ঢাকা ০২:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রবাসীর বিশ্বাস ভেঙে স্ত্রী উধাও, পেছনে পড়ে রইল নিষ্পাপ শিশুকন্যা—কাঁদছে একটি পরিবারসৌদি আরবে দুধ দিয়ে গোসল করে আল্লাহর কাছে বিচার চাইলেন আজিজ আকন্দ; স্ত্রীর বিরুদ্ধে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে চলে যাওয়ার অভিযোগ, থানায় জিডি।

নিজস্ব সংবাদ :

নয় বছরের সংসার, ছয় বছরের সন্তান—সব ফেলে পরকীয়ার টানে ঘরছাড়া স্ত্রী! সৌদি আরবে দুধ দিয়ে গোসল করে আল্লাহর কাছে বিচার চাইলেন প্রবাসী আজিজ
পেছনে পড়ে রইল নিষ্পাপ শিশুকন্যা, ভেঙে গেল একটি পরিবারের স্বপ্ন; দাম্পত্য বিরোধের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সন্তানের ভবিষ্যৎ ও মা-বাবার দায়িত্ববোধের প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একটি সংসার গড়ে ওঠে ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ আর পারস্পরিক ত্যাগের মধ্য দিয়ে। স্বামী-স্ত্রীর হাত ধরে পৃথিবীতে আসে একটি নতুন প্রাণ। সেই সন্তানকে ঘিরেই তৈরি হয় মা-বাবার হাজারো স্বপ্ন। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে যখন অবিশ্বাস, বিরোধ কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়, তখন সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ে নিষ্পাপ শিশুরা। তাদের কোনো অপরাধ থাকে না, অথচ বড়দের সিদ্ধান্তের নির্মম পরিণতি বহন করতে হয় তাদেরই।
এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ও আলোচিত ঘটনার জন্ম দিয়েছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার চরগোপালপুর এলাকার প্রবাসী আজিজ আকন্দের পারিবারিক জীবন। নয় বছরের দাম্পত্য, ছয় বছরের ফুটফুটে মেয়েসন্তান—সবকিছু পেছনে ফেলে তার স্ত্রী অন্য এক যুবকের সঙ্গে চলে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন আজিজ। ঘটনার পর সৌদি আরবে বসে দুধ দিয়ে গোসল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। বলেছেন, ‘কাবাঘরে গিয়ে আল্লাহর কাছে বিচার দেব।’
আজিজের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে ভিডিওর চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ছয় বছরের সেই শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ। যে বয়সে একটি শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মায়ের স্নেহ, বাবার ভালোবাসা, নিরাপদ আশ্রয় এবং সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ, সেই বয়সেই তাকে পড়তে হয়েছে পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যে।
প্রবাসের কষ্টে গড়া সংসারে ভাঙনের অভিযোগ
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় নয় বছর আগে শান্তনা আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আজিজ আকন্দ। তাদের সংসারে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। জীবিকার তাগিদে প্রায় চার বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান আজিজ। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা এবং স্ত্রী-সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতায় কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি।
প্রবাসজীবন কখনোই সহজ নয়। পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে থেকে প্রতিদিন পরিশ্রম, অর্থ উপার্জন, দেশে টাকা পাঠানো এবং প্রিয়জনদের ভালো রাখার স্বপ্ন নিয়েই কাটে প্রবাসীদের দিন। আজিজের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতার ব্যতিক্রম ছিল না বলে তার অভিযোগ।
কিন্তু তার দাবি, গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে ছয় বছরের মেয়েসন্তানকে বাড়িতে রেখে অন্য এক যুবকের সঙ্গে চলে যান তার স্ত্রী শান্তনা আক্তার। যাওয়ার সময় তিন লাখ টাকা ও তিন ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সৌদি আরবে দুধ দিয়ে গোসল, ভিডিওতে কান্নাজড়িত কণ্ঠ
স্ত্রীর চলে যাওয়ার খবর পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন আজিজ। বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরব থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে নিজের কষ্টের কথা জানান তিনি। ওই সময় দুধ দিয়ে গোসল করার ভিডিও ধারণ করা হয়।
ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বিশ্বাস করে রেখে গেছিলাম স্ত্রীকে, ফুটফুটে শিশুকন্যা রেখে চলে গেছে অন্যের হাত ধরে। আমি কাবাঘরে গিয়ে আল্লাহর কাছে বিচার দেব।’
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ঘটনাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। কেউ প্রবাসী স্বামীর কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন, কেউ শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে সন্তানকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে না রেখে দায়িত্বশীলভাবে সমাধানের পথ খোঁজা প্রয়োজন।
ছয় বছরের শিশুটির অপরাধ কোথায়?
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, মা-বাবার দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েনে একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়া।
ছয় বছরের একটি শিশু জানে না স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ কী, সম্পর্কের জটিলতা কী, কিংবা কেন তার মা-বাবার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সে শুধু জানে, তার মায়ের স্নেহ দরকার, বাবার আদর দরকার, নিরাপদে বেড়ে ওঠার জন্য একটি শান্ত পরিবেশ দরকার।
একজন মা সন্তানের কাছে শুধু জন্মদাত্রী নন, তিনি তার প্রথম আশ্রয়, প্রথম ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি। একইভাবে একজন বাবাও সন্তানের জীবনে অপরিহার্য। তাই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব কখনো শেষ হয়ে যায় না।
কোনো নারী বা পুরুষ দাম্পত্য জীবনে নির্যাতন, অবহেলা কিংবা অসহনীয় পরিস্থিতির শিকার হলে আইনসম্মতভাবে আলাদা হওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া আর সন্তানকে দায়িত্বহীনভাবে ফেলে যাওয়া এক বিষয় নয়। সন্তান কারও ব্যক্তিগত বিরোধের হাতিয়ার হতে পারে না।
সংসার ভাঙতে পারে, কিন্তু সন্তানের প্রতি দায়িত্ব নয়
সমাজে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কখনো স্বামীর ভুলে, কখনো স্ত্রীর সিদ্ধান্তে, কখনো দুই পক্ষের মতবিরোধে একটি সংসার ভেঙে যায়। কিন্তু সংসার ভেঙে গেলেই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
একজন নারী যদি নতুন করে জীবন শুরু করতে চান, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। একই অধিকার একজন পুরুষেরও রয়েছে। তবে সেই সিদ্ধান্তের কারণে সন্তানের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা, ভরণপোষণ ও মানসিক বিকাশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা মা-বাবা উভয়ের দায়িত্ব।
বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবার বিচ্ছেদ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। অবহেলা, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই দাম্পত্য জীবনে সংকট দেখা দিলে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য, প্রয়োজনে কাউন্সেলর এবং আইনগত সহায়তা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা জরুরি।
থানায় সাধারণ ডায়েরি, তদন্তের আশ্বাস
এদিকে ঘটনার পর বৃহস্পতিবার আজিজের পরিবারের সদস্যরা মাদারগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল হাসেম বলেন, ‘আজিজের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে শান্তনা আক্তারের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য জানতে বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সমাজের প্রতি প্রশ্ন—শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
আজিজ আকন্দের ঘটনাটি কেবল একজন প্রবাসী স্বামীর ব্যক্তিগত দুঃখের গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের সামনে মা-বাবার দায়িত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং শিশুর অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনার পর তার প্রতি দায়িত্ব পালন করা মা-বাবা উভয়ের নৈতিক ও আইনগত কর্তব্য। সম্পর্কের সমস্যা হলে আলোচনা, সমঝোতা কিংবা প্রয়োজনে আইনসম্মত বিচ্ছেদের পথ রয়েছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সন্তানকে অবহেলা, অনিশ্চয়তা কিংবা প্রতিশোধের পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবসান ঘটতে পারে, কিন্তু মা-বাবা হিসেবে সন্তানের প্রতি দায়িত্বের অবসান ঘটে না। নতুন সম্পর্ক, নতুন জীবন কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সিদ্ধান্তের মধ্যেও সন্তানের নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
আজিজের অভিযোগের সত্যতা তদন্তে বেরিয়ে আসুক, সংশ্লিষ্ট নারীও তার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান—এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে ছয় বছরের শিশুটির নিরাপদ জীবন, মানসিক সুস্থতা এবং যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
কারণ, একটি সংসার ভেঙে গেলে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নতুন করে জীবন গড়তে পারেন; কিন্তু একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব, মায়ের স্নেহের অভাব কিংবা মানসিক ক্ষত সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
সন্তান কোনো বোঝা নয়, কোনো সম্পর্কের প্রতিশোধের মাধ্যমও নয়। সন্তান হলো মা-বাবা দুজনেরই দায়িত্ব, ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের আমানত।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:৫৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
৮ বার পড়া হয়েছে

প্রবাসীর বিশ্বাস ভেঙে স্ত্রী উধাও, পেছনে পড়ে রইল নিষ্পাপ শিশুকন্যা—কাঁদছে একটি পরিবারসৌদি আরবে দুধ দিয়ে গোসল করে আল্লাহর কাছে বিচার চাইলেন আজিজ আকন্দ; স্ত্রীর বিরুদ্ধে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে চলে যাওয়ার অভিযোগ, থানায় জিডি।

আপডেট সময় ১০:৫৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

নয় বছরের সংসার, ছয় বছরের সন্তান—সব ফেলে পরকীয়ার টানে ঘরছাড়া স্ত্রী! সৌদি আরবে দুধ দিয়ে গোসল করে আল্লাহর কাছে বিচার চাইলেন প্রবাসী আজিজ
পেছনে পড়ে রইল নিষ্পাপ শিশুকন্যা, ভেঙে গেল একটি পরিবারের স্বপ্ন; দাম্পত্য বিরোধের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সন্তানের ভবিষ্যৎ ও মা-বাবার দায়িত্ববোধের প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একটি সংসার গড়ে ওঠে ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ আর পারস্পরিক ত্যাগের মধ্য দিয়ে। স্বামী-স্ত্রীর হাত ধরে পৃথিবীতে আসে একটি নতুন প্রাণ। সেই সন্তানকে ঘিরেই তৈরি হয় মা-বাবার হাজারো স্বপ্ন। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে যখন অবিশ্বাস, বিরোধ কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়, তখন সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ে নিষ্পাপ শিশুরা। তাদের কোনো অপরাধ থাকে না, অথচ বড়দের সিদ্ধান্তের নির্মম পরিণতি বহন করতে হয় তাদেরই।
এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ও আলোচিত ঘটনার জন্ম দিয়েছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার চরগোপালপুর এলাকার প্রবাসী আজিজ আকন্দের পারিবারিক জীবন। নয় বছরের দাম্পত্য, ছয় বছরের ফুটফুটে মেয়েসন্তান—সবকিছু পেছনে ফেলে তার স্ত্রী অন্য এক যুবকের সঙ্গে চলে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন আজিজ। ঘটনার পর সৌদি আরবে বসে দুধ দিয়ে গোসল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। বলেছেন, ‘কাবাঘরে গিয়ে আল্লাহর কাছে বিচার দেব।’
আজিজের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে ভিডিওর চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ছয় বছরের সেই শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ। যে বয়সে একটি শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মায়ের স্নেহ, বাবার ভালোবাসা, নিরাপদ আশ্রয় এবং সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ, সেই বয়সেই তাকে পড়তে হয়েছে পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যে।
প্রবাসের কষ্টে গড়া সংসারে ভাঙনের অভিযোগ
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় নয় বছর আগে শান্তনা আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আজিজ আকন্দ। তাদের সংসারে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। জীবিকার তাগিদে প্রায় চার বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান আজিজ। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা এবং স্ত্রী-সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতায় কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি।
প্রবাসজীবন কখনোই সহজ নয়। পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে থেকে প্রতিদিন পরিশ্রম, অর্থ উপার্জন, দেশে টাকা পাঠানো এবং প্রিয়জনদের ভালো রাখার স্বপ্ন নিয়েই কাটে প্রবাসীদের দিন। আজিজের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতার ব্যতিক্রম ছিল না বলে তার অভিযোগ।
কিন্তু তার দাবি, গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে ছয় বছরের মেয়েসন্তানকে বাড়িতে রেখে অন্য এক যুবকের সঙ্গে চলে যান তার স্ত্রী শান্তনা আক্তার। যাওয়ার সময় তিন লাখ টাকা ও তিন ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সৌদি আরবে দুধ দিয়ে গোসল, ভিডিওতে কান্নাজড়িত কণ্ঠ
স্ত্রীর চলে যাওয়ার খবর পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন আজিজ। বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরব থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে নিজের কষ্টের কথা জানান তিনি। ওই সময় দুধ দিয়ে গোসল করার ভিডিও ধারণ করা হয়।
ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বিশ্বাস করে রেখে গেছিলাম স্ত্রীকে, ফুটফুটে শিশুকন্যা রেখে চলে গেছে অন্যের হাত ধরে। আমি কাবাঘরে গিয়ে আল্লাহর কাছে বিচার দেব।’
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ঘটনাটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। কেউ প্রবাসী স্বামীর কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন, কেউ শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে সন্তানকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে না রেখে দায়িত্বশীলভাবে সমাধানের পথ খোঁজা প্রয়োজন।
ছয় বছরের শিশুটির অপরাধ কোথায়?
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, মা-বাবার দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েনে একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়া।
ছয় বছরের একটি শিশু জানে না স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ কী, সম্পর্কের জটিলতা কী, কিংবা কেন তার মা-বাবার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সে শুধু জানে, তার মায়ের স্নেহ দরকার, বাবার আদর দরকার, নিরাপদে বেড়ে ওঠার জন্য একটি শান্ত পরিবেশ দরকার।
একজন মা সন্তানের কাছে শুধু জন্মদাত্রী নন, তিনি তার প্রথম আশ্রয়, প্রথম ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি। একইভাবে একজন বাবাও সন্তানের জীবনে অপরিহার্য। তাই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব কখনো শেষ হয়ে যায় না।
কোনো নারী বা পুরুষ দাম্পত্য জীবনে নির্যাতন, অবহেলা কিংবা অসহনীয় পরিস্থিতির শিকার হলে আইনসম্মতভাবে আলাদা হওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া আর সন্তানকে দায়িত্বহীনভাবে ফেলে যাওয়া এক বিষয় নয়। সন্তান কারও ব্যক্তিগত বিরোধের হাতিয়ার হতে পারে না।
সংসার ভাঙতে পারে, কিন্তু সন্তানের প্রতি দায়িত্ব নয়
সমাজে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কখনো স্বামীর ভুলে, কখনো স্ত্রীর সিদ্ধান্তে, কখনো দুই পক্ষের মতবিরোধে একটি সংসার ভেঙে যায়। কিন্তু সংসার ভেঙে গেলেই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
একজন নারী যদি নতুন করে জীবন শুরু করতে চান, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। একই অধিকার একজন পুরুষেরও রয়েছে। তবে সেই সিদ্ধান্তের কারণে সন্তানের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা, ভরণপোষণ ও মানসিক বিকাশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা মা-বাবা উভয়ের দায়িত্ব।
বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবার বিচ্ছেদ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। অবহেলা, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই দাম্পত্য জীবনে সংকট দেখা দিলে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য, প্রয়োজনে কাউন্সেলর এবং আইনগত সহায়তা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা জরুরি।
থানায় সাধারণ ডায়েরি, তদন্তের আশ্বাস
এদিকে ঘটনার পর বৃহস্পতিবার আজিজের পরিবারের সদস্যরা মাদারগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল হাসেম বলেন, ‘আজিজের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে শান্তনা আক্তারের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য জানতে বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সমাজের প্রতি প্রশ্ন—শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
আজিজ আকন্দের ঘটনাটি কেবল একজন প্রবাসী স্বামীর ব্যক্তিগত দুঃখের গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের সামনে মা-বাবার দায়িত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং শিশুর অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনার পর তার প্রতি দায়িত্ব পালন করা মা-বাবা উভয়ের নৈতিক ও আইনগত কর্তব্য। সম্পর্কের সমস্যা হলে আলোচনা, সমঝোতা কিংবা প্রয়োজনে আইনসম্মত বিচ্ছেদের পথ রয়েছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সন্তানকে অবহেলা, অনিশ্চয়তা কিংবা প্রতিশোধের পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবসান ঘটতে পারে, কিন্তু মা-বাবা হিসেবে সন্তানের প্রতি দায়িত্বের অবসান ঘটে না। নতুন সম্পর্ক, নতুন জীবন কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সিদ্ধান্তের মধ্যেও সন্তানের নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
আজিজের অভিযোগের সত্যতা তদন্তে বেরিয়ে আসুক, সংশ্লিষ্ট নারীও তার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান—এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে ছয় বছরের শিশুটির নিরাপদ জীবন, মানসিক সুস্থতা এবং যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
কারণ, একটি সংসার ভেঙে গেলে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নতুন করে জীবন গড়তে পারেন; কিন্তু একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব, মায়ের স্নেহের অভাব কিংবা মানসিক ক্ষত সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
সন্তান কোনো বোঝা নয়, কোনো সম্পর্কের প্রতিশোধের মাধ্যমও নয়। সন্তান হলো মা-বাবা দুজনেরই দায়িত্ব, ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের আমানত।