৯ বছরের সংসারে ভাঙনের অভিযোগ, ৬ বছরের কন্যাশিশুকে রেখে স্ত্রী উধাও—সৌদি আরবে দুধ দিয়ে গোসল প্রবাসী স্বামীর
কন্যাশিশুকে রেখে স্ত্রী উধাও, সৌদি আরবে প্রবাসী স্বামীর দুধ দিয়ে গোসল
৯ বছরের সংসার ভাঙার অভিযোগ, ৩ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে চলে যাওয়ার দাবি; থানায় জিডি, তদন্তের আশ্বাস পুলিশের
নিজস্ব প্রতিবেদক :
জামালপুরের মাদারগঞ্জে ছয় বছরের কন্যাশিশুকে রেখে স্ত্রী অন্য এক যুবকের সঙ্গে চলে গেছেন—এমন অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুধ দিয়ে গোসল করার ভিডিও প্রকাশ করেছেন সৌদি আরবপ্রবাসী আজিজ আকন্দ। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য সম্পর্ক, প্রবাসে থাকা স্বামীর বিশ্বাস, শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ এবং পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল থেকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আজিজ আকন্দকে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নিজের সংসার ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ তুলে বক্তব্য দিতে শোনা যায়। ভিডিওতে তিনি বলেন, বিশ্বাস করে স্ত্রীকে রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় বছরের শিশুকন্যাকে রেখে স্ত্রী অন্য একজনের হাত ধরে চলে গেছেন। এ ঘটনার পর তিনি সৌদি আরবে দুধ দিয়ে গোসল করেছেন এবং আল্লাহর কাছে বিচার চেয়েছেন বলেও জানান।
তবে ভিডিওতে প্রকাশিত বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের বাইরে ঘটনার সব দিক এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে স্ত্রী শান্তনা আক্তারের বক্তব্য, তিনি কোথায় আছেন এবং কী কারণে বাড়ি ছেড়েছেন—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রবাসে স্বামী, দেশে সংসার
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আজিজ আকন্দ জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার চরগোপালপুর এলাকার বাসিন্দা। জীবিকার সন্ধানে কয়েক বছর আগে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান। প্রায় নয় বছর আগে শান্তনা আক্তারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে রয়েছে ছয় বছরের একটি কন্যাশিশু।
পরিবারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগ অনুযায়ী, গত বুধবার বিকেলে শান্তনা আক্তার শিশুকন্যাকে রেখে এক যুবকের সঙ্গে চলে যান। এ সময় তিন লাখ টাকা ও তিন ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
ঘটনাটি জানার পর প্রবাসে থাকা আজিজ আকন্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তাঁর সেই ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত জীবনের এই সংকট প্রকাশ্যে আসায় বিষয়টি নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
দুধ দিয়ে গোসল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা
ভিডিওতে আজিজ আকন্দকে দুধ ঢেলে গোসল করতে দেখা যায়। এ সময় তিনি নয় বছরের সংসার, স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস এবং শিশুকন্যাকে রেখে চলে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়ার কথাও বলেন।
দুধ দিয়ে গোসল করার ঘটনাটি মূলত তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও মানসিক কষ্টের প্রকাশ হিসেবে ভিডিওতে উঠে এসেছে। তবে একটি ভাইরাল ভিডিও দেখে পুরো ঘটনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। দাম্পত্য জীবনের বিরোধ, বিচ্ছেদের কারণ কিংবা অর্থ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য যথাযথ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই এক পক্ষকে দায়ী করা হয়। এ ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত সংযত থাকা জরুরি।
থানায় সাধারণ ডায়েরি, তদন্তের আশ্বাস
ঘটনাটি নিয়ে আজিজ আকন্দের পরিবারের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার মাদারগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
মাদারগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল হাসেম জানান, আজিজ আকন্দের পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। তদন্ত করে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অভিযোগটি এখন তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে কী তথ্য পাওয়া যায়, অর্থ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ মেলে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য কী—এসবের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে শান্তনা আক্তারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
শান্তনা আক্তারের বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় তাঁর অবস্থান, বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কারণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। তাই অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে এবং তদন্তের তথ্য সামনে এলে বিষয়টির আরও পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগে ছয় বছরের শিশুকন্যা
এই ঘটনার সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো ছয় বছরের একটি শিশুর ভবিষ্যৎ। বাবা বিদেশে কর্মরত, আর মাকে ঘিরে এমন অভিযোগ সামনে আসায় শিশুটির দেখাশোনা, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
দাম্পত্য সম্পর্কে বিরোধ দেখা দিলে তার প্রভাব অনেক সময় শিশুদের ওপর পড়ে। অথচ পারিবারিক দ্বন্দ্বের জন্য একটি শিশুর নিরাপত্তা, স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা কিংবা ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ঘটনায় শিশুটির বর্তমান অবস্থান ও পরিচর্যার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ নয়, সত্য উদ্ঘাটনই হোক মূল লক্ষ্য
আজিজ আকন্দের ভাইরাল ভিডিও ঘটনাটিকে জনসমক্ষে নিয়ে এলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা দিয়ে কোনো ব্যক্তির অপরাধ বা দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়াই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে প্রবাসে থাকা স্বামীর অভিযোগ ও মানসিক কষ্ট, অন্যদিকে বক্তব্য দিতে না পারা স্ত্রী এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা শিশুকন্যা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি একটি পারিবারিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে। এর প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।
মাদারগঞ্জ থানার তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ পাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে কী নতুন তথ্য সামনে আসে—এখন সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে শিশুটির কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতির সমাধান হওয়াই প্রত্যাশিত।



















