“২৯৩ প্রতিষ্ঠানে একজনও পাস করেনি: শিক্ষার নামে অবহেলার দায় নেবে কে?”
শিক্ষার নামে অবহেলার বাণিজ্য আর কত? ২৯৩ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই শিক্ষকদের
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি নয়, ব্যর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চাই কঠোর ব্যবস্থা; দায়িত্বহীন শিক্ষক ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু চার দেয়ালের একটি ভবন নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা। আর সেই কারখানার প্রধান কারিগর হলেন শিক্ষক। একজন শিক্ষক তাঁর মেধা, শ্রম, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে একটি প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারেন। আবার দায়িত্বে অবহেলা, পাঠদানে অনীহা এবং জবাবদিহির অভাবে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নও অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই যদি একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে না পারে, তাহলে এর দায় কার?
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অন্যদিকে, এ বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ১৩৯টি।
এ পরিসংখ্যান কেবল কিছু প্রতিষ্ঠানের ফলাফল খারাপ হওয়ার খবর নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ: জবাবদিহির আওতায় আসছে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান
শূন্য পাস কিংবা আশঙ্কাজনকভাবে কম পাসের হার থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। রোববার (১ নভেম্বর) শিক্ষামন্ত্রীর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে জানানো হয়, এ বিষয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর এ নির্দেশ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তবে শুধু নির্দেশনা জারি করলেই শিক্ষার মানের উন্নয়ন হবে না। প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, দায় নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ। কেন একটি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারল না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।
শিক্ষকতা কি শুধু চাকরি, নাকি জাতি গড়ার দায়িত্ব?
শিক্ষকতা অন্য দশটি পেশার মতো কেবল মাস শেষে বেতন পাওয়ার চাকরি নয়। এটি একটি মহান দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করবেন, পাঠদান করবেন, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করবেন, নিয়মিত পরীক্ষা নেবেন, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন—এটাই স্বাভাবিক দায়িত্ব।
কিন্তু কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস হয় কি না, পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ করা হয় কি না, দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি যত্ন দেওয়া হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, কোথাও আবার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা শিক্ষার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
অবশ্যই সব দায় শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ন্যায়সংগত নয়। শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি, পারিবারিক অসচ্ছলতা, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক সংকট, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাও তদন্তে বিবেচনায় নিতে হবে। তবে কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই
একজন শিক্ষার্থী যখন কলেজে ভর্তি হয়, তখন তার চোখে থাকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষা। অভিভাবকরা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে সন্তানকে পড়াশোনা করান। অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তানও সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে স্বপ্ন দেখে একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু সেই শিক্ষার্থী যদি যথাযথ পাঠদান, দিকনির্দেশনা ও শিক্ষার পরিবেশ না পায়, তাহলে তার দায়ভার কে নেবে?
একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে একটি পুরো ব্যাচের শিক্ষার্থীর জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর হারিয়ে যেতে পারে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, চাকরির প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তারা পিছিয়ে পড়তে পারে। অথচ তাদের অনেকেই হয়তো যথেষ্ট মেধাবী ছিল, প্রয়োজন ছিল শুধু সঠিক পরিচর্যা ও দিকনির্দেশনার।
তাই শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিয়ে নয়, বরং তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সমস্যার মূল কারণ দূর করতে হবে।
শুধু শোকজ নয়, প্রয়োজন তদন্ত ও কার্যকর জবাবদিহি
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্তে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত—
১. গত কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক সাফল্য বা ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করা।
২. নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান হয়েছে কি না, শিক্ষকরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, তা যাচাই করা।
৩. বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট, শূন্য পদ এবং পাঠদানের পরিবেশের ঘাটতি অনুসন্ধান করা।
৪. শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শ্রেণি মূল্যায়ন, নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া উদ্যোগ পর্যালোচনা করা।
৫. প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, অধ্যক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্ব ও ভূমিকা যাচাই করা।
৬. দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী সতর্কীকরণ, কারণ দর্শানোর নোটিশ, বিভাগীয় তদন্ত ও উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট কিংবা অবকাঠামোগত সমস্যা পাওয়া গেলে শুধু শিক্ষককে দায়ী করে শাস্তি দেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বেতন-ভাতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্ব পালনের হিসাবও দিতে হবে
সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি তাঁদের কাছ থেকে মানসম্মত পাঠদানও প্রত্যাশিত। একজন শিক্ষক যদি নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করেন, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবিষয়ে দুর্বলতা দূর করতে উদ্যোগী না হন, তাহলে তাঁর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে আসা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভালো ফলাফলের জন্য শিক্ষককে যেমন জবাবদিহি করতে হবে, তেমনি ভালো পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান পরিচালকদেরও নিতে হবে।
শিক্ষা বাণিজ্য নয়, শিক্ষার মানই হোক প্রতিষ্ঠানের পরিচয়
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। শুধু ভবন, সাইনবোর্ড, ভর্তি বিজ্ঞাপন কিংবা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বিচার করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, তাদের নৈতিকতা ও দক্ষতা কতটা বিকশিত হচ্ছে এবং তারা ভবিষ্যতের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে তার ওপর।
যেসব প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ফলাফল খারাপ হচ্ছে, তাদের বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন চালু করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ তদারকি দল গঠন করে পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, দুর্বল বিষয়ে বিশেষ পাঠদান এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রশাসনের প্রতি প্রত্যাশা: দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন
শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া এক সপ্তাহের সময়সীমাকে কার্যকর পদক্ষেপের সূচনা হিসেবে দেখতে চায় সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগী মহল। শুধু কাগজে-কলমে তদন্ত বা লোকদেখানো শোকজ নোটিশ নয়, প্রয়োজন বাস্তব পরিবর্তন।
যেসব প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা কিংবা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে পিছিয়ে রয়েছে, তাদের উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল, শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদান কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
শেষ কথা: শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে অবহেলা নয়
আজ যারা শিক্ষার্থী, তারাই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বশীল নাগরিক। তাদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস হওয়ার অর্থ শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা।
২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের ঘটনা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এই ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শাস্তি যেন প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের কার্যকর উপায় হয়।
যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মানুষ গড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁকে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। যে অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁকে জবাব দিতে হবে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য। আর যে প্রশাসন শিক্ষাব্যবস্থা তদারকির দায়িত্বে রয়েছে, তাদেরও ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
শিক্ষককে সম্মান দিতে হবে, কিন্তু দায়িত্বহীনতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মর্যাদা দিতে হবে, কিন্তু ব্যর্থতার আড়ালে জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ দেওয়া যাবে না।
কারণ শিক্ষা কোনো ব্যবসা নয়, শিক্ষার্থীরা কোনো পরীক্ষামূলক পণ্য নয়। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবহেলা করার অধিকার কারও নেই। এখনই সময়—শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনা, দায়িত্বহীনতার অবসান ঘটানো এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত অর্থে জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্রে পরিণত করা।









