জামায়াতের সঙ্গে জোট, গণতন্ত্রহীনতা ও নারী অধিকার উপেক্ষার অভিযোগ—এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন; নতুন রাজনীতির স্বপ্নে বড় ধাক্কা
এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন: জোট রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নারী অধিকার নিয়ে দলের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশ্ন
জামায়াতের সঙ্গে জোট, নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে গণতান্ত্রিক ঘাটতি এবং নারীর রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষার অভিযোগ; নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার দাবি পদত্যাগী নেত্রীর
নিজস্ব প্রতিবেদক :
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট রাজনীতি, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চার অভাব, নারী নেতৃত্বের অবমূল্যায়ন এবং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
তাঁর এই পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আদর্শ, নেতৃত্বের স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সামান্তা শারমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর ধরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাঁর দাবি, জামায়াতকে নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই সংস্কারের উপযুক্ত মিত্র মনে করেন না তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের জোট এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও সংস্কারের লক্ষ্যকে দুর্বল করেছে।
পদত্যাগী এই নেত্রীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বৈষম্যবিরোধী ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এনসিপি সেই প্রত্যাশা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই ক্ষমতাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী সমঝোতাকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
জোট রাজনীতি নিয়ে আপত্তি
সামান্তা শারমিনের বিবৃতিতে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটের প্রশ্ন। তাঁর দাবি, সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কার—এই তিন ক্ষেত্রেই জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আদর্শিক দূরত্ব রয়েছে। ফলে এমন জোট এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি মনে করেন, নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির উচিত ছিল পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে নিজস্ব কর্মসূচি ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত দলটির স্বতন্ত্র পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নারীর অধিকার ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন
পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে নারী অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর বক্তব্য, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সামনের সারিতে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বিজয়ের পর তাঁদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
তাঁর অভিযোগ, নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি থাকলেও নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি। বরং পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব দলের ভেতরেও দেখা যাচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও অসন্তোষ
এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, নিয়মিত কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের পরিবর্তে আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে।
তাঁর মতে, যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে, সেই দলের ভেতরেই যদি স্বচ্ছ নেতৃত্ব নির্বাচন, জবাবদিহি ও ভিন্নমতের যথাযথ মূল্যায়ন না থাকে, তাহলে তাদের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার প্রশ্নের মুখে পড়ে।
নতুন রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান
পদত্যাগের বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন শুধু দলের সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
তাঁর মতে, বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য, নারীর সমান অধিকার, গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা জরুরি। কোনো বিদেশি শক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং বাংলাদেশের স্বার্থের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ এনসিপির জন্য কতটা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলো নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ, নেতৃত্বের জবাবদিহি, নারী প্রতিনিধিত্ব এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের কাছে যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে—এখন সেই প্রশ্নই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সামনে এসেছে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত সমালোচনা ও অভিযোগগুলো সামান্তা শারমিনের প্রকাশিত পদত্যাগপত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। এসব বিষয়ে এনসিপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন।













