শাহজালাল বিমান বন্দরে লন্ডভন্ড ফ্লাইট
নিরাপদে বিমান উড্ডয়নে বড় বাধা কুয়াশা
শীত মৌসুম এলেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের নিরাপদ অবতরণ ও উড্ডয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঘন কুয়াশা। এ বছরও কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঘন কুয়াশার কারণে রানওয়ের দৃশ্যমানতা নেমে গেছে ন্যূনতম নিরাপদ সীমার নিচে। বাধ্য হয়ে গত কয়েক দিনে অন্তত অর্ধশত ফ্লাইট কলকাতা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। এর মধ্যে শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ডাইভার্ট করা হয়েছে ৯টি ফ্লাইট। আর এ কারণে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষকে পড়তে হচ্ছে অপারেশনাল জটিলতায়। লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে শিডিউল। গুনতে হচ্ছে আর্থিক মাশুল। উপরন্তু, বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।
ঘন কুয়াশাকালে শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ের পূর্ণাঙ্গ লাইটিং সিস্টেম কার্যকর রাখতে না পারায় বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক মানের আইএলএস (ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম) ক্যাটাগরি-২ সুবিধা হারিয়ে আবার ক্যাটাগরি-১-এ নেমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিমান চলাচলে। ভোর রাত ও গভীর রাতে কুয়াশা ঘন হলেই একের পর এক ফ্লাইট ডাইভার্ট করতে হচ্ছে।
আইএলএস এমন একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে পাইলটরা কম দৃশ্যমানতার মধ্যেও রানওয়ের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করে নিরাপদে বিমান অবতরণ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) এ ব্যবস্থাকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে— ক্যাটাগরি-১, ক্যাটাগরি-২ এবং ক্যাটাগরি-৩ (এ, বি ও সি)। ক্যাটাগরি-১ ব্যবস্থায় সাধারণত বিমান অবতরণের জন্য ন্যূনতম ১২০০ মিটার দৃশ্যমানতা প্রয়োজন হয়। ক্যাটাগরি-২ সুবিধা থাকলে ৫০০ থেকে ৭৫০ মিটার দৃশ্যমানতার মধ্যেও নিরাপদ অবতরণ সম্ভব। আর ক্যাটাগরি-৩ থাকলে অত্যন্ত ঘন কুয়াশা বা প্রায় শূন্য দৃশ্যমানতার মধ্যেও বিমান নিরাপদে অবতরণ করতে পারে। তবে ক্যাটাগরি-৩ বি বা সি বাস্তবায়ন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হওয়ায় বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য তা এখনও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইএলএস ক্যাটাগরি-২ সুবিধা বজায় রাখতে হলে একসঙ্গে কয়েকটি বাধ্যতামূলক টেকনিক্যাল শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে তিনটি প্রধান প্যারামিটার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আইএলএসের নিজস্ব যন্ত্রপাতি অবশ্যই ক্যাটাগরি-২ মানসম্পন্ন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, রানওয়ের পুরো লাইটিং সিস্টেম অ্যাপ্রোচ লাইট, সেন্টার লাইন লাইট ও এজ লাইটসহ কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ কার্যকর থাকতে হবে। তৃতীয়ত, রানওয়ের ভিজুয়াল রেঞ্জ পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত আবহাওয়া সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি নির্ভুলভাবে কাজ করতে হবে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বিমান পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘‘বিমানবন্দর ক্যাটাগরি-২ শুধু যন্ত্র বসালেই হয় না। এটি ধরে রাখতে হলে প্রতিদিনের মনিটরিং, নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ এবং দ্রুত ত্রুটি সমাধান জরুরি। এখানে সামান্য অবহেলাও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। শীত মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই যদি লাইটিং সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ও সংস্কার সম্পন্ন করা যেত, তাহলে এহেন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।’’
ক্যাটাগরি-২ সুবিধা না থাকায় সর্বাধিক ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে রাত ও ভোরের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশে চক্কর কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ফ্লাইট ঢাকায় নামতে না পেরে বিকল্প বিমানবন্দরে অবতরণ করছে। সেখান থেকে আবার বাস বা অন্য ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে, যা সময় ও অর্থ— দুদিক থেকেই বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক সময় ডাইভার্টের তথ্য দেরিতে জানানো হয়। ফলে অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তি আরও বাড়ে।
একটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা বলেন, আইএলএস সিস্টেম ঘন কুয়াশার কাজ না করায় পাইলট যথাযথভাবে রানওয়ে দেখতে পান না। ঝুঁকি এড়াতে অন্য এয়ারপোর্টে ল্যান্ডিং করতে বাধ্য হন। ফলে শিডিউল লন্ডভন্ড হয়ে যায়, দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। এ ছাড়া এয়ারলাইন্সগুলোর খরচও বেড়ে যায়। সরকারের উচিত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ কাউছার মাহমুদ বলেন, ‘‘গত ২৯ অক্টোবর থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমান ল্যান্ডিংয়ের সময় লাইটিং সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ কারণে বর্তমানে ক্যাটাগরি ২ থেকে ১-এ অবনমন করা হয়। এ লাইটগুলো ব্যয়বহুল এবং বিদেশ থেকে আনতে হয়। টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। অতি দ্রুত তা স্থাপন করা হবে।’’ ঘন কুয়াশার কারণে বিমান নামতে না পারায় ডাইভার্ট করা হচ্ছে, স্বীকার করেন তিনিও।
ফ্লাইট ডাইভার্ট মানেই অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, গুনতে হয় জরিমানা, ক্রুদের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস এবং পরবর্তী ফ্লাইট পরিচালনায় জটিলতা দেখা দেয়। একজন এয়ারলাইন্স কর্মকর্তা বলেন, একটি ফ্লাইট ডাইভার্ট হলে এর প্রভাব পরবর্তী কয়েকটি ফ্লাইটের শিডিউলেও পড়ে। এতে অপারেশনাল ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রী অসন্তোষও বাড়ে। তার মতে, শীত মৌসুমে এ সমস্যা নিয়মিত হলে পুরো নেটওয়ার্ক পরিকল্পনাই চাপে পড়ে।












