সাংবাদিকরা ভয়মুক্ত থাকবেন: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতিশ্রুতি—বাস্তবে কতটা স্বাধীন গণমাধ্যম?
‘গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেবে না সরকার’—তথ্য প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা, সামনে এখন বাস্তবায়নের পরীক্ষা
নিজস্ব অনুসন্ধান
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা, অপসাংবাদিকতা ও হলুদ সাংবাদিকতা কমানো এবং সাংবাদিকদের ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) নেত্রকোনার কেন্দুয়া পাবলিক হল মিলনায়তনে একটি শিক্ষা কর্মসূচির ওরিয়েন্টেশন ও কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানো হবে। অপসাংবাদিকতা ও হলুদ সাংবাদিকতা কমাতে প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
কিন্তু এখানেই সামনে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শুধু প্রশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করলেই কি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব?
স্বাধীনতার ঘোষণা, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অব্যাহত থাকবে এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ সরকার নেবে না। সাংবাদিকরা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে নির্বিঘ্নে কাজ করবেন—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে গণমাধ্যমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নীতিগত বার্তা। তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শুধু মন্ত্রী বা সরকারের বক্তব্য নয়, মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকরা বাস্তবে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন—সেটিই স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রকৃত মাপকাঠি।
কোনো সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিককে চাপ দেওয়া হচ্ছে কি না, তথ্য সংগ্রহে বাধা আসছে কি না, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে কি না, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই প্রতিফলিত হবে সরকারের ঘোষণার বাস্তব চিত্র।
হলুদ সাংবাদিকতা বন্ধ হবে কীভাবে?
হলুদ সাংবাদিকতা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ, গুজবকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন, ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদ ব্যবহার কিংবা চটকদার শিরোনামের মাধ্যমে পাঠক আকর্ষণের প্রবণতা সাংবাদিকতার মূলনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবে হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যেন সাংবাদিকতার স্বাধীনতাই সংকুচিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা মানে সরকারের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করা নয়; আবার সরকারের সমালোচনা করাই সাংবাদিকতার একমাত্র দায়িত্বও নয়। সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো—তথ্য যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, সত্যকে সত্য হিসেবে এবং ভুলকে ভুল হিসেবে তুলে ধরা।
প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালী করার উদ্যোগ—প্রশ্ন জবাবদিহির
প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। উদ্যোগটি কার্যকর হলে সাংবাদিকতার নৈতিক মান, পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে।
তবে এখানেও প্রয়োজন স্বচ্ছতা।
কোনো সংবাদ ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে কি না, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না, সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হবে কি না—এসব বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি।
গণমাধ্যমের জবাবদিহি যেমন প্রয়োজন, তেমনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষাও সমান প্রয়োজনীয়।
জেলা-উপজেলায় প্রশিক্ষণ—সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে কতটা কার্যকর হবে?
পিআইবির মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে।
কারণ স্থানীয় সাংবাদিকরাই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকেন। ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, ভূমি বিরোধ, প্রশাসনিক গাফিলতি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা—এসব খবর প্রথমে অনেক সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছেই আসে।
তাই তাঁদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি শুধু সংবাদ লেখার কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তথ্য যাচাই, নথি বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাংবাদিকতার নৈতিকতা, সোর্স সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মতো বিষয়েও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব
প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও বিপদগ্রস্ত সাংবাদিকদের জন্য সহায়তার সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি কে সহায়তা পাবেন, কীভাবে পাবেন এবং কীভাবে অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক কল্যাণের অর্থ যেন কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা বা ব্যক্তিগত প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল না হয়, সেটিই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।
অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন: ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন কোথায়?
তথ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালীকরণ এবং সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বৃদ্ধির যে বার্তা এসেছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো একক বক্তব্যে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সাংবাদিক প্রশাসনের অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন, ক্ষমতাবান ব্যক্তির অনিয়ম অনুসন্ধান করতে পারবেন, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন এবং একই সঙ্গে ভুল হলে জবাবদিহিও করবেন।
সরকার যদি সত্যিই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে না চায় এবং সাংবাদিকদের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার সুযোগ দিতে চায়, তাহলে সেটি সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত হবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায়।
সাংবাদিকের হাতে কলম থাকবে, কিন্তু সেই কলম যেন ভয় না পায়।
সরকারের কাছে প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু প্রশ্ন করার কারণে সাংবাদিক যেন আতঙ্কিত না হন।
সংবাদমাধ্যম ভুল করলে জবাবদিহি করবে, আবার ক্ষমতাবান ভুল করলে সংবাদমাধ্যমও যেন নির্ভয়ে তা প্রকাশ করতে পারে।
এটাই হতে পারে বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য এখন তাই শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে নয়—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়।









