাংবাদিকের মনের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের বেদনা, হতাশা এবং অধিকারবঞ্চিত হওয়ার বাস্তব চিত্র। সাংবাদিকতা কি কেবল একটি পরিচয়পত্র, গলায় ঝোলানো একটি কার্ড কিংবা হাতে থাকা একটি ক্যামেরার নাম? নাকি সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্য প্রকাশের সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব?
আজ সেই প্রশ্নের মুখোমুখি বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ।
সাংবাদিক আছেন, কিন্তু সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোথায়?
একজন সাংবাদিক যখন কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, দখলদারত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করেন, তখন তাঁর দায়িত্ব থাকে সত্য তুলে ধরা। কিন্তু সেই সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে যদি তাঁকে হামলা, মামলা, হুমকি, হয়রানি কিংবা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় থাকতে হয়, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ কোথায়?
একজন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হলে তাঁর পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে? তাঁর চিকিৎসার ব্যয় কে বহন করবে? তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ কে নিশ্চিত করবে? তাঁর উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি কোথায় যাবেন? সাংবাদিকের জীবন কি এতটাই মূল্যহীন যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিপদে পড়লেও তাঁকে নিজের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে?
সাংবাদিকের হাতে অস্ত্র থাকে না। থাকে কলম, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন এবং সত্য প্রকাশের দায়িত্ব। অথচ কখনো কখনো এই কলমই হয়ে ওঠে ক্ষমতাবানদের অস্বস্তির কারণ। কারণ, একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, তথ্য যাচাই করেন, অসংগতি তুলে ধরেন এবং জনগণের সামনে বাস্তবতা প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকের প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে দেখা নয়, বরং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
সাদা কে সাদা, কালো কে কালো বলতে না পারলে সাংবাদিকতা কেন?
সাংবাদিকতার মূল শক্তি তার স্বাধীনতা। একজন সাংবাদিক যদি সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে না পারেন, তাহলে তাঁর কলমের স্বাধীনতা কোথায়? যদি প্রশাসনের অনিয়ম নিয়ে লিখতে ভয় পান, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারেন, জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিশোধের আশঙ্কায় থাকতে হয়, তাহলে সাংবাদিকতার মৌলিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তবে সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, দায়িত্বশীল ও প্রমাণসমর্থিত। একইভাবে সাংবাদিকের কোনো ভুল থাকলে তাঁরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু জবাবদিহির নামে ভয় দেখানো, সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়া কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রশাসনের দুর্বলতা নয়; বরং এটি একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার শক্তির পরিচয়।
সাংবাদিকের পরিচয়পত্র আছে, কিন্তু পেশাগত মর্যাদা কতটুকু?
দেশে অসংখ্য সাংবাদিক স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কাজ করছেন। কেউ জাতীয় দৈনিকে, কেউ আঞ্চলিক পত্রিকায়, কেউ অনলাইন সংবাদমাধ্যমে, কেউ টেলিভিশনে, আবার কেউ ক্যামেরা হাতে মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সাংবাদিকের পেশাগত জীবনে আর্থিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনেকেই নিয়মিত বেতন পান না, কেউ সম্মানী পান অনিয়মিতভাবে, আবার অনেকেই সংবাদ সংগ্রহের খরচ নিজের পকেট থেকে বহন করেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সাংবাদিক কীভাবে পরিবার চালাবেন? কীভাবে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বহন করবেন? কীভাবে চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার ব্যয় মেটাবেন?
একজন সাংবাদিকেরও পরিবার আছে, সন্তান আছে, স্বপ্ন আছে, ভবিষ্যৎ আছে। তাঁরও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। সাংবাদিকতা যদি জীবিকা নির্বাহের ন্যূনতম সুযোগ না দেয়, তাহলে পেশাটিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এখানে সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, সময়মতো পারিশ্রমিক, চাকরির নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে সাংবাদিকদের শ্রম ও পেশাগত অধিকার বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
নির্যাতিত সাংবাদিকের পাশে দাঁড়াবে কে?
কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে অনেক সময় তাঁর পাশে দাঁড়ানোর দাবি ওঠে, প্রতিবাদ হয়, বিবৃতি আসে। কিন্তু কিছুদিন পর ঘটনাটি আলোচনার বাইরে চলে যায়। অথচ আক্রান্ত সাংবাদিক এবং তাঁর পরিবারকে সেই ঘটনার পরও দীর্ঘদিন ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত মামলা গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা, অভিযুক্তদের আইনানুগ বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কোনো সাংবাদিক অপরাধ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিচার হবে। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা যাবে না, আবার সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ আইনের ঊর্ধ্বেও থাকতে পারবেন না।
আইনের শাসন সবার জন্য সমান হতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করতে না পারলে সংবাদ সম্মেলনের প্রয়োজন কী?
একটি সংবাদ সম্মেলন মানে শুধু বক্তব্য শোনা নয়; সাংবাদিকদের কাজ হলো বক্তব্যের অসংগতি খুঁজে বের করা, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা।
কিন্তু সাংবাদিক প্রশ্ন করলে যদি তাঁকে অপমানিত হতে হয়, প্রশ্ন করতে বাধা দেওয়া হয় কিংবা প্রশ্নের কারণে তাঁকে পরবর্তী সময়ে হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে মুক্ত গণমাধ্যমের চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়।
সরকারি দপ্তর, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকতে হবে। প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে তার ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়।
সাংবাদিকের কাজ কারও প্রশংসা করা নয়; সাংবাদিকের কাজ সত্য অনুসন্ধান করা।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন: আর কত অপেক্ষা?
বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো একটি কার্যকর, সুস্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য সাংবাদিক সুরক্ষা আইন।
এই আইনে সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তা, হামলা-হুমকি প্রতিরোধ, দ্রুত আইনি প্রতিকার, নিরপেক্ষ তদন্ত, চিকিৎসা সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের পরিবারের সুরক্ষার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিকের স্বাধীনতা, তথ্য সংগ্রহের অধিকার, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা এবং পেশাগত কাজে অযৌক্তিক বাধা প্রতিরোধের কার্যকর বিধান থাকতে হবে।
তবে এই আইন যেন সাংবাদিকদের বিশেষ দায়মুক্তির হাতিয়ার না হয়। বরং সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকতার নৈতিকতা, সত্যনিষ্ঠা, পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন কোনো রাজনৈতিক দলের দাবি নয়, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়; এটি গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের জানার অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি জাতীয় প্রয়োজন।
সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের কাছে সাংবাদিক সমাজের প্রশ্ন
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত সবার কাছে সাংবাদিক সমাজের কিছু মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।
একজন সাংবাদিক সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে বিপদে পড়লে রাষ্ট্র কি তাঁর পাশে দাঁড়াবে?
কোনো সাংবাদিককে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে মারধর করা হলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
কোনো সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো তাঁকে অপমান করলে তার প্রতিকার কোথায়?
একজন সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা বা হয়রানির শিকার করা হলে তাঁর আইনি সুরক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?
সাংবাদিকের পরিবার যখন আর্থিক সংকটে পড়ে, তখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা থাকবে কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সাংবাদিক সমাজের জানা প্রয়োজন।
আমরা সরকারের বিরুদ্ধে নই; আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আমরা প্রশাসনের প্রতিপক্ষ নই; আমরা প্রশাসনের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা দেখতে চাই। আমরা কোনো জনপ্রতিনিধির শত্রু নই; আমরা জনগণের পক্ষে প্রশ্ন করতে চাই।
সরকারের উন্নয়ন, সাফল্য ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড যেমন সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হবে, তেমনি অনিয়ম, দুর্নীতি, ব্যর্থতা ও জনদুর্ভোগের বিষয়ও প্রকাশিত হবে। এটাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
সরকার যদি সত্যিকার অর্থে একটি জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
সাংবাদিকতা বন্ধ করে দেব, নাকি সত্য বলা বন্ধ করে দেব?
একজন সাংবাদিক যখন দিনের পর দিন সংবাদ সংগ্রহ করেন, রাত জেগে প্রতিবেদন তৈরি করেন, মানুষের বিপদে ছুটে যান, দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান করেন, তখন তিনি শুধু নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও কাজ করেন।
কিন্তু সেই সাংবাদিক যখন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, পরিবারকে সময় দিতে পারেন না, মাস শেষে সংসারের খরচ জোগাতে হিমশিম খান, তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—এই পেশায় থেকে তিনি কী পেলেন?
তিনি কি সংবাদ লেখা বন্ধ করে দেবেন? টেলিভিশনে সংবাদ প্রচার বন্ধ করে দেবেন? ক্যামেরা নামিয়ে রাখবেন? অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেবেন?
না, সাংবাদিকতা বন্ধ হয়ে যাক—এটি কোনো দায়িত্বশীল মানুষের কাম্য হতে পারে না। বরং সাংবাদিকতা যেন আরও শক্তিশালী, স্বাধীন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়, সেটিই রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মহলের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
কারণ, স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া জনগণের তথ্য জানার অধিকার দুর্বল হয়, দুর্নীতি ও অনিয়ম আড়ালে থাকার সুযোগ পায় এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১০ দফা দাবি
১. অবিলম্বে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
২. পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকের ওপর হামলা, হুমকি, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনায় দ্রুত মামলা গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সাংবাদিক নির্যাতনের মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত যোগাযোগ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৫. সাংবাদিকদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং জরুরি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. সংবাদ সংগ্রহ ও সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৭. সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষকে সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, নিয়মিত পারিশ্রমিক এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা দিতে কার্যকর নীতিমালা ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সাংবাদিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৯. নারী সাংবাদিক ও মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা এবং হয়রানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক, মালিকপক্ষ, পেশাজীবী প্রতিনিধি ও আইনজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
শেষ কথা: সাংবাদিককে বাঁচান, সাংবাদিকতাকে বাঁচান
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু রাস্তাঘাট, সেতু, ভবন কিংবা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্র কতটা মানুষের কথা শুনছে, কতটা সত্যকে সম্মান করছে, কতটা সমালোচনা গ্রহণ করতে পারছে এবং কতটা দুর্বল ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে—সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
সাংবাদিক রাষ্ট্রের শত্রু নন। সাংবাদিক জনগণের কথা তুলে ধরেন। একজন সাংবাদিক যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখেন, তখন তিনি সমাজকে সতর্ক করেন। যখন দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। যখন অসহায় মানুষের কষ্ট তুলে ধরেন, তখন তিনি মানবিক দায়িত্ব পালন করেন।
তাই সাংবাদিকের কলমকে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং সত্য প্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সরকারের কাছে আমাদের বিনীত কিন্তু দৃঢ় আহ্বান—সাংবাদিকদের আর শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর সুরক্ষা দিন। সাংবাদিকদের শুধু পরিচয়পত্র নয়, পেশাগত মর্যাদা দিন। শুধু বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নয়, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিন। শুধু নির্যাতনের পর বিবৃতি নয়, নির্যাতন প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিন।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ হলে শুধু একজন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষের জানার অধিকার, গণতন্ত্রের জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা।
আমরা বিশেষ কোনো সুবিধা চাই না। আমরা আইনের শাসন চাই, নিরাপত্তা চাই, মর্যাদা চাই, ন্যায্য পারিশ্রমিক চাই এবং সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা চাই।
আমাদের দাবি একটাই—সাংবাদিক সুরক্ষা আইন চাই।
সাংবাদিক বাঁচলে সংবাদ বাঁচবে, সংবাদ বাঁচলে মানুষের জানার অধিকার বাঁচবে, আর মানুষের জানার অধিকার বাঁচলেই রাষ্ট্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথ শক্তিশালী হবে।
আহ্বান: প্রধানমন্ত্রী, সরকারের নীতিনির্ধারক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ—সাংবাদিক সমাজের এই আকুতি শুনুন। সময় থাকতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করুন।
উৎস ভাবনা: আহমেদ আবু জাফরের ‘কি হবে সাংবাদিক সেজে!’ শীর্ষক কবিতার বক্তব্য ও সাংবাদিক সমাজের পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার দাবি।
আহমেদ আবু জাফর চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম
সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ
সম্পাদনা ও উপস্থাপনা: নিজস্ব প্রতিবেদক












