১৭ বছর কারাবাস, মিথ্যার ভিত্তিতে সাজা’: বাবর
‘অন্যায় ও মিথ্যার ভিত্তিতে তিনবার মৃত্যুদণ্ড’—সাড়ে ১৭ বছরের কারাজীবন নিয়ে বাবরের বিস্ফোরক দাবি
বিচারের কাঠগড়ায় দীর্ঘ অতীত, প্রশ্নের মুখে মামলার প্রক্রিয়া; শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রেও ‘আইনের নিজস্ব গতি’র কথা বললেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
সাড়ে ১৭ বছরের দীর্ঘ কারাজীবন। একের পর এক মামলা। মৃত্যুদণ্ডের রায়—তাও তিনবার। শেষ পর্যন্ত কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসার পর নিজের অতীতের বিচারিক অধ্যায় নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নেত্রকোণা-৪ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর।
বাবরের দাবি, তার বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচারিক কার্যক্রম অন্যায় ও মিথ্যার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছিল। একই সঙ্গে তিন দফা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়ার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। ফলে তার দীর্ঘ কারাজীবন, মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সেসময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) নেত্রকোণার মদন উপজেলার জোবাইদা রহমান মহিলা ডিগ্রি কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন বাবর।
সাড়ে ১৭ বছর কারাগারে—কী ছিল সেই বিচারিক অধ্যায়?
বাবরের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তার দীর্ঘ কারাবাসকে ঘিরে। প্রায় সাড়ে ১৭ বছর কারাগারে থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে তার বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচারিক কার্যক্রম ছিল অন্যায় ও মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
তিনবার মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়ার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। তবে তার এই বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর রায়, আপিল ও পরবর্তী আদালতীয় সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট সামনে এনে বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।
কারণ একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সাজা কেন দেওয়া হয়েছিল, কোন মামলায় কী অভিযোগ ছিল, নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত কী ছিল এবং উচ্চ আদালতে সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে পরিবর্তিত বা বহাল হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
শেখ হাসিনা ফিরলে কী হবে—বাবরের বক্তব্যে নতুন বার্তা
সাংবাদিকদের প্রশ্নে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গও উঠে আসে।
বাবর বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে ফিরতে পারবেন। তবে দেশে ফেরার পর তার বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াই প্রত্যাশিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে বিচারিক প্রক্রিয়াকেই সামনে রাখার বার্তা দিয়েছেন বাবর। তবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলাগুলোর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের—এ বিষয়টিও স্পষ্ট।
বিচার নিয়ে বাবরের দাবি—যাচাইয়ের জায়গা কোথায়?
বাবরের বক্তব্য সামনে আসার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে তার বিরুদ্ধে পরিচালিত মামলাগুলোর বিচারিক ইতিহাস নিয়ে।
কোন মামলায় তাকে কী অভিযোগে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল? কোন পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল? পরবর্তী সময়ে আদালতের সিদ্ধান্ত কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে? তার দীর্ঘ কারাবাসের আইনি ভিত্তি কী ছিল? এসব প্রশ্নের দলিলভিত্তিক উত্তর ছাড়া শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে অতীতের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
তাই বাবরের বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আদালতের রায়, মামলার নথি, আপিলের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনা করাই হবে প্রকৃত অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
মাদক নিয়েও কঠোর অবস্থান
রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রসঙ্গের বাইরে দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তার মতে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকে ধ্বংস করে না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপরও। মাদকাসক্তির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বাবর মাদক বিক্রি ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান।
রাজনীতির মাঠে ফিরে পুরোনো অধ্যায় আবারও সামনে
দীর্ঘ কারাজীবনের পর বাবরের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সময়ে তার অতীতের বিচারিক অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় আসা তাৎপর্যপূর্ণ। তার নিজের ভাষ্যে, তিনি অন্যায় ও মিথ্যার ভিত্তিতে তিনবার মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের প্রশ্ন এখানেই শেষ নয়—সেই রায়গুলোর পেছনে আদালতের নথিতে কী কারণ ছিল, কোন প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সেসব সিদ্ধান্তের কী পরিণতি হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে যেতে হবে। প্রয়োজন আদালতের নথি, মামলার রায়, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নথির সমন্বিত পর্যালোচনা।
কারণ বাবরের দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার দাবির সত্যতা যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গাতেই শুরু হতে পারে সাড়ে ১৭ বছরের কারাজীবনের প্রকৃত অনুসন্ধান।









