ভূমি অফিসে ‘গোপন’ পরিদর্শনে ডিসি
বোরকা পরে ভূমি অফিসে ডিসি—সামনে এলো সেবার ‘আসল চিত্র’?
পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ নাগরিকের কাতারে ঢাকা জেলা প্রশাসক; হয়রানি, ভোগান্তি ও অনিয়মের খোঁজ—দপ্তরে গিয়ে নির্দেশনা
নিউজ ডেস্ক | রোজ খবর
সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন। কর্মকর্তাদের উপস্থিতির খবর আগে থেকেই জানা থাকে। ফলে সবকিছু থাকে নিয়মের ছকে। কিন্তু সেই পরিচিত ছকের বাইরে গিয়ে এবার সাধারণ নাগরিকের বেশে সরাসরি ভূমি অফিসে ঢুকলেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। বোরকা পরে পরিচয় গোপন রেখে তিনি নিজেই নিলেন ভূমিসেবা। কথা বললেন সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে। জানার চেষ্টা করলেন—সাধারণ মানুষ আসলে কীভাবে সরকারি সেবা পাচ্ছেন।
সোমবার উত্তরখান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘটে এই ব্যতিক্রমী ঘটনা। জেলা প্রশাসকের এই আকস্মিক উপস্থিতির লক্ষ্য ছিল মাঠপর্যায়ে ভূমিসেবার বাস্তব চিত্র জানা এবং সেবাগ্রহীতারা কোনো হয়রানি, ভোগান্তি, বিলম্ব কিংবা অনিয়মের মুখোমুখি হচ্ছেন কি না, তা সরাসরি বোঝা।
আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন বনাম বাস্তব অভিজ্ঞতা
প্রশাসনিক দপ্তরে নিয়মিত পরিদর্শনের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু এমন পরিদর্শনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগে থেকেই প্রস্তুত থাকার সুযোগ পান। ফলে সেবার স্বাভাবিক চিত্র কতটা প্রতিফলিত হয়—সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই বাস্তবতার জায়গা থেকেই জেলা প্রশাসকের ছদ্মবেশী পরিদর্শনকে দেখা হচ্ছে ভিন্ন ধরনের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ হিসেবে।
সাধারণ সেবাগ্রহীতার পরিচয়ে অফিসে গিয়ে তিনি নিজেও সেবা নেওয়ার পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের অভিজ্ঞতা জানতে চান। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ, সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া এবং অফিসের সামগ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন।
‘হয়রানিমুক্ত সেবা’—নির্দেশনার পর এবার বাস্তবায়নের পালা
পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্তভাবে ভূমিসেবা দেওয়ার নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন হলো—মাঠপর্যায়ে যে বাস্তবতা দেখা গেল, তার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
কোথাও যদি সেবার ঘাটতি থাকে, সেটি কীভাবে চিহ্নিত হবে? কোনো সেবাগ্রহীতা হয়রানির অভিযোগ করলে তার সত্যতা কীভাবে যাচাই হবে? সেবা দিতে অযথা বিলম্ব হলে দায় নির্ধারণ হবে কীভাবে? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আকস্মিক পরিদর্শন কতটা কার্যকর ফল বয়ে আনছে।
অবশ্য কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটিকে সরাসরি প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার পরই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ভূমি অফিস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
নামজারি, খাজনা, রেকর্ডসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা নিতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সরকারি ভূমি অফিসের ওপর নির্ভর করেন। জমি মানুষের সম্পদ, উত্তরাধিকার এবং জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় এসব সেবায় জটিলতা তৈরি হলে তার প্রভাবও গভীর হতে পারে।
একজন নাগরিকের জন্য একটি ছোটখাটো প্রশাসনিক বিলম্ব কখনো কখনো দীর্ঘদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হতে পারে। আর সেই জায়গাতেই স্বচ্ছতা, দ্রুততা ও দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিসির ‘ছদ্মবেশ’ কি নতুন বার্তা?
ঢাকা জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে—দাপ্তরিক কাগজে সেবা ঠিক আছে দেখালেই দায়িত্ব শেষ নয়; নাগরিক বাস্তবে কী সেবা পাচ্ছেন, সেটিও দেখতে হবে।
কারণ সরকারি সেবার মান যাচাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতা।
যে নাগরিক অফিসে গিয়ে সম্মানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবা পান, প্রশাসনের কাছে সেটিই সফলতা। বিপরীতে অযথা ঘোরাঘুরি, দীর্ঘ অপেক্ষা, তথ্যের অভাব বা হয়রানির অভিযোগ উঠলে তার কারণ অনুসন্ধান করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
এক দিনের অভিযান নয়, চাই ধারাবাহিক নজরদারি
উত্তরখান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জেলা প্রশাসকের এই আকস্মিক পরিদর্শন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে একটি পরিদর্শনের চেয়ে বড় বিষয় হলো—এ ধরনের নজরদারি কতটা ধারাবাহিক হয়।
প্রশ্ন এখন একটাই—শুধু একজন জেলা প্রশাসক বোরকা পরে সাধারণ নাগরিকের কাতারে দাঁড়ালেই কি ভূমিসেবার বাস্তব চিত্র বদলাবে?
নাকি প্রতিটি ভূমি অফিসেই এমন জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি হবে, যেখানে কর্মকর্তা জানবেন—যেকোনো সময় সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেবা পরিস্থিতি যাচাই করতে পারেন?
জনবান্ধব প্রশাসনের আসল পরীক্ষা সেখানেই।
কারণ পরিচয় প্রকাশ না করেও যদি একজন নাগরিক দ্রুত, স্বচ্ছ ও সম্মানজনক সেবা পান—তবেই প্রমাণ হবে, সরকারি সেবা সত্যিই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে।



















