ঢাকা ০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানে স্টারলিংক ব্যবহার মানেই গুপ্তচরবৃত্তি: নতুন আইনে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি, জাতীয় ইন্টারনেটে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতার পথে তেহরান

নিজস্ব সংবাদ :

সংগৃহীত ছবি

ইরানে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার এখন আর শুধু অপরাধ নয়, বরং মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযোগে পরিণত হয়েছে। দেশটির নতুন আইনে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখা ও ব্যবহারকে সরাসরি ‘ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ইরান কার্যত বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব সরকার-নিয়ন্ত্রিত জাতীয় ইন্টারনেট ব্যবস্থায় প্রবেশের শেষ ধাপে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা।

ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা Filterwatch জানিয়েছে, ইরানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহার আর নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং এটি সরকারের দেওয়া একটি বিশেষ সুবিধা হিসেবে গণ্য হবে। এই ব্যবস্থায় কেবল নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত বা সরকারি যাচাই প্রক্রিয়া উত্তীর্ণ ব্যক্তিরাই সীমিত ও কঠোরভাবে ফিল্টার করা বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি পাবেন।

ফিল্টারওয়াচের প্রধান আমির রাশিদি বলেন, সাধারণ নাগরিকদের জন্য চালু করা হবে একটি সম্পূর্ণ দেশীয় জাতীয় ইন্টারনেট, যা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। এই সমান্তরাল নেটওয়ার্কে কেবল সরকার অনুমোদিত সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং অ্যাপ এবং দেশীয় স্ট্রিমিং সেবা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এই নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে চীন এবং হুয়াওয়ের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে।

এরই মধ্যে ইরানে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা NetBlocks–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে টানা ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় কার্যকর ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এটি ২০১১ সালে মিসরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়কার ইন্টারনেট শাটডাউনের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।

সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী ২০ মার্চ ইরানি নববর্ষ নওরোজ পর্যন্ত এই ব্ল্যাকআউট বহাল থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো সাময়িক পদক্ষেপ নয় বরং বহু বছরের পরিকল্পিত কৌশলের বাস্তবায়ন।

এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের জন্য শেষ ভরসা হয়ে উঠেছিল Starlink। তবে ২০২৫ সালে পাস হওয়া নতুন আইনে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখাকে রাষ্ট্রবিরোধী গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একই সঙ্গে তেহরানের আকাশসীমায় রুশ ও চীনা প্রযুক্তির জ্যামার ব্যবহার করে স্টারলিংক সিগন্যাল ব্যাহত করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০৯ সালে বিক্ষোভ দমনে ইন্টারনেট বন্ধের অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান ধীরে ধীরে দেশীয় ইন্টারনেট ব্যবস্থার দিকে এগোয়। ২০১২ সালে সুপ্রিম কাউন্সিল অব সাইবারস্পেস গঠনের পর সেই পরিকল্পনা গতি পায়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই দীর্ঘ প্রস্তুতিরই চূড়ান্ত রূপ।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ফিল্টারওয়াচ, নেটব্লকস

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
আপডেট সময় ১২:৪৪:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
১০১ বার পড়া হয়েছে

ইরানে স্টারলিংক ব্যবহার মানেই গুপ্তচরবৃত্তি: নতুন আইনে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি, জাতীয় ইন্টারনেটে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতার পথে তেহরান

আপডেট সময় ১২:৪৪:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

ইরানে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার এখন আর শুধু অপরাধ নয়, বরং মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযোগে পরিণত হয়েছে। দেশটির নতুন আইনে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখা ও ব্যবহারকে সরাসরি ‘ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ইরান কার্যত বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব সরকার-নিয়ন্ত্রিত জাতীয় ইন্টারনেট ব্যবস্থায় প্রবেশের শেষ ধাপে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা।

ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা Filterwatch জানিয়েছে, ইরানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহার আর নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং এটি সরকারের দেওয়া একটি বিশেষ সুবিধা হিসেবে গণ্য হবে। এই ব্যবস্থায় কেবল নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত বা সরকারি যাচাই প্রক্রিয়া উত্তীর্ণ ব্যক্তিরাই সীমিত ও কঠোরভাবে ফিল্টার করা বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি পাবেন।

ফিল্টারওয়াচের প্রধান আমির রাশিদি বলেন, সাধারণ নাগরিকদের জন্য চালু করা হবে একটি সম্পূর্ণ দেশীয় জাতীয় ইন্টারনেট, যা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। এই সমান্তরাল নেটওয়ার্কে কেবল সরকার অনুমোদিত সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং অ্যাপ এবং দেশীয় স্ট্রিমিং সেবা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এই নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে চীন এবং হুয়াওয়ের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে।

এরই মধ্যে ইরানে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা NetBlocks–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে টানা ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় কার্যকর ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এটি ২০১১ সালে মিসরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়কার ইন্টারনেট শাটডাউনের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।

সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী ২০ মার্চ ইরানি নববর্ষ নওরোজ পর্যন্ত এই ব্ল্যাকআউট বহাল থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো সাময়িক পদক্ষেপ নয় বরং বহু বছরের পরিকল্পিত কৌশলের বাস্তবায়ন।

এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের জন্য শেষ ভরসা হয়ে উঠেছিল Starlink। তবে ২০২৫ সালে পাস হওয়া নতুন আইনে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখাকে রাষ্ট্রবিরোধী গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একই সঙ্গে তেহরানের আকাশসীমায় রুশ ও চীনা প্রযুক্তির জ্যামার ব্যবহার করে স্টারলিংক সিগন্যাল ব্যাহত করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০৯ সালে বিক্ষোভ দমনে ইন্টারনেট বন্ধের অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান ধীরে ধীরে দেশীয় ইন্টারনেট ব্যবস্থার দিকে এগোয়। ২০১২ সালে সুপ্রিম কাউন্সিল অব সাইবারস্পেস গঠনের পর সেই পরিকল্পনা গতি পায়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই দীর্ঘ প্রস্তুতিরই চূড়ান্ত রূপ।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ফিল্টারওয়াচ, নেটব্লকস